
"বিশ্ব মা দিবস: মায়ের মুখেই পৃথিবীর প্রথম আলো"[caption id="attachment_25168" align="alignnone" width="300"]
Oplus_16908288[/caption]
ড. সেলিম তোহা/
মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব মা দিবস। দিনটি কেবল আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের নয়; এটি মানবসভ্যতার সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে নির্ভরতার সম্পর্কটির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন। পৃথিবীর ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম, সাহিত্য—সবকিছুর কেন্দ্রেই মা এক অনিবার্য উপস্থিতি। কারণ মানুষ পৃথিবীকে প্রথম চিনতে শেখে মায়ের চোখ দিয়ে, ভালোবাসা বুঝতে শেখে মায়ের স্পর্শে, আর নিরাপত্তা খুঁজে পায় মায়ের ছায়ায়।
মা শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি আশ্রয়ের নাম, একটি নীরব শক্তির নাম। সন্তানের জীবনের প্রতিটি সাফল্যের আড়ালে যে অদৃশ্য ত্যাগ লুকিয়ে থাকে, তার বড় অংশটিই বহন করেন একজন মা। তাই যুগে যুগে মনীষীরা মায়ের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ আসনে বসিয়েছেন।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও শ্রদ্ধার গুরুত্ব বোঝাতে বলেছেন— “মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।” এই বাণীর গভীরে কেবল ধর্মীয় আবেগ নয়, মানবিক সভ্যতার এক চিরন্তন সত্য নিহিত আছে।
মা সম্পর্কে গৌতম বুদ্ধ বলেছেন, “মা-বাবা সন্তানের প্রথম শিক্ষক; তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সেবা মানবজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্ম।”
অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাকে তুলনা করেছেন ঘরের আলোর সঙ্গে—“মা ঘরের সেই আলো, যে আলো নিভে গেলে পৃথিবীর অনেক কিছুই অন্ধকার হয়ে যায়।”
একইভাবে আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, “আমি যা কিছু হয়েছি কিংবা হতে পেরেছি, তার সবকিছুর জন্য আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী।” পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম ও দর্শন—সবখানেই মা তাই সর্বজনীন শ্রদ্ধার প্রতীক।
প্রকৃতপক্ষে, একজন মায়ের ভালোবাসা, ত্যাগ ও প্রেরণাই মানুষকে মানবিক, আলোকিত ও পরিপূর্ণ করে তোলে।
আজকের পৃথিবীতে মা দিবসের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। প্রযুক্তি মানুষকে কাছে এনেছে, কিন্তু সম্পর্ককে অনেক সময় দূরে সরিয়ে দিয়েছে। বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে, পরিবারে আবেগের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, ব্যস্ততার কাছে হার মানছে আন্তরিকতা। এই বাস্তবতায় মা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মায়ের প্রতি ভালোবাসা কেবল একটি দিনের অনুভূতি নয়; এটি প্রতিদিনের দায়িত্ব, প্রতিদিনের কৃতজ্ঞতা।
বিশ্ব মা দিবস নিয়ে লিখতে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার মায়ের প্রসঙ্গ অনিবার্যভাবেই চলে আসে। কারণ ১০ মে আমার মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০১ সালের এই দিনেই ভোরবেলা ফজরের নামাজরত অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। বাবা তাঁকে জায়নামাজে দেখেছিলেন। নামাজের কোন মুহূর্তে তিনি বুকে ব্যথা অনুভব করেছিলেন, তা আর জানা সম্ভব হয়নি। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি ইহলোকের সমস্ত মায়া ত্যাগ করে চলে যান। মৃত্যুর প্রায় ছয় মাস আগে তিনি একদিন আমাকে বলেছিলেন, “আমি চলে যাবো, তোমরা কেউ টের পাবা না বাবা।” আশ্চর্যভাবে, ঠিক তেমন করেই তিনি চলে গেলেন—আমাদের পাঁচ ভাইবোনের কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে।
আমার মা ছিলেন এক জীবনসংগ্রামী মহীয়সী নারী। বাবা ছিলেন সমাজ উন্নয়নে নিবেদিত, অনেকটা সংসার-উদাসীন মানুষ। ফলে সংসারের সমস্ত দায়িত্ব, সন্তানদের মানুষ করা এবং নানান সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পরিবারকে সুন্দরভাবে এগিয়ে নেওয়ার পুরো দায়িত্বই মাকে বহন করতে হয়েছে।
তিনিই ছিলেন আমার প্রথম শিক্ষক, প্রথম শাসক, প্রথম নির্ভরতার জায়গা। আমাদের প্রয়োজন, স্বপ্ন, শিক্ষা—সবকিছুর নেপথ্যে ছিল তাঁর নিরন্তর শ্রম ও ত্যাগ।
তবে তিনি কেবল একজন সংসারী মা ছিলেন না; ছিলেন সমাজসচেতন একজন আলোকিত মানুষও। নিজ এলাকায় নারীদের শিক্ষা বিস্তার, কুসংস্কার দূর করা এবং অন্ধকার থেকে আলোর পথে মানুষকে নিয়ে আসার কাজে তিনি নিরবে কাজ করেছেন। হয়তো ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম লেখা থাকবে না, কিন্তু বহু মানুষের জীবনবোধে তিনি রেখে গেছেন আলোর দাগ।
প্রতিটি মায়ের জীবনেই থাকে অদেখা সংগ্রাম, অব্যক্ত কষ্ট, নিঃশব্দ ত্যাগ। একজন মা নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্ন গড়ে তোলেন। সন্তানের মুখের হাসির জন্য নিজের ক্লান্তি লুকিয়ে রাখেন। পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নাম তাই মা।
বিশ্ব মা দিবসে পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের প্রতি ভালোবাসা ও যত্ন আরও বাড়ুক। আর যাঁরা চলে গেছেন, তাঁরা বেঁচে থাকুন তাঁদের সন্তানদের স্মৃতি, আদর্শ ও প্রার্থনায়।
কারণ মানুষ যত বড়ই হোক, মায়ের শূন্যতা কখনও পূরণ হয় না। মায়ের অনুপস্থিতি আসলে জীবনের এক নীরব অপূর্ণতা, যা হৃদয়ের গভীরে আজীবন থেকে যায়।
লেখক: ড. সেলিম তোহা, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি