
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
আন্তর্জাতিক জাহাজ ভাড়ার ঊর্ধ্বগতি, আমদানিতে জটিলতা এবং ডিলার পর্যায়ে কমিশন সংকট—সব মিলিয়ে দেশের এলপিজি বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতা চলছে। এর সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে সিলিন্ডারপ্রতি কয়েকশ টাকা বেশি দিয়ে এলপিজি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
ভোক্তাদের অভিযোগ, এলপিজির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবে প্রায় কখনোই কার্যকর হয় না। বাজারে যে দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
দেশে এলপিজির বাজার স্থিতিশীল করতে এর আগে অংশীজনদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করে অন্তর্বর্তী সরকার। তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, দেশে প্রকৃত কোনো গ্যাস সংকট নেই; অসাধু ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট তৈরির কারণেই দাম বাড়ছে।
এ সময় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আশ্বাস দিয়েছিল, ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই অস্থিরতা রমজানের মধ্যে কেটে যাবে।
এ ছাড়া গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এলপিজির ওপর ভ্যাট কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। স্থানীয় উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ের ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট এবং আমদানি পর্যায়ের ২ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হয়। এতে ভোক্তাদের ওপর ভ্যাটের চাপ প্রায় ২০ শতাংশ কমবে বলে জানানো হয়েছিল।
এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারি বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৫ টাকা কমিয়ে ১৩৫৬ টাকা থেকে ১৩৪১ টাকা নির্ধারণ করে।
কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও বাস্তব বাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।
বাজারে বাড়তি দামে বিক্রি/
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত ১৩৪১ টাকার পরিবর্তে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাম ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
কুষ্টিয়া শহরেরসুখনগর বস্তির বাসিন্দা হারুন উর রশিদ আসকারী ওরফে হারুন বলেন,
বিদ্যুতের দামের বিপরীতে সিলিন্ডারই একমাত্র ভরসা। অথচ সরকার নির্ধারিত দামে কখনোই গ্যাস কিনতে পারিনি।
থানাপাড়া বস্তির রুহুল কুুদ্দস সালেহ ওরফে টাকলা সালেহ বলেন,
“সরকার দাম কমালেও বাজারে তার কোনো প্রভাব নেই। ১৩০০ টাকার সিলিন্ডার ১৭০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের জন্য এটা বড় চাপ।”
সরবরাহে সীমাবদ্ধতা/
বিক্রেতা ও ডিলারদের মতে, বাজারে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সরবরাহ করছে খুব কমসংখ্যক প্রতিষ্ঠান। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বাজারে গ্যাস পৌঁছাচ্ছে না।
আমদানিতে ঘাটতি ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি/
খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত বছরের নভেম্বর মাসে দেশে এলপিজি আমদানি প্রায় ৪৪ শতাংশ কমে যায়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি।
বর্তমানে দেশে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। তবে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমদানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি হুমায়ুন রশিদ বলেন,
“বিভিন্ন কারণে আমদানি কমে গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক কিছু জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি বড় কারণ। তবে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। আশা করছি ঈদের আগেই সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।”
মূল্য নির্ধারণে অসামঞ্জস্যতার অভিযোগ/
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির প্রিমিয়াম বা আমদানি ভাড়া ১৬০ ডলার হলেও বিইআরসি তা ১২০ ডলার ধরে মূল্য নির্ধারণ করে। ফলে কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
এই চাপের কারণে ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটরদের কমিশন কমে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।
ভোক্তার প্রশ্ন/
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী দাম কমলেও বাস্তবে যখন সেই সুবিধা পাওয়া যায় না, তখন ভোক্তাদের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়—এলপিজির বাজারে নিয়ন্ত্রণ কোথায়?
ফলে বারবার দাম সমন্বয় ও নীতিগত সিদ্ধান্তের পরও শেষ পর্যন্ত চড়া মূল্যই দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শক্ত নজরদারি, সুষম মূল্য নির্ধারণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি