
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসর এখনো স্থিতি খুঁজছে। এই প্রেক্ষাপটে কার্যক্রম নিষিদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–এর বিভিন্ন কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের প্রবেশ, তালা খোলা কিংবা প্রতীকী উপস্থিতির ঘটনাগুলো নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কোথাও কয়েকজন এসে পতাকা টানিয়েছেন, কোথাও স্লোগান দিয়ে আবার সরে গেছেন, আবার কোনো কোনো স্থানে কার্যালয় ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—এগুলো কি স্বতঃস্ফূর্ত তৃণমূল উদ্যোগ, নাকি নীরবে কোনো রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত?
২০২৫ সালের মে মাসে ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সরকারের ব্যাখ্যা ছিল, সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই ছিল এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য।
এর ফলে দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। নির্বাচন সম্পন্ন হলেও নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। সরকারি মহলের বক্তব্য—আইনগত প্রক্রিয়া, আদালতের অবস্থান এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সরকার এও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, কোনো দলকে লক্ষ্য করে নয়; বরং জনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাই তাদের অগ্রাধিকার।
নির্বাচনের পর ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কার্যালয়ে প্রবেশের চেষ্টা কিংবা প্রতীকী অবস্থানের খবর সামনে আসে। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে স্বল্প সময়ের অবস্থান এবং ধানমন্ডিতে দলীয় সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে উপস্থিতি বিশেষভাবে আলোচিত হয়।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ি ভাঙার ঘটনা রাজনৈতিক আবহকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। ফলে কার্যালয় ঘিরে যেকোনো পদক্ষেপই জনমনে বাড়তি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।
কিছু এলাকায় কার্যালয় খোলাকে কেন্দ্র করে পাল্টা বিক্ষোভ, ভাঙচুর বা সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে—মাঠের রাজনীতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক ছন্দে ফেরেনি।
দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দাবি করেছেন, কার্যালয় নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত করা হয়নি; তাই সেখানে যাওয়া রাজনৈতিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে। তার ভাষ্য—এটি কোনো গোপন সমঝোতার ফল নয়, বরং তৃণমূলের স্বাভাবিক প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ।
দলীয় সূত্রগুলো আরও জানায়, দলের সভাপতি শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়াল আলোচনায় সাংগঠনিক উপস্থিতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রকাশ্য নির্দেশ নেই। ফলে উদ্যোগগুলোর চরিত্র—কেন্দ্রীয় না স্থানীয়—তা নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে।
স্থানীয় পর্যায়ে আবার ভিন্ন চিত্রও দেখা গেছে। কোথাও একই দলের অভ্যন্তরীণ গ্রুপ-দ্বন্দ্ব, কোথাও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পূর্ব-নির্বাচনী যোগাযোগের অভিযোগ—এসব মিলিয়ে বাস্তবতা জটিল। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে সুস্পষ্ট প্রমাণ সামনে আসেনি।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ/
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি কেবল তালা খোলা বা কার্যালয়ে প্রবেশের প্রশ্ন নয়; বরং এটি নিষেধাজ্ঞা-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সম্ভাব্য সূচক। একাংশ মনে করেন, নির্বাচনের পর একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশের দাবি উঠতে পারে। অন্যদিকে আরেক অংশ সতর্ক করছেন—নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায় সংগঠিত তৎপরতা আইনগত জটিলতা তৈরি করতে পারে এবং তা নতুন করে অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে।
সরকারের সামনে সমীকরণ/
সরকারের অবস্থান এখন পর্যন্ত সতর্ক ও প্রক্রিয়াভিত্তিক। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মাঠে সক্রিয় রেখেছে। সরকারপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, যেকোনো সিদ্ধান্ত হবে আইনের আলোকে এবং জননিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। নিষেধাজ্ঞা, আইনি প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জনমতের চাপ—সব কিছুর সমন্বয়ে আগামী দিনে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেটিই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নিষিদ্ধ একটি দলের সাংগঠনিক উপস্থিতি কোন পথে এগোবে।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি