
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
দেশব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার মধ্যে কুষ্টিয়ায় জ্বালানি তেল (পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল) সংকট অব্যাহত রয়েছে। জেলাজুড়ে অসংখ্য পাম্প বন্ধ রয়েছে, আর যেগুলো খোলা আছে সেগুলোর সামনে দেখা যাচ্ছে শত শত মোটরসাইকেল, সিএনজি, বাস ও ট্রাকের দীর্ঘ লাইন। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছেন না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কুষ্টিয়া শহরের মজমপুর গেট এলাকায় অবস্থিত চারটি পাম্পের মধ্যে দুটিতে (বিআরবি ও মোজাফফর রহমান ফিলিং স্টেশন) তেল সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ। খোলা পাম্পগুলোতে (যেমন কুষ্টিয়া স্টোরস) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাইন থাকছে। একজন মোটরসাইকেল চালক সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ৩০০ টাকার পেট্রোল পাচ্ছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও অনেকে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।
পরিবহন চালকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। বাস, ট্রাক, সিএনজি ও মোটরসাইকেল চালকদের অনেককে পাম্পে বাগবিতণ্ডায় জড়াতে দেখা যাচ্ছে। কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত। সেচ পাম্প চালাতে জ্বালানি না পেয়ে বোরো ধানের ক্ষেত বিপাকে পড়ছে। এক কৃষক জানান, ১৫ কিলোমিটার দূরে গিয়ে মাত্র দুই লিটার তেল সংগ্রহ করতে হয়েছে।
মোটরবাইকারদের কারসাজি/
মোটরবাইকচালকদের কারসাজিকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, একশ্রেণির মোটরসাইকেলচালক কৌশলে একই দিনে একাধিকবার তেল সংগ্রহ করছেন। তারা প্রথমে নির্ধারিত নিয়মে তেল নিয়ে চলে গেলেও কিছুক্ষণ পর পুনরায় লাইনে দাঁড়িয়ে আবার তেল নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে নম্বরপ্লেট আংশিক ঢেকে রাখা বা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিকে চালক হিসেবে দাঁড় করিয়ে এই কাজটি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এতে করে প্রকৃত সাধারণ ক্রেতারা দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ তেল পাচ্ছেন না। বিশেষ করে যারা জরুরি কাজে তেল নিতে আসছেন—যেমন রোগী বহন, কৃষিকাজ বা দৈনন্দিন জীবিকার প্রয়োজনে—তাদের ভোগান্তি আরও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে পাম্প এলাকায় ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে।
পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি মোটরসাইকেলের জন্য বৈধ কাগজপত্র যাচাই এবং চালকের জন্য হেলমেট বাধ্যতামূলক করার কথা থাকলেও তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। জনবল সংকট, অতিরিক্ত ভিড় এবং দ্রুত তেল সরবরাহের চাপের কারণে অনেক সময় নিয়ম ভঙ্গ করলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই সুযোগেই অসাধু কিছু চালক পরিস্থিতির অপব্যবহার করছেন।
এ অবস্থায় স্থানীয়রা প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন, যাতে করে অনিয়ম বন্ধ হয়ে সবার জন্য ন্যায্যভাবে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
খুচরা বিক্রেতাদের সুযোগ গ্রহণ/
জ্বালানি সংকটকে পুঁজি করে একশ্রেণির খুচরা ব্যবসায়ী বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা অবৈধভাবে পেট্রোল ও ডিজেল সংগ্রহ করে চোরাই পথে মজুত রাখছেন এবং পরে সুযোগ বুঝে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছেন। এতে করে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করছে এবং সাধারণ ভোক্তারা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
বিশেষ করে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা-এর বিআইডিসি বাজার এলাকায় এমন অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। সেখানে অবৈধভাবে তেল মজুত ও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছে। একই ধরনের অভিযোগ অন্য এলাকাতেও পাওয়া গেছে, যেখানে প্রতি লিটার পেট্রোল ২৮০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রির ঘটনা ধরা পড়েছে—যা সরকারি নির্ধারিত দামের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এসব অসাধু খুচরা বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও স্থানীয়দের মতে, তা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাদের দাবি, নিয়মিত ও জোরালো অভিযান ছাড়া এই অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়। একইসঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
এদিকে শুধু পেট্রোল-ডিজেলই নয়, এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রিতেও অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত এ ক্ষেত্রেও অভিযান চালিয়ে কয়েকজন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছে। তবে ভোক্তাদের আশঙ্কা, নজরদারি শিথিল হলেই আবারও সিন্ডিকেট চক্র সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের প্রত্যাশা—প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, নিয়মিত মোবাইল কোর্ট এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ন্যায্যমূল্যে জ্বালানি ও গ্যাস পেতে পারেন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও প্রত্যাশা/
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী জ্বালানি পাম্পগুলোতে নিয়মিত তদারকি ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে—কোথাও অনিয়ম ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে জরিমানা ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনের সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়।
তবে কুষ্টিয়া-র স্থানীয়দের মতে, শুধু নিয়ম প্রণয়ন বা বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়; বরং সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তারা মনে করেন, নজরদারির পাশাপাশি জ্বালানির সরবরাহ বৃদ্ধি এবং বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা না আনলে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট শুধু ব্যক্তিগত যাতায়াতেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়েছে কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পরিবহন খাতেও। সেচ পাম্প চালাতে সমস্যা হওয়ায় কৃষকরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন, পরিবহন সংকটে পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, আর ব্যবসায়ীরা পড়ছেন বাড়তি ব্যয়ের চাপে। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান।
এ অবস্থায় স্থানীয়দের প্রত্যাশা—সংকট নিরসনে সরকারি ও বেসরকারি সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হোক। নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর আইন প্রয়োগ, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভোক্তা পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে বলে তারা মনে করছেন।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি