
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
শিক্ষাকে “ব্যয়” নয়, “রাষ্ট্রের প্রথম বিনিয়োগ” হিসেবে ঘোষণা দিয়ে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য নির্ধারণসহ ১২ দফা নীতিগত এজেন্ডা হাতে নিয়েছে সরকার। শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সংবাদ সম্মেলনে এসব পরিকল্পনা তুলে ধরেন; উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে শিক্ষা খাতে অর্থায়ন ও কাঠামোগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তবে প্রশ্ন উঠছে এত বিস্তৃত ও উচ্চাভিলাষী কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে কোনো নতুন বিতর্ক বা সংঘাত তৈরি হবে কিনা। নীতিগত ঘোষণা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ব্যবধান কীভাবে কমানো হবে--- এ প্রতিবেদনে থাকছে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ।
অর্থায়ন: ৫% জিডিপি—বাস্তবতা বনাম প্রতিশ্রুতি/
গত কয়েক বছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ১২ শতাংশ এবং জিডিপির অনুপাতে দেড় থেকে দুই শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সরকার এখন জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে—যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের (৪–৬%) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মাঝারি মেয়াদের বাজেট কাঠামো ধরে তিন বছরের “ফিসক্যাল আপলিফট” পরিকল্পনা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশের প্রশ্ন রাজস্ব ঘাটতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের প্রেক্ষাপটে এ বরাদ্দ কত দ্রুত এবং কতটা টেকসইভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব।
উন্নয়ন বাজেটের ‘শেষ ত্রৈমাসিকের হুড়োহুড়ি’ বন্ধের ঘোষণা/
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উন্নয়ন তহবিলের প্রায় ৫৩ শতাংশ অব্যবহৃত থেকে ফেরত গেছে। বছরের শেষে তড়িঘড়ি ব্যয়ের সংস্কৃতির কারণে বই বিতরণ, নির্মাণ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম স্কুল ক্যালেন্ডারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ে। এ অবস্থার পরিবর্তনে পরিকল্পনা কমিশনের এডিপি অনুমোদন ও প্রকল্প গেটকিপিংকে স্কুল বর্ষপঞ্জির সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হলো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা কাঠামো কতটা কার্যকর হবে?
উন্নয়ন ব্যয়ে অগ্রাধিকার: অবকাঠামো থেকে মিড-ডে মিল/
সরকার বলছে, চলতি ব্যয় স্কুল খোলা রাখে; উন্নয়ন ব্যয় স্কুলকে আধুনিক করে। তাই অগ্রাধিকার পাচ্ছে :
শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, ভাষা ল্যাব স্থাপন, ডিজিটাল কনটেন্ট ও মূল্যায়ন সক্ষমতা, পানি, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী মিড-ডে মিল, ছাত্রীদের স্বাস্থ্য সহায়তা। তবে মিড-ডে মিল বাস্তবায়নে সরবরাহ শৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও পুষ্টিমান নিশ্চিতকরণ নিয়ে আগেও বিতর্ক হয়েছে নতুন কাঠামো কি তা কাটাতে পারবে?
ডিজিটাল রূপান্তর: ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ ও এআই সচেতনতা/
শিক্ষকদের জন্য “ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব” কর্মসূচি চালু হবে ধাপে ধাপে। ট্যাবে থাকবে পাঠ পরিকল্পনা টেমপ্লেট, প্রশ্ন ব্যাংক, উপস্থিতি ও লার্নিং এভিডেন্স। আইসিটি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ে ডিজিটাল লিটারেসি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সচেতনতা ও সাইবার সেফটি বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা থাকলে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে বৈষম্য তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক/
বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, চীনা, জাপানি, ফরাসি প্রভৃতি ভাষা পর্যায়ক্রমে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুনে-বলা দক্ষতাকে মূল্যায়নে যুক্ত করা হবে।
সম্ভাব্য বিতর্কের জায়গা হলো:/পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত শিক্ষক কোথায় পাওয়া যাবে?, গ্রামীণ ও শহুরে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৈষম্য বাড়বে কি?, শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ তৈরি হবে কি?
মাধ্যমিকে কারিগরি শিক্ষা ও ক্রীড়া বাধ্যতামূলক/
মাধ্যমিক স্তরে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্তি এবং সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় ব্রিজিং কোর্স চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ–এর সঙ্গে সমন্বয়ে ক্রেডিট ব্রিজ কোর্স চালু হবে।
এছাড়া ক্রীড়া টাইমটেবিলভিত্তিক বাধ্যতামূলক করা হবে; বাংলাদেশ ক্রীড়াশিক্ষা প্রতিষ্ঠান–এর সঙ্গে সমন্বয়ে প্রশিক্ষণ, ট্যালেন্ট হান্ট ও স্কুল লিগ চালু হবে। তবে অবকাঠামো ও প্রশিক্ষকের অভাব থাকলে এটি কাগুজে বাধ্যবাধকতায় সীমাবদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি আছে।
মূল্যায়নে টেকনিক্যাল রিফর্ম ও ন্যূনতম শিখন মানদন্ড/
বোর্ড পরীক্ষায় আইটেম ব্যাংক, ব্লুপ্রিন্ট, মডারেশন ও স্কুলভিত্তিক মূল্যায়ন গাইডলাইন চালু হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ যৌথভাবে ন্যূনতম শিখন মানদণ্ড নির্ধারণ করবে।
কওমি সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন ও কারি-আলেমদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির কথাও পরিকল্পনায় আছে--যা রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বির্তর্কের জন্ম দিতে পারে।
উচ্চশিক্ষা: গবেষণা ও ইনোভেশন গ্র্যান্ট/
বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবন বাড়াতে ইনোভেশন গ্র্যান্ট, স্টুডেন্ট লোন ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা সহায়তা চালুর ঘোষণা এসেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়নের কথাও বলা হয়েছে। তবে প্রশ্ন—গবেষণায় বরাদ্দ কি সমানভাবে বণ্টিত হবে, নাকি রাজধানীকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোই বেশি সুবিধা পাবে?
জবাবদিহিতা: পাবলিক ড্যাশবোর্ড ও শিক্ষা রিপোর্ট কার্ড/
মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে মাসিক পাবলিক ড্যাশবোর্ডে প্রকল্প অগ্রগতি, বই বিতরণ, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি তথ্য উন্মুক্ত থাকবে। স্কুল-কলেজে প্রকাশ হবে শিক্ষা রিপোর্ট কার্ড; অভিযোগ ব্যবস্থায় থাকবে ট্র্যাকিং নম্বর। এ উদ্যোগ স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে; তবে তথ্যের নির্ভুলতা ও স্বাধীন অডিট ছাড়া এটি কেবল প্রদর্শনী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তিন ধাপের টাইমলাইন/
১ম ধাপ: ডায়াগনস্টিক রিভিউ, রুট-কজ অ্যানালাইসিস, ট্যাব ও ভাষাশিক্ষা পাইলট
২য় ধাপ: জাতীয় শিক্ষা রোডম্যাপ ঘোষণা
৩য় ধাপ (১২–৩৬ মাস): পরীক্ষা সংস্কার, ব্রিজিং, গবেষণা গ্র্যান্ট স্কেল-আপ
শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, ১৮০ দিনের রোডম্যাপ প্রকাশ হবে শিগগিরই। এসএসসি পরীক্ষা সুষ্ঠু করতে বিশেষ প্রস্তুতির কথাও বলা হয়েছে; অতীতের অটোপাস নীতিকে স্থায়ী সমাধান নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারিকুলাম পরিমার্জনে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড–এর বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। শিক্ষা কমিশন গঠনের বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা চলবে।
বিশেষজ্ঞরা এ উদ্যোগকে সুদূরপ্রসারী কাঠামো হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, পরিকল্পনা যেন সচিবালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন জরুরি। তিনি প্রাথমিক থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার পক্ষে মত দেন।
সম্ভাব্য বিতর্ক ও সংঘাতের ক্ষেত্র/
বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা: চাপ ও বৈষম্য, কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক: অবকাঠামো ঘাটতি, কওমি সনদ বাস্তবায়ন: মতাদর্শিক বিরোধ, বাজেট ৫% জিডিপি: আর্থিক সক্ষমতা, ডিজিটাল রূপান্তর: প্রযুক্তিগত বৈষম্য ও মূল্যায়ন সংস্কার: পরীক্ষাকেন্দ্রিক মানসিকতার সঙ্গে সংঘাত।
শিক্ষা খাতে তিন ধাপে ১২ সংস্কারের এ ঘোষণা নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী। অর্থায়ন বৃদ্ধি, কারিগরি ও প্রযুক্তি সংযুক্তি, গবেষণা জোরদার এবং জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতি—সব মিলিয়ে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ রূপান্তর পরিকল্পনা। কিন্তু বাস্তবায়নের পথে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, আর্থিক টেকসইতা, শিক্ষক-প্রশিক্ষণ, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক ঐকমত্য---এসবই নির্ধারণ করবে এই শিক্ষানীতি জাতীয় অগ্রগতির মাইলফলক হবে, নাকি নতুন বিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি করবে।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি