
ড. আমানুর আমানের কলাম/
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া, দি কুষ্টিয়া টাইমস/
কুষ্টিয়া শহরের প্রধানতম ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি বকের মূর্তি প্রথম দেখায় হয়তো কারও চোখে নান্দনিকতার প্রতীক বলে মনে হতে পারে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়—শহরকে আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন করে তোলার একটি প্রচেষ্টা। কিন্তু একটু কাছে গেলেই ধরা পড়ে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। যেখানে একটি কার্যকর ট্রাফিক আইল্যান্ড থাকার কথা ছিল, যেখানে ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে সহজে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন, সেখানে এখন জায়গা দখল করে আছে সেই মূর্তিগুলো। ফলে শহরের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দুই পরিণত হয়েছে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতায়।
এটি শুধু একটি ভুল স্থাপত্য নকশার উদাহরণ নয়; বরং আমাদের নগর পরিকল্পনার গভীরতর অসুস্থতার প্রতিচ্ছবি। এখানে প্রশ্ন শুধু বকের মূর্তি নয়—প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি আমাদের শহরগুলোকে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী গড়ে তুলছি, নাকি শুধুই দেখানোর জন্য সাজিয়ে তুলছি?
একটি ব্যস্ত মোড়ে ট্রাফিক আইল্যান্ডের মূল উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট—যানবাহনের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা, ট্রাফিক পুলিশের জন্য নিরাপদ অবস্থান তৈরি করা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো। অর্থাৎ এটি সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং কার্যকারিতার জন্য নির্মিত হওয়ার কথা। কিন্তু কুষ্টিয়ার ওই মোড়ে বাস্তবতা যেন উল্টো। সেখানে শৃঙ্খলার জায়গা নিয়েছে অলংকরণ, কার্যকারিতার জায়গা নিয়েছে প্রদর্শনমূলক নান্দনিকতা।
ফলে প্রতিদিন সেখানে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে। মাঝখানে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে বকের মূর্তি, আর চারপাশে চলে বিশৃঙ্খল যান চলাচল। ট্রাফিক পুলিশ কখনো রাস্তার এক পাশে, কখনো মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে যান নিয়ন্ত্রণ করেন। প্রশ্ন জাগে—যে স্থাপনা শহরের শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়ক হওয়ার কথা ছিল, সেটাই যদি বাস্তবে বিশৃঙ্খলার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই নান্দনিকতার মূল্য কোথায়?
আসলে আমাদের শহর পরিকল্পনায় একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আমরা “দেখতে সুন্দর” বিষয়টিকে “ব্যবহারিক প্রয়োজন”-এর চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছি। কোনো একটি মোড়, পার্ক বা সড়ককে দৃষ্টিনন্দন করতে গিয়ে প্রায়ই ভুলে যাওয়া হয়, শহর মূলত মানুষের চলাচল, নিরাপত্তা ও ব্যবহারিক সুবিধার জন্য। সৌন্দর্য অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই সৌন্দর্য যদি কার্যকারিতাকে ধ্বংস করে, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম ও ব্যর্থ সৌন্দর্যে পরিণত হয়।
কুষ্টিয়ার এই ঘটনাটি আসলে বাংলাদেশের অধিকাংশ শহরের বৃহত্তর সংকটেরই প্রতীক। এখানে পরিকল্পনা প্রায়ই হয় “উপর থেকে”, বাস্তব ব্যবহারকারীদের কথা চিন্তা না করে। যে ট্রাফিক পুলিশ প্রতিদিন ওই মোড়ে দাঁড়িয়ে কাজ করেন, তার মতামত কি কেউ নিয়েছিল? স্থানীয় মানুষ, চালক বা পথচারীদের প্রয়োজন কি বিবেচনায় আনা হয়েছিল? নাকি কেবল একটি “দৃষ্টিনন্দন প্রকল্প” তৈরি করাই ছিল মূল লক্ষ্য?
সমস্যা হলো, আমাদের উন্নয়ন ধারণায় অনেক সময় “দৃশ্যমানতা” “কার্যকারিতা”-কে ছাপিয়ে যায়। ফলে শহরের বাস্তব প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ফটোজেনিক অবকাঠামো। বড় বড় ভাস্কর্য, রঙিন লাইট, অলংকারমূলক স্থাপনা—এসবের মাধ্যমে উন্নয়নের দৃশ্যমান চিত্র তৈরি করা হয়, কিন্তু নাগরিক সুবিধা কতটা বাড়ছে, সেই প্রশ্নটি আড়ালেই থেকে যায়।
এটি এক ধরনের “প্রতীকী উন্নয়ন”। যেখানে বাস্তব সমস্যার সমাধানের চেয়ে সমস্যাকে ঢেকে রাখার প্রবণতা বেশি। রাস্তার যানজট, অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং, ফুটপাত দখল, ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা—এসব সমাধান না করে মাঝখানে একটি নান্দনিক ভাস্কর্য বসিয়ে দেওয়া হয়, যেন সৌন্দর্যই সমস্যার বিকল্প।
কিন্তু একটি শহর কখনো শুধু সৌন্দর্যে বাঁচে না। একটি শহর বাঁচে তার কার্যকর চলাচল, নিরাপত্তা, নাগরিক স্বস্তি ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। ইউরোপ বা উন্নত বিশ্বের শহরগুলো দৃষ্টিনন্দন শুধু এজন্য নয় যে সেখানে ভাস্কর্য আছে; বরং সেখানে প্রতিটি নকশা মানুষের ব্যবহারিক প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে তৈরি। একটি বেঞ্চ, একটি ফুটপাত, একটি ট্রাফিক আইল্যান্ড—সবকিছুর পেছনে থাকে কার্যকারিতা ও মানবিক ব্যবহারবোধের চিন্তা।
আমাদের এখানে উল্টোটা ঘটে। অনেক সময় স্থাপত্য বা সৌন্দর্যবর্ধনের সিদ্ধান্ত নেন এমন ব্যক্তিরা মাঠের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন। ফলে কাগজে বা থ্রিডি ডিজাইনে সুন্দর দেখানো প্রকল্প বাস্তবে গিয়ে হয়ে ওঠে অকার্যকর। কুষ্টিয়ার ওই মোড় সম্ভবত সেই মানসিকতারই ফল।
এই প্রবণতার আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো—এতে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ কেউ প্রশ্ন তোলে না, একটি ট্রাফিক আইল্যান্ডের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে কি না। বরং “দেখতে সুন্দর হয়েছে”—এই মন্তব্যেই যেন সব সমালোচনা থেমে যায়। অথচ নগর পরিকল্পনার সাফল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত নাগরিক সুবিধা দিয়ে, অলংকার দিয়ে নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ধরনের ভুল পরিকল্পনার মূল্য শেষ পর্যন্ত নাগরিকদেরই দিতে হয়। যখন ট্রাফিক পুলিশ নিরাপদে দাঁড়ানোর জায়গা পান না, তখন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। যানবাহনের প্রবাহ ব্যাহত হয়। পথচারীরা বিভ্রান্ত হন। অর্থাৎ একটি ভুল নকশা পুরো শহরের ছন্দ নষ্ট করতে পারে।
এখানে একটি দার্শনিক প্রশ্নও উঠে আসে—আমরা কি আমাদের শহরগুলোকে “জীবন্ত নগর” হিসেবে দেখি, নাকি “সাজানো প্রদর্শনী” হিসেবে? যদি শহরকে শুধু প্রদর্শনের বস্তু হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সেখানে মানুষের প্রয়োজন ধীরে ধীরে গৌণ হয়ে পড়বে। তখন বাস্তব জীবনকে সরিয়ে জায়গা দখল করবে কৃত্রিম সৌন্দর্য।
বকের মূর্তিগুলো তাই শুধু কয়েকটি অলংকার নয়; এগুলো এক ধরনের প্রতীক। এমন এক মানসিকতার প্রতীক, যেখানে বাস্তব প্রয়োজনকে সরিয়ে রেখে দৃশ্যমান সৌন্দর্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। অথচ প্রকৃত সৌন্দর্য কখনো কার্যকারিতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না। একটি সত্যিকারের সুন্দর শহর সেই শহর, যেখানে সৌন্দর্য ও ব্যবহারিক প্রয়োজন একে অপরের পরিপূরক হয়।
কুষ্টিয়ার এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। শহর পরিকল্পনায় “মানুষ”কে কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে। ট্রাফিক আইল্যান্ড হলে সেটি প্রথমে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর হতে হবে, তারপর সেখানে নান্দনিকতা যোগ করা যেতে পারে। পরিকল্পনার আগে মাঠ পর্যায়ের ব্যবহারকারীদের মতামত নিতে হবে। নগরবিদ, ট্রাফিক বিশেষজ্ঞ, স্থপতি ও স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অন্যথায় আমরা হয়তো আরও অনেক “সুন্দর” মোড় তৈরি করব, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের নিচে লুকিয়ে থাকবে অকার্যকারিতা, বিশৃঙ্খলা ও নাগরিক ভোগান্তি।
একটি শহরের সৌন্দর্য কেবল তার ভাস্কর্যে নয়, তার শৃঙ্খলায়। কেবল তার রঙিন আলোয় নয়, তার নিরাপদ চলাচলে। কেবল তার দৃশ্যমান অলংকরণে নয়, তার মানুষের স্বস্তিতে। যে শহর মানুষের প্রয়োজন ভুলে যায়, সে শহর যতই সাজানো হোক, শেষ পর্যন্ত তার সৌন্দর্য ফাঁপা হয়ে পড়ে।
আর তাই কুষ্টিয়ার সেই ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বকের মূর্তিগুলো যেন আমাদের সামনে এক নীরব প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমরা কি সত্যিই শহর গড়ছি, নাকি কেবল শহরের মুখোশ তৈরি করছি?
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি