

ড. আমানুর আমানের কলাম/
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদী, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা বহু প্রতীক্ষিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অবশেষে বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। প্রায় ছয় দশক ধরে এ প্রকল্প ঘিরে উঠেছে জনদাবি, হয়েছে অসংখ্য সমীক্ষা, এসেছে নানা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি—তবু স্বপ্নটি বারবার থেমে গেছে কাগজে-কলমেই। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও অনিশ্চয়তার পর অবশেষে সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেতে চলেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রায় সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকার এই বৃহৎ প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে।
পদ্মা ব্যারাজের ধারণা নতুন নয়। পাকিস্তান আমলের ১৯৬০-এর দশক থেকেই পদ্মা অববাহিকার পানি সংরক্ষণ ও শুষ্ক মৌসুমে নদীতে প্রবাহ ধরে রাখার জন্য একটি বৃহৎ ব্যারাজ নির্মাণের আলোচনা শুরু হয়। পানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিলেন, বিশেষ করে, গঙ্গা-পদ্মার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের নদীগুলো ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ছে।
১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। শুকনো মৌসুমে পদ্মায় পানিপ্রবাহ কমতে শুরু করলে গড়াই, মধুমতি, বড়াল, ইছামতি, চন্দনা, মাথাভাঙ্গাসহ অসংখ্য নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। নদীগুলোতে পলি জমে নাব্যতা কমে যায়, দেখা দেয় তীব্র পানি সংকট। কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, বর্ষাকালে পদ্মার বিপুল পানি সংরক্ষণ করে শুকনো মৌসুমে নিয়ন্ত্রিতভাবে সরবরাহ করতে পারলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট অনেকাংশে দূর করা সম্ভব।
বিগত কয়েক দশকে বিভিন্ন সরকার পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে আলোচনা করলেও প্রকল্পটি আর বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। সমীক্ষা হয়েছে, সম্ভাব্যতা যাচাই হয়েছে, বিদেশি বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়েছেন—কিন্তু প্রকল্পটি কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
বর্তমান সরকার নির্বাচনের আগে রাজশাহীর জনসভায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেয়। পরে ক্ষমতায় এসে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক পর্যায়ের যাচাই-বাছাই শেষে এখন তা একনেক অনুমোদনের অপেক্ষায়।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আর কোনো দ্বিমত নেই। এটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; বরং পানি নিরাপত্তা, খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ রক্ষা ও আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় প্রকল্প।
প্রকল্পের প্রথম ধাপে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা নদীর রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় নির্মিত হবে মূল ব্যারাজ। এর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট ও ১৮টি আন্ডার স্লুইস গেট।
নৌযান চলাচলের জন্য রাখা হবে ১৪ মিটার প্রশস্ত নেভিগেশন লক এবং মাছ চলাচলের সুবিধার্থে নির্মাণ করা হবে দুটি ফিশ পাস। এছাড়া গড়াই অফটেক স্ট্রাকচার, চন্দনা নদীর মুখে কন্ট্রোল স্ট্রাকচার, বিভিন্ন নদী পুনঃখনন, ড্রেজিং ও পানি সংরক্ষণ অবকাঠামোও নির্মিত হবে।
প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জলবিদ্যুৎ উৎপাদন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যারাজ ও গড়াই অংশে হাইড্রোপাওয়ার প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে বছরে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।
৬২৩ নদীতে ফিরতে পারে প্রাণ
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো পুনরুজ্জীবিত করা। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পদ্মা ও যমুনা অববাহিকার হিসনা, মাথাভাঙ্গা, গড়াই, মধুমতি, বড়াল, চন্দনা, ইছামতিসহ প্রায় ৬২৩টি ছোট-বড় নদী নতুন করে পানিপ্রবাহ পাবে।
শুকনো মৌসুমে ব্যারাজ থেকে প্রতি সেকেন্ডে অন্তত ৫৭০ ঘনমিটার পানি ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে নদীগুলোর নাব্যতা বাড়বে, পলি অপসারণ সহজ হবে এবং প্রাকৃতিক জলাধারগুলোতে পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৪৭ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে। এতে শুধু এক ফসলি জমিই নয়, অনেক এলাকায় বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় বড় প্রভাব
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটে ভুগছে। অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। সুপেয় পানির সংকটও তীব্র হয়েছে।
পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে কৃষিতে এর বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ধান, পাট, গম, ভুট্টা, সবজি ও ফলচাষে সেচের নিশ্চয়তা তৈরি হবে। একই সঙ্গে মাছ উৎপাদনও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি নিশ্চিত করা গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল আবারও দেশের অন্যতম কৃষি সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।
প্রকল্পটির আরেকটি বড় গুরুত্ব রয়েছে পরিবেশগত দিক থেকে। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার ক্রমেই বাড়ছে। নদীতে স্বাদু পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে।
পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে নদীতে স্বাদু পানির প্রবাহ বাড়লে লবণাক্ততা কমবে। এতে সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থা রক্ষা পাবে, জীববৈচিত্র্য টিকে থাকবে এবং বনাঞ্চলের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
এছাড়া যশোরের ভবদহসহ জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলোর নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশয়ও আছে/
তবে সম্ভাবনা ও জনআকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি এত বড় প্রকল্পকে ঘিরে নানা প্রশ্ন, উদ্বেগ ও সংশয়ও রয়েছে। পরিবেশবিদদের একাংশ মনে করছেন, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের আগে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা, নদীর গতিপ্রকৃতি এবং সামগ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন। তাদের আশঙ্কা, সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া বড় ধরনের অবকাঠামোগত হস্তক্ষেপ নদীর প্রাকৃতিক চরিত্র বদলে দিতে পারে। কোথাও কোথাও পলি জমে নতুন নাব্যতা সংকট, নদীপথ পরিবর্তন কিংবা জলাবদ্ধতার মতো জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশেষ করে নদীনির্ভর জীববৈচিত্র্য, মাছের প্রজনন ক্ষেত্র এবং নিম্নাঞ্চলের প্রাকৃতিক জলাধারগুলোর ওপর প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে সতর্ক বিশ্লেষণের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও প্রকল্পে ফিশ পাস ও নিয়ন্ত্রিত প্রবাহের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তবুও প্রকৃতিতে এর বাস্তব কার্যকারিতা কতটা হবে, সেটিও পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, উজানের পানিপ্রবাহের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক পানি-রাজনীতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ প্রকল্পের বিপুল ব্যয় নিয়েও সতর্ক থাকার কথা বলেছেন। প্রায় সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকার প্রথম ধাপের এই প্রকল্প ভবিষ্যতে আরও বড় ব্যয়ে গড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশে এর আগেও বেশ কিছু বৃহৎ প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি, বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং দুর্বল তদারকির নজির রয়েছে। ফলে পদ্মা ব্যারাজের মতো একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে এসব উদ্বেগের মধ্যেও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ আশাবাদী। তাদের মতে, পরিকল্পিত উপায়ে বাস্তবায়ন করা গেলে পদ্মা ব্যারাজ শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি দেশের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদন, নদী পুনরুজ্জীবন এবং জলবায়ু অভিযোজন কৌশলে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, সঠিক পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করা গেলে পদ্মা ব্যারাজ বাংলাদেশের পানি ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও রূপান্তরমূলক প্রকল্পগুলোর একটিতে পরিণত হতে পারে।
নতুন সম্ভাবনার দ্বার/
বাংলাদেশের নদীমাতৃক পরিচয় আজ নানা সংকটে আক্রান্ত। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, অন্যদিকে উজানের পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো ক্রমেই অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
এ বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারাজ শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি বহু মানুষের বেঁচে থাকা, কৃষকের ফসল, নদীর প্রাণ, পরিবেশের ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বৃহৎ জাতীয় উদ্যোগ।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এখন দেখার বিষয়—একনেকের অনুমোদনের পর প্রকল্পটি কত দ্রুত এবং কতটা দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়। কারণ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের কাছে পদ্মা ব্যারাজ এখন আর কেবল একটি প্রকল্প নয়, এটি বহুদিনের এক স্বপ্নের নাম।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি