

ড. আমানুর আমান
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যায়। নির্বাচন কমিশন, বিসিক, বিআইডব্লিউটিসি, তাঁত বোর্ড, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট কিংবা অন্যান্য সরকারি সংস্থা কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়; এগুলো জনগণের করের অর্থে পরিচালিত জাতীয় প্রতিষ্ঠান। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে কে আসবেন, কীভাবে আসবেন এবং কোন মানদণ্ডে আসবেন—এসব প্রশ্ন কেবল প্রশাসনিক নয়, জনস্বার্থেরও বিষয়।
সম্প্রতি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ও সংস্থার শীর্ষ পদে একযোগে ১২ জনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন করে সেই প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে এসেছে। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৯ ধারায় বিশেষ প্রয়োজন, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান বা রাষ্ট্রের স্বার্থে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। ফলে নিয়োগগুলোকে শুধুমাত্র আইনের ভিত্তিতে অবৈধ বলা যাবে না। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত কেবল আইনসম্মত হলেই জনমনে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে না; তার সঙ্গে যুক্ত থাকে স্বচ্ছতা, যৌক্তিকতা এবং জনগণের আস্থার প্রশ্ন।
এই নিয়োগগুলো নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার প্রধান কারণ নিয়োগপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশের সক্রিয় রাজনৈতিক পরিচয়। সরকারের দৃষ্টিতে তারা হয়তো যোগ্য, দক্ষ এবং দায়িত্ব পালনে সক্ষম ব্যক্তি। সরকার এটিও মনে করতে পারে যে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন বা নীতিগত অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে। এমন যুক্তি একটি সরকারের দেওয়ার অধিকার রয়েছে।
কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় দৃশ্যমানভাবে সামনে চলে আসে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে জনগণের মনে সন্দেহ তৈরি হওয়া কি অস্বাভাবিক? রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে মানুষের আস্থা অনেক সময় বাস্তবতার পাশাপাশি দৃশ্যমানতার ওপরও নির্ভর করে। বিচার শুধু নিরপেক্ষ হলেই হয় না, নিরপেক্ষ দেখাতেও হয়—প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য।
এই ঘটনায় প্রশাসনের ভেতরে অস্বস্তির বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একজন কর্মকর্তা দীর্ঘ ২৫ থেকে ৩০ বছর চাকরি করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে পৌঁছানোর প্রত্যাশা করেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়; পুরো ক্যাডার ব্যবস্থার প্রণোদনা ও পেশাগত ধারাবাহিকতার অংশ। যদি নিয়মিত পদোন্নতির পরিবর্তে বারবার বাইরের ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—দীর্ঘ কর্মজীবনের মূল্যায়ন কোথায়?
অবশ্য এর বিপরীত যুক্তিও রয়েছে। প্রশাসনের বাইরে থেকেও অনেক দক্ষ, সৎ এবং দূরদর্শী ব্যক্তি থাকতে পারেন, যাদের অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রের কাজে লাগতে পারে। বিশ্বের বহু দেশেই বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, করপোরেট নির্বাহী কিংবা নীতি বিশ্লেষকদের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার নজির রয়েছে। ফলে বাইরের কাউকে নিয়োগ দেওয়া নিজেই কোনো সমস্যা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই নিয়োগের মানদণ্ড কী এবং তা কতটা স্বচ্ছ।
এখানেই জনগণের প্রত্যাশার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনে দলীয়করণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিয়োগে অস্বচ্ছতার অভিযোগ শুনে এসেছে। বিভিন্ন সরকারের আমলেই এমন অভিযোগ উঠেছে। ফলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের একটি বড় অংশ আশা করে—নতুন সরকার অন্তত এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবে। তারা চায় যোগ্যতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব হবে নিয়োগের প্রধান মানদণ্ড; রাজনৈতিক পরিচয় নয়।
যখন বাস্তবে এমন নিয়োগ দেখা যায়, যেখানে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়, তখন সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সরকারের পদক্ষেপের একটি দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি হয়। এটিই মূল সংঘাত। এই সংঘাত আইন বনাম আইন নয়; বরং প্রত্যাশা বনাম উপলব্ধির সংঘাত।
সরকার যদি সত্যিই মনে করে থাকেন যে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সবচেয়ে যোগ্য, তাহলে সেই যোগ্যতার ভিত্তি প্রকাশ করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে। কেন একজনকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, আরেকজনকে বিআইডব্লিউটিসি বা বিসিকের নেতৃত্বে আনা হলো—এর পেছনের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও অর্জনের তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরা হলে বিতর্ক অনেকটাই কমতে পারত। গণতান্ত্রিক শাসনে স্বচ্ছতা শুধু সিদ্ধান্তকে শক্তিশালী করে না, সরকারের ওপর জনগণের আস্থাও বাড়ায়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। রাষ্ট্রের প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ রাখা শুধু একটি নীতিগত বিষয় নয়; এটি কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনারও পূর্বশর্ত। যদি কোনো কর্মকর্তা মনে করেন যে দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে প্রশাসনের ভেতরে পেশাদারিত্বের পরিবর্তে আনুগত্যের সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক নয়।
তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে কোনো ব্যক্তিকে শুধুমাত্র তার রাজনৈতিক অতীতের কারণে অযোগ্য বলা যায় না। একজন ব্যক্তি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকেও দক্ষ প্রশাসক হতে পারেন। আবার রাজনৈতিক পরিচয় না থাকলেও কেউ অদক্ষ হতে পারেন। তাই ব্যক্তির পরিচয়ের চেয়ে তার কর্মদক্ষতা, সততা, জবাবদিহিতা এবং ফলাফলই শেষ পর্যন্ত আসল বিচার হওয়া উচিত।
এ কারণেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত প্রক্রিয়া, ব্যক্তি নয়। যদি নিয়োগের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং যোগ্যতাভিত্তিক হয়, তাহলে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক অতীত নিয়ে প্রশ্ন অনেকটাই গুরুত্ব হারায়। কিন্তু যখন সেই প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান থাকে না, তখনই জনমনে সন্দেহের জন্ম হয়।
সরকারের জন্য এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। বর্তমান সময়ে নাগরিকদের প্রত্যাশা আগের চেয়ে অনেক বেশি। মানুষ শুধু উন্নয়ন নয়, উন্নয়নের সঙ্গে সুশাসনও চায়। শুধু আইনের প্রয়োগ নয়, আইনের ন্যায্য প্রয়োগও দেখতে চায়। শুধু দক্ষ প্রতিষ্ঠান নয়, বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানও চায়।
অতএব, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিয়োগের অধিকার প্রয়োগ করা নয়; বরং সেই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে জনগণের আস্থা অটুট রাখা। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনায় আস্থা একবার ক্ষয় হতে শুরু করলে তা পুনর্গঠন করা অনেক কঠিন।
শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে—রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থেকে জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে পারবে? এর উত্তর নির্ভর করবে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অতীতের ওপর নয়; বরং নিয়োগের স্বচ্ছতা, প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের ভবিষ্যৎ কর্মদক্ষতার ওপর।
গণতন্ত্রে সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়, জনগণের বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস ধরে রাখার অন্যতম উপায় হলো—রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
ড আমানুর আমান, সম্পাদক প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি