

ড. আমানুর আমানের কলাম/
বাংলাদেশে আজ এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছে। সেই নীরবতার ভেতরে প্রতিদিন অসংখ্য শিশুর কান্না হারিয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় জীবনের স্বপ্ন। হাম নামের এই প্রতিরোধযোগ্য রোগ এখন দেশে ভয়াবহভাবে মৃত্যুকূপ তৈরি করেছে। গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই ছড়িয়ে পড়ছে এই সংক্রমণ, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে শিশুমৃত্যু ও মৃত্যুঝুঁকি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ভয়াবহ বাস্তবতা যেন আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের কাছে প্রায় স্বাভাবিক একটি ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
হাম এখন শুধু একটি রোগ নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সারাদেশে প্রায় ৫০ হাজার শিশুর এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংখ্যাটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি হাজারো মায়ের বুকফাটা আহাজারি, অসংখ্য পরিবারের অশ্রু, আর ভবিষ্যতের প্রতি এক নির্মম আঘাত। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও অসংখ্য শিশুর নিঃশ্বাস থেমে যাচ্ছে, কিন্তু সেই থেমে যাওয়ার শব্দ যেন রাষ্ট্রের করিডোর পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না।
কথা হলো এই হাম এমন কোনো নতুন রোগ নয়। এটি প্রতিরোধযোগ্য, টিকা দিয়ে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য একটি রোগ। তবুও কেন আমরা আবার এই অন্ধকারে ফিরে গেলাম? কেন আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়ল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেয়ে আমরা যেন মৃত্যুর সংখ্যার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। শিশু মারা যাচ্ছে, সংবাদ হচ্ছে, কিছু আলোচনা হচ্ছে, তারপর আবার সবকিছু আগের মতো—নীরব, নিষ্প্রাণ।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এই সংকটের জন্য যারা নীতিনির্ধারণ, বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্বে আছেন—তাদের জবাবদিহির জায়গাটি প্রায় অনুপস্থিত। রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, টিকাদান কাভারেজে ঘাটতি, এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে নীতির বিচ্ছিন্নতা—এসব কাঠামোগত সমস্যার কোনো সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন জনসমক্ষে আসে না। ফলে সংকটটি যেন কেবল “সংক্রমণ” হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু এর পেছনের প্রশাসনিক ও নীতিগত ব্যর্থতা আড়ালেই থেকে যায়। রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে কার্যকর উচ্চবাচ্য নেই বললেই চলে। জাতীয় সংসদ, দলীয় ফোরাম কিংবা জনমুখী রাজনৈতিক বক্তব্যে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা বা হামের পুনরুত্থান নিয়ে তেমন কোনো অগ্রাধিকারভিত্তিক আলোচনা দেখা যায় না। স্বাস্থ্য সংকটের এই তীব্রতা যেন নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রীয় এজেন্ডায় প্রবেশই করতে পারছে না।
অন্যদিকে, সরকারের বড় বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাজেট বিতর্ক, উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো সম্প্রসারণ কিংবা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। কিন্তু যেই রাষ্ট্রে প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে শিশুদের মৃত্যু বাড়ছে, সেখানে জনস্বাস্থ্যের মৌলিক প্রশ্ন—“কেন টিকা কাভারেজে ঘাটতি তৈরি হলো?” বা “কেন প্রতিরোধ ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি?”—এসব প্রশ্ন প্রায় অনুচ্চারিতই থেকে যাচ্ছে। ফলে এক ধরনের ভয়াবহ স্বাভাবিকীকরণ তৈরি হচ্ছে—যেন শিশু মৃত্যু এখন আর জরুরি সংকেত নয়, বরং একটি পুনরাবৃত্ত সংবাদমাত্র। এই নীরবতা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি এক ধরনের নৈতিক সংকটও, যেখানে মানবজীবনের মূল্য নীতিগত অগ্রাধিকারের তালিকায় যথাযথ স্থান পাচ্ছে না।
স্বাস্থ্যখাতে টিকা কর্মসূচি যে একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে সফল ও গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমগুলোর একটি ছিল, তা আমরা প্রায় ভুলে গেছি। অতীতে বাংলাদেশ টিকাদান কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই অগ্রগতির ভিত যেন দুর্বল হয়ে পড়েছে। কোথাও সরবরাহ সংকট, কোথাও সচেতনতার অভাব, কোথাও প্রশাসনিক অব্যবস্থা—সব মিলিয়ে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ আবার প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হাম ও রুবেলা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ লাভ করে। ২০১৪ সালে দেশব্যাপী “Measles-Rubella (MR) Campaign” চালু করা হয়, যার মাধ্যমে কয়েক কোটি শিশুকে একযোগে টিকার আওতায় আনা হয়। পরবর্তীতে নিয়মিত ইপিআই (Expanded Programme on Immunization) কার্যক্রমকে শক্তিশালী করা হয় এবং ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত টিকাদান কেন্দ্র বিস্তৃত করা হয়। স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে প্রচারণা বাড়ানো হয়, যাতে টিকা গ্রহণের হার বৃদ্ধি পায়। এছাড়া জন্মনিবন্ধনের সঙ্গে টিকাদান তথ্য সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ভ্রাম্যমাণ টিকাদান কার্যক্রমও চালু রাখা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সহায়তায় টিকা সরবরাহ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়। এসব উদ্যোগের ফলে একসময় বাংলাদেশে হাম ও রুবেলার সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে এবং টিকাদান কাভারেজ ৯০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
বিগত ইন্টেরিম সরকারের সময়ে হাম নিয়ন্ত্রণে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। পূর্বে টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে যে উচ্চ কাভারেজ অর্জিত হয়েছিল, তা ধরে রাখা ও আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে টিকা পৌঁছানো, নিয়মিত মনিটরিং এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থায় ঘাটতির কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। একই সঙ্গে রোগ নজরদারি ব্যবস্থা (surveillance system) আগের মতো কার্যকরভাবে সক্রিয় রাখা যায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। জনস্বাস্থ্য সংকটকে সময়মতো জাতীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে আনা এবং সমন্বিত জরুরি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা দেখা গেছে। ফলে প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ আবারও শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়েছে, যা প্রশাসনিক সক্ষমতা ও নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণের দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। এ পরিস্থিতি জনপরিসরে বিগত ইন্টেরিম সরকারের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোন কমিটি গঠিত হলো না। দায়ীদের চিহ্নিত করতে। ঐ ইন্টেরিম শুধু বিগত আওামী সরকারের দোষ ধরার কাজে লিপ্ত ছিল।
ইন্টেরিম সরকারের সময়ে হাম টিকা সংগ্রহে ওপেন টেন্ডার পদ্ধতি অনুসরণ করার উদ্যোগকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। কারণ টিকাদান কর্মসূচিতে সময়মতো সরবরাহ, সংরক্ষণ ও মান নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ওপেন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা, সরবরাহে বিলম্ব এবং গুণগত মান যাচাইয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি টিকা সংগ্রহে দেরি হলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়। সমালোচকদের মতে, পূর্বের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাপ্লাই চেইন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত দ্রুত ক্রয় পদ্ধতি (emergency procurement) বজায় রাখা বেশি কার্যকর হতো। ফলে এ সিদ্ধান্তকে অনেকেই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত ভুল হিসেবে উল্লেখ করছেন।
হাম এখন শুধু একটি রোগ নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। একটি শিশুর জ্বর, র্যাশ, শ্বাসকষ্ট—এসব উপসর্গ যখন মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়, তখন তা কেবল চিকিৎসার ব্যর্থতা নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যর্থতা, একটি নৈতিক ব্যর্থতা। আমরা কি এতটাই অসংবেদনশীল হয়ে গেছি যে শিশুদের মৃত্যু আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না? আরও ভয়ংকর বিষয় হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। হাম শনাক্ত হচ্ছে, মৃত্যু শনাক্ত হচ্ছে, কিন্তু দায়ী কারা—এই প্রশ্নটি যেন অদৃশ্য। স্বাস্থ্য প্রশাসন, নীতিনির্ধারক, স্থানীয় প্রশাসন—কেউই যেন পুরোপুরি দায় নিচ্ছে না। তদন্ত হয়, রিপোর্ট হয়, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন কোথায়? একটি শিশুর মৃত্যুর পর যে কাঠামোগত বিশ্লেষণ হওয়ার কথা ছিল, তা প্রায়ই কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
গ্রামাঞ্চলে অনেক মা এখনো জানেন না হাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে, কিংবা সময়মতো টিকা না দিলে কী বিপদ অপেক্ষা করছে। শহরের বস্তি এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার অভাব আরও প্রকট। এই অবহেলা কি কেবল অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, নাকি অগ্রাধিকারহীনতার ফল? যখন উন্নয়ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়, তখন শিশুদের টিকা নিশ্চিত করার মতো মৌলিক কাজ কেন বারবার ব্যর্থ হয়?
রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতাও এখানে গভীরভাবে ভাবনার বিষয়। ক্ষমতাসীন হোক বা বিরোধী—কারও বক্তব্যে শিশু মৃত্যুর এই সংকট তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। অথচ এটি কোনো দলীয় ইস্যু নয়, এটি মানবিক ইস্যু, জাতিগত সংকট। একটি শিশুর মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি পরিবারের ভেঙে পড়া পৃথিবী।
আমরা যদি সত্যিই সভ্যতা, উন্নয়ন, মানবিক রাষ্ট্রের কথা বলি, তবে শিশুদের বাঁচানোই হতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। হাসপাতালের শয্যা, টিকা কর্মসূচির শক্তিশালী বাস্তবায়ন, মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয়তা এবং জনসচেতনতা—এসব ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই নয়।
আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আমরা কি এই মৃত্যুর মিছিলকে স্বাভাবিক করে তুলেছি? যদি তাই হয়, তবে এটি কেবল স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়, এটি আমাদের মানবিকতার পরাজয়।
প্রতিটি শিশু একটি সম্ভাবনা, একটি ভবিষ্যৎ। তাদের মৃত্যু মানে শুধু একটি জীবন শেষ হওয়া নয়, একটি সম্ভাবনার পৃথিবী নিভে যাওয়া। এই বাস্তবতা যদি আমাদের নাড়া না দেয়, তবে আমাদের উন্নয়ন, আমাদের অগ্রগতি সবই কাগুজে সাফল্য ছাড়া আর কিছুই নয়।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি