
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বহুল আলোচিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর। এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় শুরু হচ্ছে দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) ৯০তম বৈঠক, যেখানে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির পুনর্নবীকরণই হতে যাচ্ছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বৃহস্পতিবার (২১ মে) শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এ বৈঠক চলবে আগামী শনিবার পর্যন্ত।
বুধবার বৈঠকে অংশ নিতে কলকাতায় পৌঁছেছে বাংলাদেশের ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দল। বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন যৌথ নদী কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ আনোয়ার কবির। প্রতিনিধিদলে আরও রয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাউথ এশিয়া উইংয়ের পরিচালক মোহাম্মদ বাকি বিল্লাহ, দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর (পলিটিক্যাল) মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন এবং কলকাতার বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি (পলিটিক্যাল) মোহাম্মদ ওমর ফারুক আকন্দ।
ভারতের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির জলসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেচ দপ্তরের একজন প্রধান প্রকৌশলী।
বাংলাদেশ-ভারত পানিবণ্টন ইস্যুর ইতিহাস মূলত ফারাক্কা বাঁধকে ঘিরে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কায় গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত এই বাঁধ ১৯৭৫ সালে চালু করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা করা। তবে বাঁধ চালুর পর থেকেই বাংলাদেশে গঙ্গার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে।
বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পানির অভাবে দেখা দেয় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদী ভাঙন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়। ফলে স্বাধীনতার পর থেকেই বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ইস্যুতে পরিণত হয়।
দীর্ঘ আলোচনা শেষে ১৯৯৬ সালের ঐতিহাসিক চুক্তি/
দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়ার উপস্থিতিতে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তিকে সে সময় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়েছিল।
চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে—এই শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানিপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে দুই দেশ পানি ভাগাভাগি করে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পানির প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক এবং অবশিষ্ট পানি পাবে বাংলাদেশ। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পাবে ৪০ হাজার কিউসেক এবং বাকি অংশ পাবে ভারত। আর প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ সমানভাবে পানি ভাগ করে নেবে।
চলতি বছরের শেষেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবারের জেআরসি বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ নতুন করে চুক্তি নবায়ন না হলে আগামী বছর থেকে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, উজানে পানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে ভবিষ্যতে পানিবণ্টন আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই নতুন চুক্তিতে শুধু পানির হিস্যা নয়, নদী ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং তথ্য বিনিময়ের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেতে পারে।
বৈঠকের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল মুর্শিদাবাদে গিয়ে ফারাক্কা এলাকায় গঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ পরিমাপ করবেন। পরে শুক্রবার তারা কলকাতায় ফিরে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় অংশ নেবেন। কলকাতার একটি অভিজাত হোটেলে শুক্র ও শনিবার মূল বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৪টি। এসব নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ও বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে যৌথ নদী কমিশন। তবে তিস্তার পানিবণ্টনসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
এ অবস্থায় গঙ্গা পানিচুক্তির ভবিষ্যৎ এবং দুই দেশের মধ্যে আস্থাভিত্তিক পানি কূটনীতি জোরদারে এবারের বৈঠক বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি