
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
জাতীয় পরিচয়পত্র একজন নাগরিকের কেবল একটি কার্ড নয়; রাষ্ট্রের কাছে তাঁর পরিচয়ের অন্যতম প্রধান দলিল। ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে শুরু করে ব্যাংক হিসাব খোলা, সরকারি সেবা গ্রহণ, পাসপোর্ট তৈরি কিংবা নানা নাগরিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রের ব্যবহার এখন প্রায় সর্বব্যাপী। ফলে সেই পরিচয়পত্রে নাগরিকের ছবি থাকবে কি না—প্রশ্নটি নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ বা ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের নিরাপত্তা ও নাগরিকের স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিত করার বিষয়টিও।
এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হাইকোর্টের বুধবারের রায়। ছবি ছাড়া বায়োমেট্রিক ফিচার ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে জারি করা রুল খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। ফলে প্রচলিত ব্যবস্থায় ছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির কোনো সুযোগ থাকল না।
বিচারপতি মো. ইকবাল কবীর ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ বুধবার এ রায় দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কামাল হোসেন মিয়াজী রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, রুল খারিজ হওয়ায় ছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র হবে না।
তবে এই রায়ের পেছনের ঘটনাপ্রবাহ আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
২০২২ সালে রাজধানীর শাহজাহানপুরের শান্তিবাগের বাসিন্দা সুমাইয়া আহমাদ মুনা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। তিনি নিজেকে শরিয়ত অনুযায়ী পর্দানশীন মুসলিম নারী হিসেবে উল্লেখ করে জানান, ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে তিনি ছবি তোলা থেকে বিরত থাকেন। এর ফলে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র ছিল না এবং পরিচয়পত্র না থাকায় বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা থেকে তিনি বঞ্চিত হচ্ছিলেন। এর আগে একই দাবি জানিয়ে তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছেও আবেদন করেছিলেন।
সেই আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি।
রিটের শুনানি নিয়ে ২০২২ সালের ৬ মার্চ হাইকোর্ট ছবি ছাড়া বিকল্প পরিচয়ের মাধ্যমে, অর্থাৎ বায়োমেট্রিক ফিচার ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে না কেন—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।
প্রথম দৃষ্টিতে বিষয়টি একজন নাগরিকের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন বলে মনে হতে পারে। একজন মানুষ তাঁর ধর্মীয় অনুশাসন অনুসরণ করবেন কি না, সেটি নিঃসন্দেহে ব্যক্তিগত অধিকারের অংশ। কিন্তু যখন সেই ব্যক্তিগত অনুশাসনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকের পরিচয় যাচাইয়ের কাঠামো পরিবর্তনের দাবি ওঠে, তখন বিষয়টি আর কেবল ব্যক্তিগত অধিকারের মধ্যে থাকে না।
রাষ্ট্রপক্ষ তখন এই দাবির সাংবিধানিক ও বাস্তবিক দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাদের যুক্তি ছিল, জাতীয় পরিচয় নিশ্চিত করতে ছবির পাশাপাশি বায়োমেট্রিক তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি আইরিশ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পরিচয় যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় শারীরিক বৈশিষ্ট্য সংগ্রহের প্রশ্ন রয়েছে। ব্যাংকিংসহ গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সেবার ক্ষেত্রেও ছবি ও পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
এখানেই ছবিহীন জাতীয় পরিচয়পত্রের দাবির সবচেয়ে বড় জটিলতা।
রাষ্ট্রের পরিচয়ব্যবস্থা যত বেশি ডিজিটাল ও বায়োমেট্রিকনির্ভর হচ্ছে, ব্যক্তিকে তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে শনাক্ত করার প্রয়োজনও তত বাড়ছে। একজনের পরিচয় যেন অন্য কেউ ব্যবহার করতে না পারে—এটি শুধু প্রশাসনিক সুবিধা নয়, নাগরিকের নিজের নিরাপত্তারও বিষয়।
ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো অবশ্যই একটি সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু ধর্মের নামে এমন কোনো ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করা হলে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় পরিচয় যাচাই দুর্বল হয়ে যেতে পারে, সেখানে প্রশ্ন উঠবেই—ব্যক্তিগত ধর্মাচরণ ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সীমারেখা কোথায়?
এই মামলাটি সেই প্রশ্নটিই সামনে নিয়ে এসেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ধর্মীয় অনুশাসনের একটি ব্যক্তিগত ব্যাখ্যাকে রাষ্ট্রীয় পরিচয় ব্যবস্থার সাধারণ নীতিতে পরিণত করার সম্ভাবনা। যদি ছবির পরিবর্তে কেবল বিকল্প বায়োমেট্রিক ব্যবস্থায় জাতীয় পরিচয় নিশ্চিত করার নজির তৈরি হতো, ভবিষ্যতে একই যুক্তিতে আরও নানা ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পরিচয় যাচাইয়ের প্রচলিত কাঠামো পরিবর্তনের দাবি উঠতে পারত। তখন নাগরিক পরিচয়ের অভিন্ন কাঠামো বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ত।
এখানে অবশ্য এটাও স্পষ্ট করা প্রয়োজন—এই রিটের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট মৌলবাদী বা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিল, এমন কোনো তথ্য আদালতের রায়ে বা প্রকাশিত ঘটনাপ্রবাহে পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে সরাসরি ‘মৌলবাদীদের চক্রান্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করা সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে প্রমাণনির্ভর হবে না। তবে ধর্মীয় অনুশাসনের যুক্তিকে সামনে রেখে রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র থেকে ছবি বাদ দেওয়ার যে দাবি আদালতের সামনে এসেছিল, সেটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতায় ধর্মীয় অধিকারের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও নিরাপত্তার ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছিল।
হাইকোর্টের রায়ে সেই বিতর্কের একটি স্পষ্ট সীমারেখা তৈরি হলো।
ব্যক্তির ধর্ম পালনের অধিকার থাকবে, পর্দা পালনের অধিকারও থাকবে; কিন্তু রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অভিন্ন ও নিরাপদ ব্যবস্থা বজায় রাখার প্রয়োজনও থাকবে। কারণ রাষ্ট্রের চোখে নাগরিকের পরিচয় কোনো অস্পষ্ট ধারণা নয়—তা হতে হবে যাচাইযোগ্য, স্বতন্ত্র এবং নিরাপদ।
ছবিবিহীন এনআইডির দাবি শেষ পর্যন্ত আদালতে টেকেনি। এর ফলে শুধু একটি রিটের নিষ্পত্তি হয়নি; রাষ্ট্রীয় পরিচয় ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত ধর্মাচরণ কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেই প্রশ্নেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা মিলেছে।
ধর্মের প্রতি সম্মান এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়—দুটিকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না বানিয়ে, নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যে একটি ভারসাম্যই শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক সমাজের পথ হওয়া উচিত। হাইকোর্টের এই রায় সেই ভারসাম্যের প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এলো।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি