
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য রাশিয়া থেকে আমদানি করা পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়ামের প্রথম চালান প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল ১০টা ৫ মিনিটের দিকে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে জ্বালানিবাহী গাড়িটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্ধারিত এলাকায় প্রবেশ করে। এর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রমে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ যুক্ত হলো।
প্রকল্প এলাকায় চালানটি পৌঁছালে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি ও রাশিয়ান কর্মকর্তারা জ্বালানিবাহী গাড়িটিকে স্বাগত জানান। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুসারে দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক জ্বালানি দেশে আনার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
রাশিয়া থেকে ঢাকায়, এরপর সড়কপথে রূপপুর
এর আগে গত ২ অক্টোবর রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাশিয়া থেকে ভারত হয়ে বিশেষ কার্গো উড়োজাহাজে ইউরেনিয়ামের চালানটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। পরে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে সড়কপথে চালানটি পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নেওয়া হয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য নির্ধারিত এই জ্বালানি চালান গত ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার পথে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে চালানটি পরিবহন করা সম্ভব হয়নি। পরে বিকল্প পরিকল্পনায় পরিবহনের ব্যবস্থা করে ২ অক্টোবর জ্বালানিটি দেশে আনা হয়।
পারমাণবিক জ্বালানির পরিবহন সাধারণ পণ্য পরিবহনের মতো নয়। এ ধরনের জ্বালানি পরিবহনে নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রটোকল, নিয়ন্ত্রিত হ্যান্ডলিং এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। রূপপুরে চালান পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনা
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটমের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত পারমাণবিক জ্বালানি বাংলাদেশে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট নয়টি ফ্লাইটে প্রথম ইউনিটের জন্য অতিরিক্ত ৪৮টি এবং দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ১৬৩টি ইউরেনিয়াম ফুয়েল অ্যাসেম্বলি দেশে আনার কথা। অর্থাৎ, উভয় ইউনিটের জন্য নির্ধারিত এই সরবরাহসূচিতে মোট ২১১টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ফুয়েল অ্যাসেম্বলি হলো পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহারের উপযোগী বিশেষভাবে প্রস্তুত জ্বালানি উপাদানের সমন্বিত কাঠামো। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হয়। সেই তাপ কাজে লাগিয়ে বাষ্প তৈরি করা হয়, যা টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়তা করে।
তবে জ্বালানি দেশে পৌঁছানো এবং তা চুল্লিতে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হওয়া এক বিষয় নয়। নির্ধারিত সংরক্ষণ, পরিদর্শন, নিরাপত্তা যাচাই এবং কমিশনিং-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরই জ্বালানি ব্যবহারের পরবর্তী ধাপে যাওয়া সম্ভব।
প্রথম ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহের পর দ্বিতীয় ইউনিটে অগ্রগতি
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য ২০২৪ সালের অক্টোবরে পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ শুরু হয়। এরপর কয়েক ধাপে জ্বালানি দেশে আনা হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ অক্টোবর প্রথম ইউনিটের জন্য সর্বশেষ একটি চালান আসে।
এবার দ্বিতীয় ইউনিটের প্রথম চালান পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রম আরও এগিয়ে গেল। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ইউনিট সচল করার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা কমিশনিং ও ভবিষ্যৎ পরিচালন প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি পৌঁছানোকে ওই ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর সমতুল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি যন্ত্রপাতি পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই, সিস্টেম চালু করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনসহ একাধিক ধাপ সম্পন্ন করতে হয়।
প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রম চলমান
এদিকে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। সম্প্রতি ইউনিটটির সেফটি ভাল্বের ১৬ মেগাপ্যাসকেল উচ্চচাপ পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেফটি ভাল্ব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উপাদান। সিস্টেমে চাপ নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে চাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা এর অন্যতম কাজ। উচ্চচাপ পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট উপাদানের কার্যকারিতা ও নির্ধারিত চাপ সহ্য করার সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে একটি উপাদানের পরীক্ষা সফল হওয়া মানেই পুরো ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত—এমন নয়। চুল্লি ও সংশ্লিষ্ট সিস্টেমের সামগ্রিক নিরাপত্তা, কার্যকারিতা এবং নির্ধারিত কমিশনিং পরীক্ষা সম্পন্ন করা প্রয়োজন।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রিটিক্যালিটি পর্যায়ে যাওয়ার আগে আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে এসব পরীক্ষা শেষ করা সম্ভব হলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ক্রিটিক্যালিটি হলো পারমাণবিক চুল্লির এমন একটি অবস্থা, যেখানে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া স্বনির্ভরভাবে চলতে থাকে। এটি চুল্লি চালুর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। তবে ক্রিটিক্যালিটি অর্জন এবং বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা এক বিষয় নয়; এর পরও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, ধাপে ধাপে ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে।
দুটি ইউনিটে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের পরিকল্পিত উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। সে হিসাবে দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটি থেকে জাতীয় গ্রিডে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থায় বড় আকারের এই কেন্দ্র যুক্ত হলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন উৎসের বৈচিত্র্য বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পরিকল্পিত হয়। ফলে যথাযথ নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্য পরিচালনা নিশ্চিত করা গেলে এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বাস্তবে কেন্দ্রটির অবদান নির্ভর করবে ইউনিটগুলোর বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর সময়, পরিচালন সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত করার প্রস্তুতির ওপর।
দ্বিতীয় ইউনিটের প্রথম ইউরেনিয়াম চালান পৌঁছানো তাই শুধু জ্বালানি পরিবহনের একটি ঘটনা নয়; এটি রূপপুর প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিচালন প্রস্তুতির ধারাবাহিক অগ্রগতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ, কমিশনিং পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার ওপরই শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করবে।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি