
ড. আমানুর আমানের কলাম
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত বহু বছর ধরে একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকটের কারণ কেবল জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য বা বৈদেশিক মুদ্রার চাপ নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের নীতিগত ভুল, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, অস্বচ্ছ চুক্তি, দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতার অভাব। অথচ এসব মৌলিক সমস্যার সমাধান না করে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সংকট মোকাবেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ঘোষিত বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সেই পুরনো পথেই হাঁটার আরেকটি উদাহরণ।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম প্রায় ২০ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে প্রায় ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সঞ্চালন চার্জও প্রায় ২৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ফলে বিদ্যুতের ব্যয় শুধু গৃহস্থালি গ্রাহকের ক্ষেত্রেই নয়, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়বে সমগ্র অর্থনীতিতে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মূল্যবৃদ্ধির আওতা থেকে লাইফলাইন গ্রাহকদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি। সাধারণত নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিদ্যুতের একটি স্বল্পমূল্যের সুবিধা হিসেবে লাইফলাইন ট্যারিফ চালু করা হয়েছিল। কিন্তু এবার তাদের বিদ্যুতের দামও প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ২০১০ সালে প্রথম ৫০ ইউনিট বিদ্যুতের জন্য প্রতি ইউনিট মূল্য ছিল ২ টাকা ৫০ পয়সা। বর্তমানে তা বেড়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ গত ১৬ বছরে নিম্ন আয়ের মানুষের বিদ্যুতের ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। প্রশ্ন হলো, সামাজিক সুরক্ষার এই ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকুও যদি মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে রক্ষা না পায়, তাহলে প্রান্তিক মানুষের স্বার্থ রক্ষা করবে কে?
মূলত বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটের শিকড় খুঁজতে হলে গত দেড় দশকের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোর দিকে তাকাতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর নামে অসংখ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এর অনেকগুলোই ছিল ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর। চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা সৃষ্টি হওয়ায় সরকারকে বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও কেন্দ্রগুলোর মালিকদের অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে। এই ব্যবস্থার ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
একই সময়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি হলে তার অভিঘাতও সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে এসে পড়েছে। অথচ দেশীয় জ্বালানি সম্পদের উন্নয়ন এবং বিকল্প জ্বালানির প্রসারে কার্যকর উদ্যোগ খুব কমই দেখা গেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন, ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো, অদক্ষ কেন্দ্র বন্ধ করা, দুর্নীতি ও অপচয় রোধ এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই সংস্কার দৃশ্যমান হয়নি। ফলে যে সমস্যাগুলোর কারণে খাতটি লোকসানের মধ্যে রয়েছে, সেগুলো আগের মতোই বহাল রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বারবার বলে আসছেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ এতে সাময়িকভাবে রাজস্ব বাড়লেও মূল সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থেকে যায়। বরং মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে, কৃষকের সেচ খরচ বৃদ্ধি পায়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা চাপে পড়েন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যায়। বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতির যে চাপ রয়েছে, তার মধ্যে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, গণশুনানিতে ব্যবসায়ী, ভোক্তা সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা বিদ্যুৎ খাতের সংস্কারের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর দাবি জানালেও সেই আহ্বান কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর করা হলেও খাতের অদক্ষতা, সিস্টেম লস বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা এখনো দেখা যাচ্ছে না।
বাস্তবতা হলো, বিদ্যুৎ খাতের সংকটের দায় সাধারণ ভোক্তার নয়। তাই সমাধানের বোঝাও কেবল তাদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। টেকসই সমাধান হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কাঠামোগত সংস্কার। ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা কমানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান জোরদার করা এবং বিদ্যুৎ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের অন্য কোনো পথ নেই। নতুন সরকার যদি সত্যিই পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে মূল্যবৃদ্ধির সহজ পথ নয়, সংস্কারের কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় পথই বেছে নিতে হবে।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি