
কুষ্টিয়া-২-এর কামারুল আরেফিনের বিরুদ্ধে ৮ কোটি ও কুষ্টিয়া-৪-এর সেলিম আলতাফ জর্জের বিরুদ্ধে ১ কোটি টাকার বেশি অসংগতিপূর্ণ সম্পদের তথ্য
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের কুষ্টিয়ার দুই সাবেক সংসদ সদস্য কামারুল আরেফিন ও সেলিম আলতাফ জর্জের বিরুদ্ধে ৯ কোটি ১০ লাখ ৬৫ হাজার ৪৮৭ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে তাঁদের দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে মোট ২ কোটি ৩২ লাখ ৫৭ হাজার ২৭৯ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগে দুজনের বিরুদ্ধেই দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় মামলা রুজুর অনুমোদন দিয়েছে কমিশনের প্রধান কার্যালয়।
দুদকের কুষ্টিয়া সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের এজাহার অনুযায়ী, সাবেক সংসদ সদস্য কামারুল আরেফিনের বিরুদ্ধে ৮ কোটি ৯ লাখ ১ হাজার ৪৮৪ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১ কোটি ৬৮ লাখ ৮ হাজার ৮০১ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে সেলিম আলতাফ জর্জের বিরুদ্ধে ১ কোটি ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ৬৪ লাখ ৪৮ হাজার ৪৭৮ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ এনেছে দুদক।
দুজনের বিরুদ্ধেই ৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে মামলা রুজুর অনুমোদন দেওয়া হয়। সেলিম আলতাফ জর্জ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলাও রয়েছে। অন্যদিকে কামারুল আরেফিন পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
কামারুলের সম্পদ ১০ কোটি টাকার বেশি, আয়-ব্যয়ের হিসাবে অসংগতি ৮ কোটি
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, কুষ্টিয়া-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও মিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামারুল আরেফিনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার বাণিজ্য, পশুর হাট ও বালুমহাল ইজারায় অনিয়ম, ঠিকাদারি কাজের নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধান করা হয়। এ ছাড়া তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় ছিল। তবে এসব অভিযোগের সব কটির বিষয়ে এজাহারে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অপরাধের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।
অনুসন্ধানের প্রাথমিক পর্যায়ে সত্যতা পাওয়ার পর কামারুল আরেফিনকে সম্পদ ও দায়-দেনার হিসাব বিবরণী দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর করে সম্পদ বিবরণী জমা দেন। সেখানে ৩ কোটি ১৯ লাখ ১৯২ টাকার স্থাবর এবং ৫ কোটি ৯৬ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯ টাকার অস্থাবর সম্পদ দেখান। সব মিলিয়ে তাঁর ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ৯৬ লাখ ৯৭ হাজার ২৫১ টাকা। পাশাপাশি ব্যাংক ও অন্যান্য ঋণ বাবদ ২ কোটি ১৬ হাজার ৯৫৫ টাকার দায়ের তথ্য দেন।
পরে দুদকের যাচাইয়ে তাঁর স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ৯৮ লাখ ৩৬ হাজার ১৮৪ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ৬ কোটি ৬৬ লাখ ৬৯ হাজার ৮৬৮ টাকা পাওয়া যায়। এতে মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ কোটি ৬৫ লাখ ৬ হাজার ৫২ টাকা। অর্থাৎ দাখিল করা বিবরণীর তুলনায় ১ কোটি ৬৮ লাখ ৮ হাজার ৮০১ টাকার সম্পদ বেশি পাওয়া যায়, যা গোপন করা হয়েছে বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
কামারুল আরেফিনের আয়-ব্যয়ের হিসাবেও বড় ধরনের ব্যবধান পেয়েছে দুদক। এজাহারে বলা হয়েছে, ১৯৯৬-৯৭ থেকে ২০২২-২৩ করবর্ষ পর্যন্ত তাঁর গ্রহণযোগ্য আয় ছিল ৮ কোটি ২৫ লাখ ৮ হাজার ৩৫২ টাকা। একই সময়ে পারিবারিক ব্যয়, কর পরিশোধ, অন্যান্য ব্যয় এবং স্ত্রীকে দান বাবদ মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৬৯ লাখ ৩ হাজার ৭৮৪ টাকা।
অনুসন্ধানে পাওয়া ১০ কোটি ৬৫ লাখ ৬ হাজার ৫২ টাকার সম্পদের সঙ্গে ওই ব্যয় যোগ করলে তাঁর মোট সম্পদ ও ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ কোটি ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৮৩৬ টাকা। গ্রহণযোগ্য আয়ের তুলনায় এই পরিমাণ ৮ কোটি ৯ লাখ ১ হাজার ৪৮৪ টাকা বেশি। এ অর্থের সম্পদ জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেলিম জর্জের সম্পদে ৬৪ লাখ টাকার গরমিল
কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পৃথক অনুসন্ধান করে দুদক। তাঁর দাখিল করা সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী, স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৭৪ হাজার ৬৩৫ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ৯৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬৭ টাকা। সে হিসাবে তাঁর ঘোষিত মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ১৬ লাখ ৩৩ হাজার ৮০২ টাকা।
কিন্তু যাচাইয়ে তাঁর স্থাবর সম্পদের পরিমাণ একই পাওয়া গেলেও অস্থাবর সম্পদ পাওয়া যায় ১ কোটি ৬৩ লাখ ৭ হাজার ৬৪৫ টাকা। ফলে মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৮০ লাখ ৮২ হাজার ২৮০ টাকা। ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে এই হিসাবের পার্থক্য ৬৪ লাখ ৪৮ হাজার ৪৭৮ টাকা।
দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, সেলিম আলতাফ জর্জ ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর সম্পদ ও দায়-দেনার হিসাব বিবরণী জমা দেন। পরে তা যাচাইয়ের জন্য অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। টিমের নেতৃত্বে ছিলেন দুদকের কুষ্টিয়া সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মঈনুল হাসান রওশনী; সদস্য ছিলেন সহকারী পরিচালক মো. বুলবুল আহমেদ।
এজাহারের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ করবর্ষ পর্যন্ত সেলিম আলতাফ জর্জের গ্রহণযোগ্য আয় ছিল ১ কোটি ৩৬ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪১ টাকা। পারিবারিক খরচ, কর পরিশোধ ও অন্যান্য ব্যয় বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৭ লাখ ২৭ হাজার ৩৬৪ টাকা। তাঁর মোট সম্পদের সঙ্গে ব্যয় যোগ করলে সম্পদ ও ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি ৩৮ লাখ ৯ হাজার ৬৪৪ টাকা। গ্রহণযোগ্য আয়ের তুলনায় এই অঙ্ক ১ কোটি ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩ টাকা বেশি।
দুদকের অভিযোগ, এই পরিমাণ সম্পদ জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। একই সঙ্গে সম্পদ বিবরণীতে ৬৪ লাখ ৪৮ হাজার ৪৭৮ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করা হয়েছে। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় মামলা রুজুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
একই দিনে দুই মামলার অনুমোদন
দুদকের নথি অনুযায়ী, দুই সাবেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শেষে ২০২৬ সালের ২৪ মে পৃথক প্রতিবেদন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরে ৮ অক্টোবর কমিশন তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা রুজুর অনুমোদন দেয়।
কামারুল আরেফিনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ অর্জন এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও প্রাথমিক অনুসন্ধানের বিষয় ছিল। তবে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর কোন কোনটি মামলার তদন্তে প্রমাণিত হয়, তা এখনো নির্ধারিত নয়।
দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, মামলার তদন্তকালে সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো সম্পদের তথ্য পাওয়া গেলে কিংবা অন্য কারও সম্পৃক্ততা শনাক্ত হলে তাঁদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি