

ড.আমানুর আমান
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। ক্ষুধার কারণে যাতে কোনো শিশু শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ হারিয়ে না ফেলে, অপুষ্টির কারণে যাতে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত না হয় এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যাতে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে—এসব মহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সরকার কয়েক হাজার কোটি টাকার এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। দেশের প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী প্রতিদিন এ কর্মসূচির আওতায় খাবার পাওয়ার কথা। কিন্তু যে কর্মসূচি শিশুদের পুষ্টি ও নিরাপত্তার প্রতীক হওয়ার কথা, সেটিই যদি তাদের অসুস্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—সমস্যা কোথায়?
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বাগেরহাটের শরণখোলায় স্কুল ফিডিংয়ের সেদ্ধ ডিম খেয়ে একাধিক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মেহেরপুরে পচা ডিম, ছত্রাকযুক্ত বনরুটি, নিম্নমানের ফল ও দুধ সরবরাহের অভিযোগ উঠে এসেছে। মাদারীপুরে খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনায় মামলা পর্যন্ত হয়েছে। গোপালগঞ্জে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছে, বনরুটি শক্ত ও বাসি, ডিম ছোট কিংবা পচা, ফল নিম্নমানের। এসব অভিযোগ যদি বিভিন্ন জেলার বাস্তবতা হয়, তাহলে এটিকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যায় না; বরং এটি একটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত।
প্রশ্ন হচ্ছে, এত বড় একটি কর্মসূচিতে কোথায় ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে?
প্রথমেই বলতে হয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত বিদ্যালয়কেন্দ্রিক। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে আলাদা প্রশাসনিক কর্মকর্তা নেই। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা পাঠদান, প্রশাসনিক কাজ, সরকারি নথিপত্র, বিভিন্ন জরিপ, নির্বাচনসংক্রান্ত দায়িত্ব, সামাজিক কর্মসূচি—সবকিছুর পাশাপাশি স্কুল ফিডিংও পরিচালনা করেন। ফলে সরবরাহকৃত খাদ্য গ্রহণ, সংরক্ষণ, মান যাচাই এবং বিতরণের ক্ষেত্রেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—শিক্ষকরা খাবার উৎপাদন করেন না, সরবরাহও করেন না। কিন্তু তারা শিক্ষার্থীদের হাতে সেই খাবার তুলে দেন। ফলে দৃশ্যমানভাবে যদি কোনো ডিম পচা হয়, রুটিতে ছত্রাক থাকে, দুধের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয় কিংবা ফল নষ্ট থাকে, তাহলে তা বিতরণ না করার নৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের রয়েছে। এই দায়িত্বে অবহেলা হলে সেটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
অন্যদিকে পুরো দায় শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও বাস্তবসম্মত নয়। খাদ্য সংগ্রহ, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং সরবরাহের দায়িত্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও তাদের এজেন্টদের। উপজেলা শিক্ষা অফিস তদারকির দায়িত্ব পালন করে। জেলা পর্যায়ে প্রশাসন রয়েছে। প্রকল্প পরিচালনা ইউনিট রয়েছে। অর্থাৎ এটি একটি বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা। কোনো একটি স্তরে দুর্বলতা তৈরি হলে পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে।
আর এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তদারকি কোথায়?
প্রতিদিন হাজার হাজার বিদ্যালয়ে খাবার পৌঁছাচ্ছে। কিন্তু সেই খাবারের গুণগত মান যাচাইয়ের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা কি বাস্তবে রয়েছে? বিদ্যালয়ে খাবার পৌঁছানোর পর সেটি কি ওজন করে দেখা হয়? ডিমের মান পরীক্ষা করা হয়? উৎপাদনের তারিখ দেখা হয়? নাকি উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা মিলিয়ে দ্রুত বিতরণ করাই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে?
সরকারের নির্ধারিত খাদ্যতালিকায় সপ্তাহের প্রতিটি দিনের জন্য নির্দিষ্ট মেনু রয়েছে। নির্ধারিত ওজনও উল্লেখ আছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন জেলায় দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই সেই ওজন মানা হচ্ছে না। যদি একটি শিশুর জন্য নির্ধারিত ১২০ গ্রাম বনরুটির পরিবর্তে ৮০ বা ৯০ গ্রাম সরবরাহ করা হয়, তাহলে শুধু পুষ্টিই কমে না; সরকারি অর্থেরও অপচয় ঘটে। বরাদ্দের টাকা কোথায় যাচ্ছে—এই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন প্রতিবেদনে সরবরাহ ব্যবস্থায় একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতির কথা উঠে এসেছে। ঠিকাদার, সাব-এজেন্ট, স্থানীয় সরবরাহকারী—একাধিক স্তর অতিক্রম করতে গিয়ে অনেক সময় মূল বরাদ্দের একটি অংশই শুধু খাবারের পেছনে ব্যয় হয়। এতে মান কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। যদি এ অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; এটি দুর্নীতির সম্ভাব্য ক্ষেত্রও।
শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো আপস হতে পারে না। একটি পচা ডিম, একটি ছত্রাকযুক্ত রুটি কিংবা সংরক্ষণে অনিয়মের কারণে দূষিত দুধ একটি শিশুর জন্য খাদ্য বিষক্রিয়া, ডায়রিয়া, মারাত্মক সংক্রমণ, এমনকি জীবনহানির ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। অপুষ্টি দূর করার কর্মসূচি যদি উল্টো স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই কর্মসূচির উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এসব শিশু নিজের অধিকার দাবি করতে পারে না। তারা জানে না, তাদের জন্য নির্ধারিত ডিমের ওজন কত হওয়ার কথা, রুটির মান কেমন হওয়া উচিত কিংবা খাবারের মেয়াদ কত দিন। তারা শুধু বিশ্বাস করে, স্কুল থেকে যে খাবার দেওয়া হচ্ছে সেটিই নিরাপদ। এই বিশ্বাস ভেঙে গেলে শুধু একটি কর্মসূচি নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিও আস্থা নষ্ট হয়।
এখন প্রশ্ন, সমাধান কী?
প্রথমত, প্রতিটি বিদ্যালয়ে খাবার গ্রহণের সময় বাধ্যতামূলক মান যাচাই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একটি গ্রহণ রেজিস্টারে খাদ্যের ওজন, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ, বাহ্যিক মান এবং পরিমাণ লিখে প্রধান শিক্ষক, একজন সহকারী শিক্ষক ও অভিভাবক প্রতিনিধির যৌথ স্বাক্ষর নিশ্চিত করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের আকস্মিক পরিদর্শন বাড়াতে হবে। শুধু কাগজে-কলমে প্রতিবেদন নয়, সরাসরি বিদ্যালয়ে গিয়ে খাবার পরীক্ষা করতে হবে। জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ মনিটরিং টিমও গঠন করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান একাধিকবার নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করলে তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানা, চুক্তি বাতিল এবং কালো তালিকাভুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু শোকজ করলেই হবে না; কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, বিদ্যালয়ভিত্তিক গার্ডিয়ান মনিটরিং কমিটিকে সক্রিয় করতে হবে। অভিভাবকরা যদি প্রতিদিনের কার্যক্রমে যুক্ত থাকেন, তাহলে অনিয়ম গোপন রাখা কঠিন হবে। একই সঙ্গে একটি জাতীয় অভিযোগ হটলাইন ও মোবাইল অ্যাপ চালু করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষক, অভিভাবক বা শিক্ষার্থী সহজেই ছবি ও তথ্য পাঠাতে পারবেন।
সবশেষে, সরকারকে বিকল্প খাদ্যব্যবস্থা নিয়েও ভাবতে হবে। যেখানে প্রতিদিন টাটকা ডিম ও রুটি সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে, সেখানে স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, মৌসুমি দেশীয় ফল বা নিরাপদ শুকনো খাদ্য সরবরাহের সম্ভাবনা বিবেচনা করা যেতে পারে। স্থানীয় কৃষক ও নারী উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে একটি বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে মান নিয়ন্ত্রণও সহজ হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও উপকৃত হবে।
স্কুল ফিডিং কর্মসূচি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জাতীয় বিনিয়োগ। এই কর্মসূচির মাধ্যমে একটি শিশু শুধু একটি ডিম বা একটি রুটি পায় না; সে পায় বিদ্যালয়ে আসার উৎসাহ, সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার শক্তি। তাই এই কর্মসূচিকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যায় না।
রাষ্ট্রের অর্থ, শিক্ষকের দায়িত্ব, প্রশাসনের তদারকি, সরবরাহকারীর সততা এবং অভিভাবকের অংশগ্রহণ—সবকিছু মিলিয়েই একটি সফল স্কুল ফিডিং ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু যেখানে অবহেলা থাকবে, সেখানে জবাবদিহিও থাকতে হবে। শিশুদের খাবারে অনিয়ম কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে অবিচার। আজ যদি আমরা এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর না হই, তাহলে আগামী দিনে এর মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকে।
কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রকে বিচার করা হয় তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের নিরাপত্তা দিয়ে। আর আমাদের সবচেয়ে অসহায় নাগরিক হলো বিদ্যালয়ের সেই ছোট্ট শিশুটি, যে প্রতিদিন বিশ্বাস নিয়ে স্কুলের বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করে—রাষ্ট্র তাকে অন্তত একটি নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার দেবে।
ড.আমানুর আমান, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক কুষ্টিয়া, দি কুষ্টিয়া টাইমস
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি