
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
দেশের প্রায় সাড়ে বারো লাখ শিক্ষার্থীর বহু প্রতীক্ষিত উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষা আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে। দীর্ঘ দুই বছরের প্রস্তুতি, অনুশীলন ও অপেক্ষার পর সকাল ১০টায় বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষার মধ্য দিয়ে শুরু হবে তাদের উচ্চশিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পাবলিক পরীক্ষা। এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। দেশের ২ হাজার ৬৯৭টি পরীক্ষাকেন্দ্রে ৯ হাজার ৪৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় বসবেন।
করোনা মহামারির কারণে কয়েক বছর সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়ার পর এবার পাঁচ বছর পর পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে প্রথমবারের মতো নয়, তবে ধারাবাহিকভাবে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হবে। ফলে দেশের একটি অঞ্চলেও বড় ধরনের কোনো সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব পড়তে পারে সারা দেশের পরীক্ষার সূচিতে।
পরীক্ষা ঘিরে এবার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও নজরদারির ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা ব্যবহার করবেন বডি-ওর্ন ক্যামেরা, যাতে কেন্দ্রের সার্বিক পরিস্থিতি রেকর্ড করা যায় এবং কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা সহজেই যাচাই করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে, যেখান থেকে দেশের যেকোনো পরীক্ষাকেন্দ্রের কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
নিরাপত্তা জোরদারে পরীক্ষা চলাকালে প্রতিটি কেন্দ্রের ২০০ গজের মধ্যে পরীক্ষার্থী ও পরীক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও নকল, প্রশ্নফাঁস কিংবা অন্য কোনো ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, কোনো পরীক্ষাকেন্দ্রে নকলের ঘটনা ঘটলে শুধু পরীক্ষার্থী নয়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরীক্ষা নিয়ে গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হলেও তা যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুল প্রশ্নপত্র সরবরাহের মতো ঘটনাতেও দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
এবারের পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯৬৯ জন ছাত্র এবং ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬১৪ জন ছাত্রী। অর্থাৎ ছাত্রদের তুলনায় প্রায় ২৬ হাজার বেশি ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে, আর সবচেয়ে কম বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে। অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন ৯২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থী, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
পরীক্ষা পরিচালনায় এবার বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর ওপর। সারা দেশে ১৪৫টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪০টিই ঢাকা মহানগরে। এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা শুরুর অন্তত ৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে। তবে যানজট, দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোনো যৌক্তিক কারণে কোনো পরীক্ষার্থী দেরিতে পৌঁছালে কেন্দ্রসচিব ও স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন বলে জানিয়েছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। এতে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি পরীক্ষার শৃঙ্খলাও বজায় থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এবারের পরীক্ষার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার। আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৩ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু তাদের মধ্যে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে এবার এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছেন মাত্র ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ জন। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে প্রায় ৭ লাখ ২৪ হাজার ২১০ জন শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এসে ঝরে পড়েছে, যা মোট উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর ৪৩ দশমিক ৩১ শতাংশ। শিক্ষাবিদদের মতে, অর্থনৈতিক সংকট, বাল্যবিয়ে, কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়া এবং শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মতো নানা কারণের প্রতিফলন ঘটেছে এই পরিসংখ্যানে।
অন্যদিকে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় কোনো অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা অন্য কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে প্রয়োজন হলে সারা দেশের পরীক্ষা স্থগিত রাখারও সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বোর্ড চেয়ারম্যানরা।
সূচি অনুযায়ী সাধারণ শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের লিখিত পরীক্ষা আগামী ৮ আগস্ট শেষ হবে। এরপর ১০ থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ব্যবহারিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি (ভোকেশনাল), বিএমটি ও ডিপ্লোমা ইন কমার্সের পরীক্ষাও পৃথক সূচি অনুযায়ী সম্পন্ন হবে।
শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা আশা করছেন, কঠোর নিরাপত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এবারও শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও নকলমুক্ত পরিবেশে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি