

ড. আমানুর আমানের কলাম/
ভূ-রাজনীতির এক অনিবার্য উপাদান হলো প্রতিবেশী রাষ্ট। এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ধারনা কোনক্রমেই ব্যক্তি বা সামাজিক প্রতিবেশীর যে সর্ম্পকের ধারনা একেবারেই তা নয়। ব্যক্তি বা সামাজিক প্রতিবেশী সম্পর্ক মূলত মানবিক ও দৈনন্দিন জীবনের। এখানে সিদ্ধান্ত হয় একে অপরের কেন্দ্রীভূত অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, যেখানে আবেগ ও সহাবস্থান মুখ্য। বিপরীতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিবেশী সম্পর্ক রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট ; বহুমুখী, বাস্তববাদী ও স্বার্থকেন্দ্রিক—এখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ, কৌশল এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে।
আধুনিক রাজনীতি বিজ্ঞান বলছে প্রতিবেশী দেশকে অস্বীকার করে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে না। বিশেষত যখন সেই প্রতিবেশী রাষ্ট্র আকারে, অর্থনীতিতে, সামরিক সক্ষমতায় এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে অনেক বড় হয়, তখন সম্পর্কের প্রশ্নটি শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে অস্তিত্বগত বাস্তবতার অংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারত সেই বাস্তবতারই একটি কেন্দ্রীয় উপাদান।
এখন প্রশ্ন হলো এই বাস্তবতায় সর্ম্পকটি আসলে কি রকম অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বহুমাত্রিক ও জটিল—ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই এই সম্পর্ক গভীরভাবে প্রোথিত। দখলদার ফ্যাসিস্ট পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের ভূমিকা থেকে শুরু করে বর্তমানের বাণিজ্য, জ্বালানি, খাদ্য সরবরাহ ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা স্পষ্ট। একই সঙ্গে এই সম্পর্কের ভেতরে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আস্থার ঘাটতি ও নানা সংবেদনশীল ইস্যুও বিদ্যমান। ফলে সম্পর্কটি একমাত্রিক নয়—এটিকে শুধু “ভালো” বা “খারাপ” হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না; বরং এটি বাস্তব স্বার্থ, প্রয়োজন ও কৌশলগত ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি জটিল পারস্পরিক সম্পর্ক।
এই জটিল বাস্তবতার মাঝেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রায়ই এমন কিছু বক্তব্য উঠে আসে, যা পরিস্থিতিকে সরলীকরণ করে ফেলে। কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী মনে করে, ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর বা আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বললেই জনগণের সমর্থন পাওয়া যাবে এবং সেটিই জাতীয়তাবাদের প্রমাণ। কিন্তু এতে একটি বড় ভুল ধারণা কাজ করে—জাতীয় স্বার্থ রক্ষা আর আবেগতাড়িত বিরোধিতা এক জিনিস নয়।
বাস্তবে, এ ধরনের বক্তব্যের কয়েকটি নেতিবাচক দিক আছে। প্রথমত, এটি জনগণের মধ্যে ভুল বার্তা দেয়—যেন জটিল কূটনৈতিক সম্পর্ককে সহজ শত্রুতা দিয়ে সমাধান করা যায়। দ্বিতীয়ত, এটি দুই দেশের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ ও উত্তেজনা তৈরি করে, যা কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তৃতীয়ত, এই ধরনের ভাষা অনেক সময় রাজনৈতিক স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য ব্যবহার করা হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল করে। সারকথা হলো, বাস্তবতা হচ্ছে—বাংলাদেশকে তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হবে, তবে সেটি করতে হবে বাস্তববাদী, কৌশলী ও দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে; আবেগপ্রবণ বা উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে নয়।
এটিকে ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করা ডেতে পারে।
প্রথমত, শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্নটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত একটি বৃহৎ অর্থনীতি, আঞ্চলিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী রাষ্ট্র। অন্যদিকে বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নশীল হলেও এখনও অনেক ক্ষেত্রে নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ এবং কাঁচামালের একটি বড় অংশ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের মাধ্যমে আসে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অকারণ বিরোধিতা বা উত্তেজনা সৃষ্টি করা কৌশলগতভাবে আত্মঘাতী হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সীমান্তবর্তী বাস্তবতা। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্তগুলোর একটি। এই সীমান্তে প্রতিদিন মানুষ চলাচল করে, পণ্য আদান-প্রদান হয়, এবং নানা ধরনের সামাজিক-অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সীমান্তকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষ। তাদের জীবন-জীবিকা, নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ে। তাই রাজনৈতিক বক্তব্য বা অবস্থান নির্ধারণের সময় এই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
তৃতীয়ত, কূটনৈতিক সম্পর্কের সূক্ষ্মতা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেবল আবেগ দিয়ে পরিচালিত হয় না; এখানে কৌশল, ধৈর্য এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যবহৃত বক্তব্য অনেক সময় আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রতিফলিত হয়। ফলে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য বা উসকানিমূলক ভাষা কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, এমনকি আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
চতুর্থত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির একটি বড় অংশ নির্ভর করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং সহযোগিতার ওপর। ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন চাল, পেঁয়াজ, ডাল, চিনি—এসব ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হঠাৎ করে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হলে এসব সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা প্রয়োজন—ভারতবিরোধিতা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এক জিনিস নয়। বরং অনেক সময় কৌশলগত সহযোগিতা, সংলাপ এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখাই জাতীয় স্বার্থকে সুরক্ষিত করে। একটি পরিণত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উচিত তার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবভিত্তিক নীতি গ্রহণ করা, আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়া নয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশের কোনো স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলেও নীরব থাকতে হবে। বরং প্রয়োজন দৃঢ় কিন্তু পরিমিত কূটনৈতিক অবস্থান। যেখানে যুক্তি, তথ্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে নিজের অবস্থান তুলে ধরা হবে। উত্তেজনামূলক বক্তব্য বা জনতুষ্টিমূলক রাজনীতি এখানে কোনো কার্যকর সমাধান দেয় না; বরং সমস্যা আরও জটিল করে তোলে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো—সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লাভের জন্য ব্যবহার করা। এর ফলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং বাস্তবতার সঙ্গে একটি দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী এবং নীতিনির্ধারকদের এখানে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, প্রতিবেশী বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করে, তেমনি চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসে। এই সম্পর্ককে সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজন পরিণত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, কৌশলগত চিন্তা এবং দায়িত্বশীল ভাষা। অযথা ভারতবিরোধী রাজনীতি সৃষ্টি করে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভ অর্জন করা সম্ভব হলেও, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের পথ হলো--নিজের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে, পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া। কারণ বাস্তবতা হলো, বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে সংঘাতে নয়, বরং কৌশলী সহাবস্থানের মধ্যেই টেকসই উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার পথ নিহিত।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া, দি কুষ্টিয়া টাইমস।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি