
ইমরান আহমদ/
কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের নির্ধারিত সকল অংশ চার লেনে উন্নীত হলেও কুষ্টিয়া শহরের জগতি এলাকায় বিআরবি কেবলসের সামনে প্রায় আধা কিলোমিটার অংশ এখনো অসম্পূর্ণ। ৯৯ শতক জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ এবং এ-সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থার কারণে সড়কের এক পাশের দুই লেনের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে চার লেনের মহাসড়ক হঠাৎ এসে পরিণত হয়েছে দুই লেনে। এতে মুখোমুখি যান চলাচল, আকস্মিক লেন পরিবর্তন, যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুষ্টিয়া শহর থেকে বটতৈল মোড় পর্যন্ত মহাসড়কের বেশির ভাগ অংশে চার লেন দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। কিন্তু ঐ জায়গাটিতে এসে সড়কের বিন্যাস বদলে যায়। নির্মাণ অসম্পূর্ণ থাকায় দুই দিকের যানবাহনকেই একই অংশ দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। ব্যস্ত সময়ে সেখানে যানবাহনের চাপ বাড়লে সৃষ্টি হচ্ছে জটলা। অপরিচিত চালকদের জন্য হঠাৎ লেন পরিবর্তনের পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এটি আরও বাজে পরিবেশে রুপ নিয়েছে যখন সেখানে যত্রতত্র পেলে রাখা হয় বিভিন্ন কোম্পানীর গাড়ি।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সেখানে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করেছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দূর থেকে সেটি যথেষ্ট দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে রাতে পর্যাপ্ত আলোকব্যবস্থা ও স্পষ্ট লেন বিভাজনের অভাবে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এ অংশে ছোট-বড় দুর্ঘটনা নিয়মিতই ঘটে। নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে ২০২৩ সালের ২০ আগস্ট একটি দুর্ঘটনায় এক যুবক নিহত হন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বিআরবি কেবলসের সামনে ট্রাক-লরির ধাক্কায় মোটরসাইকেলের দুই আরোহী গুরুতর আহত হন; পরে তাঁদের একজন মারা যান। স্থানীয়রা বলছেন, এর বাইরে ছোটখাটো অনেক দুর্ঘটনা নথিভুক্ত হয় না।
মোটরসাইকেলচালক মোকাদ্দেস আলী বলেন, চার লেনের সড়কে চলতে চলতে হঠাৎ দুই লেনের অংশে ঢুকলে বিশেষ করে অপরিচিত চালকেরা বিভ্রান্ত হন। তাঁর মতে, সড়কের দুই পাশে অবৈধ পার্কিং থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ট্রাকচালক রোকনও ওই অংশটিকে চালকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। পাশের খাবারের হোটেল ব্যবসায়ী মোস্তফা কামাল পাশার দাবি, প্রায়ই দুর্ঘটনার পর আহতদের উদ্ধারে স্থানীয়দের এগিয়ে আসতে হয়।
বিরোধের শুরু যেভাবে/
সওজ ও আদালত-সংক্রান্ত নথির তথ্য অনুযায়ী, জগতি মৌজার ৯৯ শতক জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থেকেই বর্তমান জটিলতার সূত্রপাত। সংশ্লিষ্ট জমি সিএস খতিয়ান ২৭, এসএ খতিয়ান ৩১ এবং আরএস খতিয়ান ৪৪-এর আওতাভুক্ত; রিটে ৭০৪ ও ৭০৫ নম্বর দাগ এবং আরএস ৭৯৯ নম্বর দাগের জমির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জমির ওপর দিয়ে ড্রেন নির্মাণের উদ্যোগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়।
রিট আবেদনকারী হিসেবে জগতি এলাকার রেজাউল হকের নাম রয়েছে। তিনি কুষ্টিয়া জেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। মামলায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক, সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং কুষ্টিয়া সদর সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) বিবাদী করা হয়েছে। তবে বর্তমান প্রতিবেদনের জন্য রেজাউল হকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, তিনি পলাতক।
এর আগে ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, জমির বিরোধের বিষয়টি নিষ্পত্তির আগেই ওই এলাকায় সড়কের কাজ শুরু হওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। সেই প্রতিবেদনে ২০২১ সালের একটি চিঠি এবং পরবর্তী সময়ে আদালতে নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে ওই সময়কার প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব তথ্যের স্বাধীন যাচাই বর্তমান প্রতিবেদনের আওতায় করা সম্ভব হয়নি।
আদালতের আদেশে থেমে আছে কাজ/
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থা। ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিলের আদেশে আগের স্থিতাবস্থার আদেশ আরও ছয় মাস বহাল রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ফলে অক্টোবর পর্যন্ত ওই আদেশ কার্যকর থাকার কথা। আদালতের আদেশ বহাল থাকায় সংশ্লিষ্ট জমিতে সড়কের অসম্পূর্ণ কাজ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।
ফলে একদিকে আদালতের আদেশ, অন্যদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ প্রকল্প—দুইয়ের মধ্যে আটকে রয়েছে জনস্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ২০২৩ সালেও এই অংশের কাজ নিয়ে আইনি জটিলতার কথা প্রকাশিত হয়েছিল। অর্থাৎ সমস্যাটি নতুন নয়; দীর্ঘ সময় ধরে এর স্থায়ী সমাধান হয়নি।
জমি কার, প্রশ্নটি এখনো আদালতেই/
কুষ্টিয়া সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ার পারভেজ বলেন, উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থার কারণে তারা মহাসড়কের কাজ শেষ করতে পারছেন না। তাঁর ভাষ্য, বিরোধপূর্ণ ৯৯ শতক জমিকে জেলা পরিষদ নিজেদের জমি দাবি করলেও তার পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি। তাঁর দাবি, এ কারণে সরকারপক্ষ আগের দুটি মামলায় পরাজিত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের মেয়াদও এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। নতুন করে কাজ করতে হলে অর্থের সংস্থানও প্রয়োজন হবে। তাঁর মতে, আদালতের মামলা নিষ্পত্তির পাশাপাশি প্রয়োজন হলে জমি অধিগ্রহণের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হতে পারে।
এ অবস্থায় সমস্যাটির সমাধান শুধু সড়ক নির্মাণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে বিচারাধীন বিরোধ, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর অসম্পূর্ণতা এবং তৃতীয়দিকে প্রতিদিনের জননিরাপত্তার ঝুঁকি—তিনটি বিষয় একই জায়গায় এসে মিলেছে।
জনস্বার্থে এখন প্রয়োজন, আদালতের চলমান কার্যক্রমের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিরোধপূর্ণ জমির নথি, সড়ক নির্মাণের সময়কার ভূমি-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া, প্রকল্পের অনুমোদন ও মেয়াদ এবং এ পর্যন্ত নেওয়া প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলো স্পষ্ট করুক। একই সঙ্গে আদালতের আদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অন্তর্বর্তীকালীনভাবে সড়কটি কীভাবে আরও নিরাপদ করা যায়, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
কারণ চার লেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের মাঝখানে কয়েকশ মিটার অসম্পূর্ণ অংশ এখন শুধু নির্মাণকাজের অপূর্ণতার চিহ্ন নয়; এটি ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আদালতের আদেশ এবং জননিরাপত্তার প্রশ্ন—সবকিছুর একটি দৃশ্যমান প্রতিফলন।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি