
ড. আমানুর আমান
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে-স্কেল নিয়ে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও গেজেট প্রকাশে বিলম্ব, বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে দ্বিধা এবং ধাপে ধাপে কার্যকরের আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিপুলসংখ্যক পেনশনভোগীর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সরকারের যুক্তি—বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বাজেটের চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং প্রযুক্তিগত জটিলতা। অন্যদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রশ্ন—প্রায় এক যুগ ধরে বেতনকাঠামো অপরিবর্তিত রেখে রাষ্ট্র কীভাবে তাদের কাছ থেকে একই দক্ষতা, একই নিষ্ঠা এবং একই মানের সেবা প্রত্যাশা করে?
বিষয়টি আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতা দিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে জাতীয় পে-স্কেলের ইতিহাস দীর্ঘ। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে বেতন কমিশন গঠন করা হলেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে ১৯৭৭, ১৯৮৪, ১৯৯১, ১৯৯৭, ২০০৫ এবং সর্বশেষ ২০১৫ সালে। ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন ছিল। তখন সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই সময় দেশের অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয় কিংবা শিক্ষা ব্যয়ের চিত্র আজকের বাস্তবতার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।
আজ পরিস্থিতি বদলে গেছে। গত এক দশকে দ্রব্যমূল্যের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ২০১৫ সালের বেতনকাঠামোর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অর্থনীতির ভাষায়, নামমাত্র বেতন (Nominal Wage) অপরিবর্তিত থাকলেও প্রকৃত বেতন (Real Wage) ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ একজন সরকারি কর্মচারী আজ ২০১৫ সালের সমপরিমাণ বেতন পেলেও সেই অর্থ দিয়ে আগের তুলনায় অনেক কম পণ্য ও সেবা কিনতে সক্ষম হচ্ছেন। এ বাস্তবতায় নতুন পে-স্কেল কোনো বিলাসিতা নয়; বরং ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ।
অবশ্য সরকারের অবস্থানও পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন মানে শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পেনশন, গ্র্যাচুইটি, ভবিষ্যৎ আর্থিক দায় (Future Liability) এবং সামগ্রিক রাজস্ব ব্যয়। একটি বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করতে হয়। পরিকল্পনাহীনভাবে এই ব্যয় বাস্তবায়িত হলে বাজেট ঘাটতি বাড়তে পারে, ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধি পেতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ফলে সরকার অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছে—এটিও বাস্তবতা।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। যদি সরকার নির্বাচন-পূর্ব প্রতিশ্রুতি হিসেবে নতুন পে-স্কেলের ঘোষণা দিয়ে থাকে, যদি বাজেট বক্তৃতায় ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়ে থাকে এবং যদি বেতন কমিশনের সুপারিশ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকে, তাহলে আর্থিক, প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি আগে থেকেই সম্পন্ন হওয়া উচিত ছিল। জুলাই শুরু হওয়ার পরও গেজেট প্রকাশ না হওয়া, বাস্তবায়নের ধাপ নির্ধারণে অনিশ্চয়তা কিংবা সফটওয়্যার জটিলতার বিষয় সামনে আসায় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
রাষ্ট্র একদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, দ্রুত সেবা, ডিজিটাল দক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং উচ্চমানের কর্মসম্পাদন প্রত্যাশা করে। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে তাদের প্রকৃত আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় না করলে সেই প্রত্যাশা কতটা বাস্তবসম্মত—সেটিও আলোচনার বিষয়।
অবশ্য এটিও সত্য, শুধু বেতন বাড়ালেই দুর্নীতি দূর হয়ে যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। দুর্নীতির পেছনে রয়েছে জবাবদিহিতার অভাব, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক সংস্কৃতিসহ বহু কাঠামোগত কারণ। তবে এটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে ন্যায্য ও সম্মানজনক বেতন একজন কর্মচারীকে আর্থিক নিরাপত্তা দেয়, যা সুশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
বিশ্বের অনেক দেশেই সরকারি বেতন নির্ধারণে একটি স্থায়ী ব্যবস্থা রয়েছে। কোথাও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় সমন্বয় (Cost of Living Adjustment) করা হয়, কোথাও নির্দিষ্ট সময় অন্তর বেতন কমিশন বাধ্যতামূলকভাবে সুপারিশ দেয়। ফলে প্রতি দশ বা বারো বছর পর একবার বড় ধরনের বেতন সংশোধনের প্রয়োজন হয় না। বাংলাদেশেও এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সরকারি বেতনকে অনেক সময় কেবল রাজস্ব ব্যয় হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও বিস্তৃত। একটি দক্ষ, সৎ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্রকে তার মানবসম্পদে বিনিয়োগ করতেই হয়। শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা বিচার বিভাগের কর্মকর্তা—সবাই রাষ্ট্রযন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কেবল কর্মদক্ষতা ও সেবার মান বৃদ্ধির প্রত্যাশা দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবসম্মত হয় না। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে বেতন বৃদ্ধি কর্মদক্ষতার একমাত্র শর্ত। বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন, ডিজিটাল জবাবদিহিতা, দুর্নীতিবিরোধী কার্যকর ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক সংস্কারও সমানভাবে প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি অর্থনীতিতে ভোগব্যয় বাড়াতে পারে, যা অভ্যন্তরীণ বাজারকে সচল রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তবে যদি সেই অতিরিক্ত ব্যয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে এর বিরূপ প্রভাবও দেখা দিতে পারে। তাই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রশ্নটি কেবল বেতন বৃদ্ধির নয়; এটি একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক নীতির অংশ।
এ কথাও মনে রাখতে হবে, দেশের একটি বড় অংশের কর্মজীবী মানুষ বেসরকারি খাতে কর্মরত। তাঁদের অনেকের বেতন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় হয় না। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বেসরকারি খাতের বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যায় না। তবে রাষ্ট্রের কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বের অংশ; অন্যদিকে বেসরকারি খাতের জন্য কার্যকর শ্রমনীতি, ন্যায্য মজুরি এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুই ক্ষেত্রকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।
আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নতুন পে-স্কেল শুধু কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিপুলসংখ্যক অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগী। তাঁদের আয়ের প্রধান উৎসই পেনশন। মূল্যস্ফীতির অভিঘাত তাঁদের ওপর আরও বেশি পড়ে। ফলে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা তাঁদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে।
সরকার যদি সত্যিই ধাপে ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে অন্তত একটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি—স্বচ্ছতা। কোন ধাপে কী বাড়বে, কখন বাড়বে, গেজেট কবে প্রকাশ হবে, বকেয়া কীভাবে পরিশোধ করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা উচিত। অনিশ্চয়তার চেয়ে বাস্তবসম্মত সময়সূচি সব সময় অধিক গ্রহণযোগ্য।
একটি রাষ্ট্রের প্রশাসন তার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রশাসনের দক্ষতা, সেবা এবং নৈতিকতার ওপরই নাগরিক সেবার মান অনেকাংশে নির্ভর করে। তাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনকে কেবল ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।
অতএব, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত একদিকে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অন্যদিকে অযথা দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে দ্রুত, স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত উপায়ে নতুন পে-স্কেল কার্যকর করা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য এমন একটি স্থায়ী বেতন-সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে প্রতি দশক পরপর একই অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
রাষ্ট্রের বাজেটের ভারসাম্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই মানুষগুলো, যাঁদের কাঁধে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত। অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে একটি দূরদর্শী সরকারের প্রকৃত সাফল্যের মানদণ্ড।
ড.আমানুর আমান, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক কুষ্টিয়া, দি কুষ্টিয়া টাইমস
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি