

ড. আমানুর আমান
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬ অনুমোদন করেছে সরকার। দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর একই বেতন কাঠামোর মধ্যে থাকা সরকারি কর্মজীবীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত। নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাতও কিছুটা সংকুচিত করা হয়েছে।
কিন্তু পে-স্কেলকে শুধু ‘বেতন বাড়ানোর ঘোষণা’ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য ধরা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি প্রশাসনের দক্ষতা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, কর্মীদের মনোবল, বাজারের চাহিদা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার প্রশ্ন। তাই নতুন পে-স্কেলের ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই দিকই নির্মোহভাবে দেখা প্রয়োজন।
কেন নতুন পে-স্কেল প্রয়োজন হয়ে উঠেছিল?
সর্বশেষ জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময়ে দেশের অর্থনীতির আকার যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াত—প্রায় প্রতিটি খাতেই ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। ফলে কাগজে একই বেতন থাকলেও বাস্তবে সেই বেতনের ক্রয়ক্ষমতা আগের অবস্থানে নেই।
অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো—নামমাত্র আয় এবং প্রকৃত আয় এক বিষয় নয়। একজন কর্মচারী যদি আজ ২০ হাজার টাকা আয় করেন, কিন্তু কয়েক বছর আগের তুলনায় সেই ২০ হাজার টাকায় অর্ধেক পণ্য ও সেবা কিনতে পারেন, তাহলে তাঁর প্রকৃত আয় কমেছে। সেই জায়গা থেকেই নতুন পে-স্কেলের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
সরকারও বাজেট ঘোষণার সময় প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামো এবং মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে নতুন বেতন কাঠামোর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
ইতিবাচক প্রভাব কোথায়?
প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতায়। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা এর বড় সুবিধাভোগী হবেন। সরকারও বাস্তবায়নে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এটি শুধু একজন কর্মচারীর সংসার পরিচালনায় স্বস্তি দেবে না; এর বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। একজন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীর হাতে অতিরিক্ত অর্থ গেলে তার বড় অংশই বাজারে ফিরে যায়—খাদ্য, পোশাক, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও দৈনন্দিন পণ্যের পেছনে ব্যয় হয়। অর্থাৎ বেতন বৃদ্ধি ভোগব্যয় বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে শক্তিশালী করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এটি সরকারি কর্মীদের মনোবল ও কর্মপ্রেরণা বাড়াতে পারে। দীর্ঘদিন বেতন কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে কর্মীদের মধ্যে আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একটি সময়োপযোগী বেতন কাঠামো সেই অসন্তোষ কিছুটা কমাতে পারে।
তৃতীয়ত, এটি মেধাবী তরুণদের সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহ ধরে রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে। রাষ্ট্র যদি দক্ষতা, দায়িত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পারিশ্রমিক দিতে না পারে, তাহলে সরকারি চাকরি ধীরে ধীরে মেধাবীদের কাছে কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। তাই একটি যৌক্তিক বেতন কাঠামো প্রশাসনের মানবসম্পদ উন্নয়নেরও অংশ।
তবে ঝুঁকিও কম নয়
যেকোনো বড় বেতন বৃদ্ধি অর্থনীতিতে একদিকে চাহিদা বাড়ায়, অন্যদিকে সরকারের ব্যয়ও বাড়ায়। কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হবে—এ বিষয়টি আগেই আলোচনায় এসেছে।
সরকার যদি এই অতিরিক্ত ব্যয় রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে ঋণ বা অন্য উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার মাধ্যমে মেটায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। আবার সরকারি কর্মীদের আয় বাড়ার ফলে বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হলে উৎপাদন যদি সেই হারে না বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ পড়তে পারে।
অর্থাৎ বেতন বাড়লেই কর্মীর প্রকৃত আয় বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। যদি একই সময়ে বাজারে পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে যায়, তাহলে বেতন বৃদ্ধির একটি অংশ মূল্যস্ফীতির কাছে আবার হারিয়ে যেতে পারে।
এই কারণেই সরকারের তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তকে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি মূলত একটি ফিসকাল ম্যানেজমেন্ট বা রাজস্ব-ব্যয় ব্যবস্থাপনার কৌশল।
তিন ধাপে বাস্তবায়ন: সরকারের লাভ কোথায়?
নতুন পে-স্কেলের মূল বেতন ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে তিন ধাপে কার্যকর হবে এবং বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এখানে সরকারের প্রথম সুবিধা হলো—একসঙ্গে বিশাল অর্থের চাপ নিতে হচ্ছে না। একটি বড় ব্যয়কে সময়ের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ায় বাজেট ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক সহজ হবে।
দ্বিতীয় সুবিধা হলো, সরকার অর্থনীতির প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাবে। প্রথম ধাপে বেতন বৃদ্ধির পর মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়, বাজারের চাহিদা এবং সরকারি ব্যয়ের ওপর কী প্রভাব পড়ে—তা দেখে পরবর্তী ধাপগুলো পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
তৃতীয়ত, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা বা cash-flow management সহজ হবে। একটি রাষ্ট্রের বাজেট শুধু কত টাকা আয় করছে এবং কত টাকা ব্যয় করছে—তার হিসাব নয়; কখন কত টাকা প্রয়োজন হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চতুর্থত, সরকার মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য চাপ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাবে। একবারে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত আয় বাজারে প্রবাহিত হওয়ার পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে অর্থ প্রবাহিত হলে চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত রাখা সম্ভব হতে পারে। সরকার নিজেও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের পেছনে মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক চাপ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনা করেছে।
কিন্তু সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব
পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সরকারের রাজস্ব আহরণের সক্ষমতার ওপর। বেতন বাড়ানো তুলনামূলক সহজ; সেই বাড়তি ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে বহন করার মতো রাজস্ব তৈরি করাই কঠিন।
তাই নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে একটি নতুন রাজস্ব সংস্কৃতিও প্রয়োজন। করের আওতা বাড়াতে হবে, কর ফাঁকি কমাতে হবে, কর প্রশাসনকে আধুনিক করতে হবে এবং অর্থনীতির অনানুষ্ঠানিক অংশকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
সরকারি কর্মচারীদের কাছেও এখানেই একটি নৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়। রাষ্ট্র যখন তাদের বেতন বাড়াচ্ছে, তখন বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় সেবা, দক্ষতা, জবাবদিহি ও উৎপাদনশীলতাও বাড়তে হবে। বেতন বৃদ্ধি যেন শুধু ‘অধিকার’ হিসেবে দেখা না হয়; এটি একই সঙ্গে দায়িত্বের নতুন চুক্তি।
শেষ কথা////
নতুন পে-স্কেল তাই কেবল সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির গল্প নয়। এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
এর ইতিবাচক দিক হলো—দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য ও ক্রয়ক্ষমতার ক্ষয় কিছুটা মোকাবিলা করা, নিম্ন আয়ের কর্মীদের স্বস্তি দেওয়া, সরকারি চাকরিতে মেধা ধরে রাখা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানো। বিপরীতে এর ঝুঁকি হলো—সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, রাজস্বের ওপর চাপ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য প্রভাব।
তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তকে তাই আপস নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। তবে এই ভারসাম্য কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী তিনটি বিষয়ের ওপর—রাজস্ব বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি সেবার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি।
রাষ্ট্র যদি শুধু বেতন বাড়ায়, কিন্তু রাজস্ব না বাড়ায়, তবে পে-স্কেল একসময় বোঝা হয়ে উঠতে পারে। আবার রাষ্ট্র যদি বেতন বাড়ানোর সঙ্গে দক্ষতা, জবাবদিহি ও উৎপাদনশীলতাও বাড়াতে পারে, তাহলে এই পে-স্কেল অর্থনীতির ওপর বোঝা নয়—বরং মানবসম্পদে একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হয়ে উঠতে পারে।
সুতরাং নতুন পে-স্কেলের আসল পরীক্ষা আজকের ঘোষণায় নয়; পরীক্ষা হবে আগামী কয়েক বছরে। বেতন বাড়ানোর সঙ্গে যদি মানুষের জীবনমান, সরকারি সেবার মান এবং অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়ে—তবেই এই পে-স্কেল তার পূর্ণ অর্থে সফল হবে।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি