
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালার মঞ্চে যে কণ্ঠ, উপস্থিতি ও অভিনয়ে খলনায়কের চরিত্র জীবন্ত হয়ে উঠত, সেই কিংবদন্তি শিল্পী তকরিম উদ্দিন খান আর নেই। তার মৃত্যু শুধু একজন অভিনেতার প্রস্থান নয়, বরং বাংলাদেশের যাত্রাশিল্পের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি।
বুধবার (২৯ জুলাই) রাতে ৭৮ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে বহুমাত্রিক পরিচয়ের অধিকারী এই মানুষটির মৃত্যুতে কুষ্টিয়াসহ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের গৌড়দহ গ্রামের সন্তান তকরিম উদ্দিন খান। ১৯৬২ সালে কুষ্টিয়া মুসলিম হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হন। কলেজজীবনেই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রয়াত মহিউদ্দিনের অনুপ্রেরণায় নাটক ও যাত্রার প্রতি আকৃষ্ট হন। পরে যশোর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে পাওয়ার টেকনোলজিতে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করলেও নিশ্চিত চাকরির পথ ছেড়ে বেছে নেন অনিশ্চিত শিল্পজীবন।
১৯৭২ সালে কুষ্টিয়ার শালদহে আলাউদ্দিন ও অধ্যাপক আব্দুর রশীদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন গীতাঞ্জলী অপেরা। পরিচালক ও প্রধান খলনায়ক হিসেবে তার অভিনয় অল্প সময়েই সারা দেশে দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে। আর্থিক সংকটে দলটি বন্ধ হয়ে গেলেও যাত্রার প্রতি তার নিবেদন থেমে থাকেনি। পরে তিনি বলাকা অপেরা এবং দি গীতাঞ্জলী অপেরা-য় পরিচালক ও প্রধান খলনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আশির দশকের শেষদিকে আবারও নতুন করে গীতাঞ্জলী অপেরা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিলেও অপসংস্কৃতির বিস্তার এবং প্রতিকূল বাস্তবতায় সেই স্বপ্নও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
প্রায় আড়াই দশকের অভিনয়জীবনে তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় যাত্রাপালায় অভিনয় করেছেন। 'নাচমহল'-এর দবির খাঁ, 'কে দেবে জবাব'-এর আলী শাহ, 'কোহিনুর'-এর গোলাম কাদের এবং 'রক্ত দিয়ে কিনলাম'-এর মাসুদ খান চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকের কাছে আজও স্মরণীয়।
শিল্পী পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সক্রিয় যোদ্ধা। পরিবারের দাবি, সরকারি তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি মুক্তিযোদ্ধার ভাতা পাননি।
শিক্ষা বিস্তারেও ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ১৯৭৩ সালে নিজ গ্রামের পৈতৃক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন গৌড়দহ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করে ২০০৪ সালে অবসর নেন। এছাড়া ১৯৯২ সালে কুষ্টিয়া-মেহেরপুর সড়কের মশান বাজার এলাকায় বলিদাপাড়া মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সহকর্মীদের মতে, তকরিম উদ্দিন খান শুধু একজন সফল খলনায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন যাত্রাশিল্পকে টিকিয়ে রাখার এক নিরলস সংগ্রামী মানুষ। মঞ্চ, মুক্তিযুদ্ধ ও শিক্ষাঙ্গন—তিন ক্ষেত্রেই রেখে গেছেন অনন্য অবদান।
তার বিদায়ের সঙ্গে বাংলাদেশের লোকনাট্যভিত্তিক যাত্রাশিল্প হারাল এক নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীকে, যার অভিনয় ও সাংস্কৃতিক অবদান দীর্ঘদিন স্মরণ করবে দর্শক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি