
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
রাজধানীর চেয়ে ঢাকার বাইরে আক্রান্তের হার বেশি | হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ | মশক নিধনে সামাজিক আন্দোলনের তাগিদ
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে আগামী এক মাসের মধ্যে এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। একই উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও। বিশেষ করে যারা আগে একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, এবার তাদের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা।
এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—রাজধানীর তুলনায় ঢাকার বাইরে আক্রান্তের হার বেশি। অর্থাৎ ডেঙ্গুর বিস্তার এখন আর শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়; রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা ও গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে এডিস মশাবাহিত এই রোগ।
২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মৃত্যু ২, হাসপাতালে ৭৯০
দেশে ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের প্রাদুর্ভাবও চলছে। ফলে একই সময়ে দুটি রোগের চাপ সামলাতে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৯০ জন। একই সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে ৩ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ১১১ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালসহ সরকারি হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে প্রতিনিয়ত ডেঙ্গু ও হামে আক্রান্ত রোগী আসছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক হাসপাতালেই রোগী ভর্তির জন্য পর্যাপ্ত শয্যা নেই। গুরুতর রোগীদের একটি বড় অংশের আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হলেও প্রয়োজনের তুলনায় আইসিইউ শয্যা কম থাকায় তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজধানীর বাইরে বাড়ছে ডেঙ্গুর বিস্তার
ডেঙ্গু এডিস মশার কামড়ে ছড়ায়—এ তথ্য এখন কমবেশি সবারই জানা। এডিস মশা কোথায় বংশবিস্তার করে, সে সম্পর্কেও মানুষের ধারণা রয়েছে। তারপরও মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর ও সময়োপযোগী ব্যবস্থা না নেওয়া এবং জনসচেতনতার ঘাটতির কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার বিস্তার ঘটছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার রাজধানীর তুলনায় ঢাকার বাইরের এলাকাগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। বিভিন্ন জেলা ও গ্রামাঞ্চল থেকে অনেক রোগী সংকটাপন্ন অবস্থায় ঢাকার হাসপাতালগুলোতে আসছেন।
ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতেও ডেঙ্গু ও হামের রোগীর চাপ বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীমুখী হতে হচ্ছে।
শুধু সরকারি উদ্যোগে মশা নির্মূল সম্ভব নয়
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসাব্যবস্থা দ্রুত ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু সরকারের একার পক্ষে এডিস মশা নির্মূল করা সম্ভব নয়। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে সাধারণ মানুষকেও সরাসরি সম্পৃক্ত করতে হবে।
পাড়া-মহল্লায় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ডেঙ্গুর বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
স্থানীয় পর্যায়ে মশক নিয়ন্ত্রণে জোর
নিপসমের কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার বলেন, এ বছর ঢাকার বাইরের এলাকাগুলোতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। সময়মতো এডিস মশা নিধন এবং স্থায়ী ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম না নেওয়ার কারণে রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এডিস মশা ছড়িয়ে পড়ছে।
তার মতে, আগে এডিস মশার বিস্তার অনেকটা সিটি করপোরেশনকেন্দ্রিক ছিল। সেসব এলাকায় মশার উৎসস্থল ধ্বংস করা গেলে ঢাকার বাইরে বিস্তার অনেকাংশে ঠেকানো সম্ভব হতো।
কিন্তু বর্তমানে ঢাকার বাইরের উপজেলা ও পৌরসভাগুলোও মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাই সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিটি স্তরের মানুষকে মশক নিধন কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে।
পুনরায় আক্রান্তদের ঝুঁকি বেশি
অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও পৃথক ডেঙ্গু কর্নার রাখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, যারা আগে একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, তারা পুনরায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তাই রোগীর উপসর্গের ভিত্তিতে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বর, মাথাব্যথা, সারা শরীরে ব্যথা এবং খাওয়ার রুচি কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি ও লিভারের মতো বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সব ডেঙ্গু রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন নেই
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে প্রথমেই রোগীর রক্তচাপ স্বাভাবিক আছে কি না তা পরীক্ষা করা জরুরি।
রক্তচাপ কমে গেলে কিংবা অন্য কোনো জটিলতা দেখা দিলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। তবে প্রতিটি ডেঙ্গু রোগীকে আইসিইউতে নেওয়া বা হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন নেই।
তার মতে, রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হবে। ডেঙ্গু ও হামের অনেক রোগীর চিকিৎসা হাসপাতালের বহির্বিভাগেও দেওয়া সম্ভব।
ডেঙ্গুতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বাড়ছে চাপ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, হামের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসছে এবং মৃত্যুর হারও কমেছে। তবে হামের পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, আগে একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা পুনরায় আক্রান্ত হলে তাদের ঝুঁকি বেশি থাকে। অন্যদিকে প্রথমবার আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৯০ শতাংশই দ্রুত সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন।
তবে এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ গ্রামাঞ্চলে, অর্থাৎ ঢাকার বাইরে বেশি হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ উদ্বিগ্ন। রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত মশক নিধন কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এ বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ জোরদার করা হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
ডেঙ্গুর বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, এ রোগ এখন আর শুধু রাজধানী বা বড় শহরের সমস্যা নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এডিস মশার বিস্তার এবং আক্রান্তের হার বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
একদিকে যেমন মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে, অন্যদিকে হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় শয্যা, আইসিইউ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি উদ্যোগ, স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলেই ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি