
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
দেশে জ্বালানি সংকট ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতিরও দ্রুত অবনতি ঘটছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়—শহরে সীমিত পরিসরে নিয়ন্ত্রিত লোডশেডিং থাকলেও গ্রামাঞ্চলে তা বেড়েই চলেছে। অনেক এলাকায় দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি কেবল সাময়িক নয়—বরং সামনের দিনগুলোতে সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত কয়েক বছর লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে থাকলেও চলতি গ্রীষ্মে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং আর্থিক সংকট মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতে এক ধরনের বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়েছে, যার ভার শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক উত্তেজনার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া, জ্বালানি আমদানির জন্য ডলার সংকট এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তথ্য অনুযায়ী, দেশের তরল জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে। প্রায় ৫,৫০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ২,১০০ মেগাওয়াটে। এতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ভারত থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের সরবরাহও কমেছে। বিশেষ করে আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসায় পরিস্থিতি আরও সংকুচিত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একটি ইউনিট বন্ধ থাকার বিষয়টি, যা সামগ্রিক সরবরাহকে আরও কমিয়ে দিয়েছে।
সরকারি সূত্র বলছে, বৈশ্বিক সংকটের কারণে জ্বালানি তেল আমদানি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় করা যাচ্ছে না। দেশের প্রধান পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি-তে অপরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন বন্ধ রাখার আশঙ্কা রয়েছে। মার্চ মাসে কোনো অপরিশোধিত তেল আমদানি করা সম্ভব হয়নি, এপ্রিলেও সরবরাহ অনিশ্চিত—যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
এই পরিশোধনাগার থেকে উৎপাদিত ফার্নেস অয়েলের বড় অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনে পড়ে, যা এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্র জানায়, বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ১৩,৫০০ থেকে ১৫,০০০ মেগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করছে। কিন্তু উৎপাদন ঘাটতির কারণে প্রায় ১,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কম সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়েই বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯,০০০ মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে এর বড় অংশই কার্যকর করা যাচ্ছে না। গ্যাসভিত্তিক ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সরবরাহ সীমিত হওয়ায় সেগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের বড় অঙ্কের বকেয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তাদের দাবি, সরকারের কাছে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকার পাওনা রয়েছে। বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় তারা নতুন করে জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলতে পারছেন না। এতে অনেক কেন্দ্রেই জ্বালানির মজুত দ্রুত কমে আসছে, যা ভবিষ্যতে উৎপাদন আরও কমিয়ে দিতে পারে।
মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। গ্রামাঞ্চলে দিনে একাধিক দফায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে—কোথাও কোথাও মোট লোডশেডিংয়ের সময় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তীব্র গরমে এতে মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে বহুগুণ। একই সঙ্গে সেচ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় কৃষি উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
গ্রামীণ জীবনযাত্রা এখন অনেকটাই বিদ্যুৎনির্ভর। পানির মোটর, ফসলের সেচ, ঘরের ফ্যান, টেলিভিশন, ফ্রিজ—সবকিছুই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছেন।
অন্যদিকে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) এবং ডেসকো জানিয়েছে, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে এবং বড় ধরনের লোডশেডিং নেই। তবে কিছু এলাকায় থেমে থেমে সামান্য সময়ের জন্য বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। দোকানপাট ও বিপণিবিতানের সময়সীমা কমানো, অফিস সময়সূচিতে পরিবর্তন এবং অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ১,৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব হতে পারে।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট—জ্বালানি সংকট এখন বিদ্যুৎ খাতে গভীর চাপ সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। শহরে সরবরাহ সচল রাখতে গিয়ে গ্রামে লোডশেডিং বাড়ানো হচ্ছে, ফলে বৈষম্য আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই সংকট আরও তীব্র হবে। সামনে গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়বে—আর সেই চাপ সামাল দিতে না পারলে শহরেও বড় পরিসরে লোডশেডিং ফিরে আসতে পারে।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি