
>
ড. আমানুর আমানের কলাম
বাংলাদেশে কোরবানির ঈদ কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতারও একটি প্রতীকী প্রকাশ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই চিত্রে একটি মৌলিক পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠছে—এককভাবে পশু কোরবানি দেওয়ার পরিবর্তে “ভাগে কোরবানি” দেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একসময় যা ছিল মূলত গ্রামীণ যৌথ সংস্কৃতির অংশ, এখন তা নগর জীবনের মধ্যবিত্ত সংকটের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে, বড় গরুর চাহিদা ক্রমশ কমছে। তার বদলে জনপ্রিয় হচ্ছে তুলনামূলক ছোট ও মাঝারি আকারের গরু এবং ভাগে কোরবানির প্যাকেজ। বিশেষ করে দেড় লাখ টাকার আশপাশের গরু এবং ২৭ থেকে ৪০ হাজার টাকার ভাগ কোরবানির অংশ এখন বাজারে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন। এই পরিবর্তন শুধু বাজারের নয়, বরং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার গভীর সংকেত বহন করছে।
ব্যবসায়ী আব্দুল মান্নানের অভিজ্ঞতা এই পরিবর্তনের একটি বাস্তব উদাহরণ। একসময় তিনি তার ভাইয়ের সঙ্গে মিলে এককভাবে গরু কোরবানি দিতেন। কিন্তু গত চার বছর ধরে তারা ভাগে কোরবানি করছেন। তিনি জানান, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। এখন আর কোরবানি কেবল ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং হিসাব-নিকাশের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতা মধ্যবিত্ত ঘরানার আলমগীর হোসেন ভুইয়ার। তিনি এখন সাতজনের অংশীদার হয়ে কোরবানি দেন। তার ভাষায়, আয় বাড়লেও টাকার প্রকৃত মূল্য কমে গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় এমনভাবে বেড়েছে যে, বড় পশু এককভাবে কোরবানি দেওয়া এখন অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ভাগে কোরবানি এখন কেবল সুবিধা নয়, বরং আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার একটি উপায়।
খামারি ও ব্যবসায়ীদের তথ্য বলছে, বড় গরুর চাহিদা কমলেও মাঝারি গরুর চাহিদা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। কিছু খামারে ভাগে কোরবানির বিক্রি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন। ফলে কোরবানির পশুর দামও বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে, যা সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধিকে ছাপিয়ে গেছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি।
বিশেষ করে সরকারি চাকরিজীবীরা এখন এক ধরনের নীরব আর্থিক চাপের মধ্যে আছেন। নামমাত্র বেতন বৃদ্ধি পেলেও তা মূল্যস্ফীতির তুলনায় যথেষ্ট নয়। ফলে মাসিক ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে ঈদের মতো বড় খরচের ক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে হচ্ছে। এককভাবে কোরবানি দেওয়া অনেকের জন্য এখন বিলাসিতার মতো হয়ে উঠেছে।
তবে ভাগে কোরবানির এই প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক সংকটের ফল নয়, এর সঙ্গে সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনও যুক্ত। শহুরে জীবনে পারিবারিক এককতা বৃদ্ধি, যৌথ পরিবার ব্যবস্থার ভাঙন এবং ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে মানুষ এখন সহজ ও যৌথ সমাধানের দিকে ঝুঁকছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি সুবিধাজনক ব্যবস্থাপনাও বটে—গরু কেনা, জবাই, মাংস বিতরণ—সব কিছুই এখন সংগঠিত প্যাকেজ আকারে পাওয়া যাচ্ছে।
তবুও মূল বাস্তবতা হলো, এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে ক্রয়ক্ষমতার সংকোচন। আগে যেখানে মানুষ সামাজিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে বড় গরু কিনত, এখন সেখানে প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে “সামর্থ্য অনুযায়ী অংশগ্রহণ”। ফলে কোরবানির অর্থনৈতিক ও সামাজিক চরিত্র ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানসিক চাপ। অনেক পরিবারই এখন কোরবানিকে ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি আর্থিক বোঝা হিসেবে দেখছে। ফলে ঈদের আনন্দের সঙ্গে এক ধরনের হিসাবি উদ্বেগ যুক্ত হচ্ছে। এটি মধ্যবিত্ত জীবনের একটি নতুন বাস্তবতা, যেখানে ধর্মীয় উৎসবও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাইরে নয়।
খামারিরাও বলছেন, এখন মানুষ বড় গরুর বদলে ১ লাখ ৪০ থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার মাঝারি গরুর দিকে ঝুঁকছে। কারণ এসব গরু ভাগে নেওয়া সহজ, খরচ কম এবং ব্যবস্থাপনাও সুবিধাজনক। আবার খাসির ক্ষেত্রেও ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার মাঝারি আকারের পশুর চাহিদা বেশি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা চাহিদার তুলনায় বেশি হলেও বাজারের বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ সমস্যা সরবরাহের নয়, বরং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার। পশু থাকলেও তা কেনার সক্ষমতা অনেকের নেই।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভাগে কোরবানি এখন কেবল একটি বিকল্প ব্যবস্থা নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি স্পষ্ট সামাজিক প্রতিফলন। এটি একদিকে গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত সংকোচনের বাস্তব চিত্রও তুলে ধরছে।
শেষ পর্যন্ত এই পরিবর্তন আমাদের অর্থনীতির একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে—উন্নয়ন কি কেবল সংখ্যার হিসাব, নাকি মানুষের বাস্তব ক্রয়ক্ষমতার প্রতিফলন? কোরবানির বাজারের এই পরিবর্তন সেই প্রশ্নকেই আরও তীক্ষ্ণ করে তুলছে।
ড. আমানুর আমান: লেখক, গবেষক; সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি