
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
ফেব্রুয়ারি এলে বাংলার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। আকাশে-বাতাসে ভেসে আসে এক অমর গান—
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি,
আমি কি ভুলিতে পারি…”
ভুলে থাকার কথা নয়। ভুলে থাকা যায় না। এই গান আমাদের শোনায়, মনে করিয়ে দেয়—ভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার ইতিহাস পৃথিবীতে আর কোথাও নেই।
যে স্বাধিকার আন্দোলনের ভেতর দিয়ে একদিন উচ্চারিত হয়েছিল—
“তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা”,
তার বীজ রোপিত হয়েছিল এই ফেব্রুয়ারিতেই, বুড়িগঙ্গার তীরে। আজ সেই ফেব্রুয়ারির শুরু। মাসজুড়ে তাই শোক, শ্রদ্ধা আর অহংকার মিশে থাকে বাঙালির হৃদয়ে।
মায়ের মুখের ভাষা বাংলাকে আপন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করতে ১৯৫২ সালের এই মাসে বাংলার বীর সন্তানেরা গড়ে তুলেছিলেন এক অগ্নিঝরা আন্দোলন। বুকের তাজা রক্তে তারা রাঙিয়ে দিয়েছিলেন রাজপথ। রাষ্ট্রের চোখে ভাষাকে এনে দিয়েছিলেন অধিকার, আর জাতির মনে স্থায়ী করে দিয়েছিলেন আত্মমর্যাদার বোধ।
২১ ফেব্রুয়ারি—শুধু একটি তারিখ নয়। এটি বাঙালির মনন, আত্মপরিচয় ও সংগ্রামের প্রতীক। সেই সংগ্রামের স্মারক শহীদ মিনার আজ আর শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নেই। ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরে যে শহীদ মিনার জন্ম নিয়েছিল বাঙালির শোক আর শ্রদ্ধার মাঝখানে, তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয়, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়—গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, গোমতী, সোমেশ্বরী কিংবা সুবর্ণরেখার তীর ঘেঁষে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে শহীদ মিনার। নীরবে তারা বলে যায়—ভাষা কোনো সীমানা মানে না।
১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ জন্ম নেওয়ার পর বিভাজনের কাঁটাতার কিছুটা নরম হতে থাকে। রাষ্ট্র আলাদা হলেও ভাষা এক—এই বোধ আরও দৃঢ় হয়। বাংলাদেশের বাইরে থাকা বাংলাভাষীদের কাছেও এই দেশ হয়ে ওঠে গর্বের ঠিকানা। ঢাকার বুড়িগঙ্গাপাড় আর বরাকের শিলচরে যে তরুণেরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল, তারা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সব বাংলাভাষীর নায়ক। শ্রদ্ধা, শোক আর ভালোবাসায় তারা স্মরিত হতে থাকে সীমান্তের এপারে-ওপারে।
বাংলা ভাষার শহীদ মিনার আজ বিশ্বজুড়ে। টেমসের তীরে লন্ডন, ক্রুজের ধারে ফ্রান্সের বারি, টেভেরের পাশে রোম, সুমিদার কূলে টোকিও, হাম্বারের পাড়ে টরন্টো, পারামাটার ধারে সিডনি—এমনকি পটোম্যাক পাড়ের যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য শহরেও মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে শহীদ মিনার। ফেব্রুয়ারি এলেই পদ্মাপাড়ের বাংলাদেশের বাইরে বিশ্বের নানা প্রান্তে গড়ে ওঠে অস্থায়ী শহীদ মিনার—শোক আর ভালোবাসার নীরব স্তম্ভ।
ভাষার জন্য বুড়িগঙ্গাপাড়ের সেই দামাল সন্তানদের আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর। ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা করে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। বাঙালির একান্ত শোক আর গর্বের এই দিনটি তখন হয়ে ওঠে পৃথিবীর সব ভাষাভাষী মানুষের দিন।
যে দিবস একসময় শুধু বাঙালিরাই পালন করত, আজ তা পালিত হয় জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্রে। স্মরণ করা হয় ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া শহীদদের। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বিষয়ক অফিসিয়াল সাইটে স্থান পেয়েছে আমাদের শহীদ মিনার।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি