
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন /
নবীনদের পদচারণায় মুখর কলেজ প্রাঙ্গণ, শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার প্রত্যয়ে নতুন যাত্রা
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম বাতিঘর হিসেবে খ্যাত কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে একাদশ শ্রেণির (২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ) নবীনবরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-২০২৬। তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, স্বপ্নের দীপ্তি ও আগামীর সম্ভাবনাকে ধারণ করে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল ১১টায় কলেজের মুক্তমঞ্চে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে একাদশ শ্রেণির প্রায় এক হাজার নবীন শিক্ষার্থীকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেওয়া হয়।
ফুলেল শুভেচ্ছা, আন্তরিক অভিনন্দন ও আনন্দঘন পরিবেশে আয়োজিত নবীনবরণকে ঘিরে সকাল থেকেই মুখর হয়ে ওঠে কলেজ প্রাঙ্গণ। শিক্ষক, অতিথি ও শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে পুরো আয়োজন পরিণত হয় এক মিলনমেলায়। নতুন শিক্ষাজীবনের অভিযাত্রায় পা রাখা নবীন শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ আয়োজন সৃষ্টি করে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রত্যাশা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য জনাব রেজা আহমেদ। প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য মোছাঃ ফরিদা ইয়াসমিন। মুখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক সোহরাব উদ্দিন।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ, সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার এবং শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক নাজমুল হুসাইন।
অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক ছিলেন একাদশ শ্রেণির নবীনবরণ উদযাপন কমিটি-২০২৬-এর আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহা: রোকনুজ্জামান। স্বাগত বক্তব্য দেন কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মোঃ আবুল কালাম সাজাদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাঃ আব্দুল লতিফ।
নবীনদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনাব রেজা আহমেদ নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, শিক্ষাজীবন মানুষের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে অর্জিত জ্ঞান, মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতাই ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি তৈরি করে। শুধু ভালো ফলাফল অর্জন করলেই হবে না; মানবিক গুণাবলি, দেশপ্রেম, দায়িত্বশীলতা ও সৃজনশীলতার সমন্বয়ে নিজেদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি শিক্ষার্থীদের সময়ের যথাযথ ব্যবহার, নিয়মিত অধ্যয়ন এবং শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, আজকের নবীন শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনে দেশ পরিচালনা, জ্ঞানচর্চা ও সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
প্রধান বক্তা মোছাঃ ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, উচ্চমাধ্যমিক স্তর শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এ পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা, পেশাগত প্রস্তুতি ও আত্মপ্রতিষ্ঠার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। তাই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার, পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং সমসাময়িক জ্ঞানচর্চায় মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের নবীন শিক্ষার্থীরা নিজেদের মেধা, মনন ও কর্মদক্ষতার মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।
মুখ্য আলোচক বীর মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব উদ্দিন তাঁর বক্তব্যে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার মূল্যবোধ এবং দেশ গঠনে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু সনদ অর্জন নয়; বরং মানুষের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার বিকাশ, বিবেকের জাগরণ এবং মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার মানসিকতা তৈরি করা। তিনি শিক্ষার্থীদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করা এবং অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানান।
শৃঙ্খলা ও সৃজনশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ
অনুষ্ঠানের আলোচক কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জনাব কুতুব উদ্দিন আহমেদ শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া এবং কলেজের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সাফল্য শুধু পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও নেতৃত্বের বিকাশের মধ্যেও একটি প্রতিষ্ঠানের সার্থকতা নিহিত।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক জনাব নাজমুল হুসাইন বলেন, আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনে জাতীয় নেতৃত্ব দেবে। তাই প্রকৃত ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে তাদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ‘আজকের শিক্ষার্থীরাই সবার আগে বাংলাদেশ’—এই স্লোগানে সমাজের অচলায়তন ভেঙে আলোকিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশে সহশিক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্ব
স্বাগত বক্তব্যে কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মোঃ আবুল কালাম সাজাদ নবীন শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের দীর্ঘদিনের শিক্ষা-ঐতিহ্য, সুনাম ও অর্জনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় নবীন শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তিনি কলেজের শিক্ষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিভা বিকাশের পাশাপাশি সমৃদ্ধ শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাঃ আব্দুল লতিফ বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষার্থীদের আগমন শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা। প্রায় এক হাজার নবীন শিক্ষার্থীকে বরণ করে নেওয়া কলেজ পরিবারের জন্য আনন্দ ও গৌরবের বিষয়।
তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত অধ্যয়ন, শৃঙ্খলা, সততা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।
অধ্যক্ষ আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননের বিকাশে পাঠদানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চা, বিতর্ক, সাহিত্যচর্চা, খেলাধুলা এবং অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্ব অপরিসীম। এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্বের গুণাবলি ও সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
নবীনদের ঐতিহ্য ধরে রাখার আহ্বান
নবীনবরণ আয়োজনের উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য তুলে ধরে অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাঃ রোকনুজ্জামান নবীন শিক্ষার্থীদের কলেজের নিয়মকানুন মেনে চলা, শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান।
তিনি প্রত্যাশা করেন, নবীন শিক্ষার্থীরা নিজেদের মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জনাব শাহরিয়ার হোসেন ও মাহাবুবা খাতুন।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর কলেজ প্রাঙ্গণ
আলোচনা পর্ব শেষে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সংগীত, আবৃত্তি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে কলেজের মুক্তমঞ্চ। নবীন শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানজুড়ে সৃষ্টি হয় আনন্দঘন পরিবেশ।
নতুন সহপাঠীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া, পারস্পরিক সৌহার্দ্য তৈরি এবং শিক্ষাজীবনের নতুন অধ্যায়কে স্মরণীয় করে তুলতে সাংস্কৃতিক পর্বটি নবীনদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
নবীনবরণ কেবল আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা নয়; নবাগত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। নতুন পরিবেশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানিয়ে নেওয়া, সহপাঠীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
একই সঙ্গে এ আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক চেতনা, পারস্পরিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধ বিকাশের সুযোগ তৈরি করে।
প্রায় এক হাজার নবীন শিক্ষার্থীকে বরণ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষা অঙ্গনে যুক্ত হলো নতুন একটি সম্ভাবনাময় অধ্যায়। জ্ঞান, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের সমন্বয়ে নিজেদের গড়ে তুলে নবীনদের শিক্ষাযাত্রা সাফল্যমণ্ডিত হোক—এমন প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে শেষ হয় কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির নবীনবরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-২০২৬।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি