
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী ভোটার সংখ্যা ৬ কোটি ৪৮ লাখের বেশি—মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক। পরিসংখ্যান বলছে, ব্যালটের বাক্সে নারীরা পুরুষের সমান শক্তিধর। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, নীতিনির্ধারণী অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নে সেই সমতা দৃশ্যমান নয়। নির্বাচনী বাস্তবতা তাই এক ধরনের দ্বৈত চিত্র তুলে ধরছে—সংখ্যায় শক্তিশালী নারী, কিন্তু ক্ষমতার কাঠামোয় প্রান্তিক।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র ৪ শতাংশ। অর্থাৎ যে জনগোষ্ঠী ভোটের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ, তারাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিযোগিতা থেকে প্রায় অনুপস্থিত। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল প্রার্থী মনোনয়নের সংকট নয়; বরং রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতা বণ্টনের মানসিকতা এবং কাঠামোগত বৈষম্যের প্রতিফলন।
ইতিহাসও নারী ভোটের প্রভাবকে অস্বীকার করে না। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারী ভোটের প্রবণতা বিজয়ী দল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্থানীয় নির্বাচন ও গবেষণাতেও গ্রামীণ নারীদের ভোটদানের হার পুরুষের তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ নারীরা কেবল ভোটার নন—তারা নির্বাচনের গতিপথ নির্ধারণকারী একটি নির্ণায়ক শক্তি।
তবু এই রাজনৈতিক শক্তি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় অনুবাদ হচ্ছে না। কৃষি, তৈরি পোশাক, ক্ষুদ্র শিল্প ও শিক্ষা খাতে কোটি কোটি নারী যুক্ত থাকলেও তাদের শ্রমের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা ও নীতিগত প্রতিনিধিত্ব সীমিত। কৃষিতে নারীর বড় অবদান থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে সেই বাস্তবতা প্রায় অনুপস্থিত—এমন অভিযোগ কৃষি সংগঠনগুলোর। একইভাবে এসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তারা ঋণপ্রাপ্তি, বাজার টিকে থাকা ও নীতিগত সহায়তার অভাবের কথা বলছেন।
শ্রমবাজারের বাস্তবতাও বৈপরীত্যপূর্ণ। পোশাক শিল্পে বিপুল নারী কর্মী দেশের রফতানি অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুললেও তাদের রাজনৈতিক কণ্ঠ দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রে ভোটের সিদ্ধান্তও পরিবারনির্ভর, যা ব্যক্তিগত নাগরিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাকে নির্দেশ করে। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষিত তরুণী ভোটাররা নিরাপত্তা, বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন—যা প্রজন্মগত রাজনৈতিক প্রত্যাশার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
রাজনৈতিক দলগুলো নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করতে প্রতিশ্রুতি দিলেও সমালোচকদের মতে, তা অনেকাংশেই কৌশলগত—কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নয়। সাইবার সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, সমান মজুরি কিংবা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে দৃশ্যমান নীতিগত অবস্থান দুর্বল। ফলে নারী ভোটকে মূল্য দেওয়া হলেও নারী নাগরিককে সমান ক্ষমতায় স্বীকৃতি দেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতি এক মৌলিক বৈপরীত্যের মুখোমুখি—নারীরা ভোটের অর্ধেক শক্তি, কিন্তু ক্ষমতার অর্ধেক অংশীদার নন। এই ব্যবধান দূর না হলে ব্যালটে সমতা গণতন্ত্রে সমতা নিশ্চিত করতে পারবে না; বরং সংখ্যাগত অংশগ্রহণ আর বাস্তব ক্ষমতাহীনতার দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়ে উঠবে।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি