

শুভব্রত আমান
দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা ধাপ পেরিয়ে অবশেষে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক মেগা প্রকল্প--রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র--তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের চূড়ান্ত পাঁচ সপ্তাহের ক্ষণগণনা বা কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ অর্থাৎ আগামী পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে পারে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বাএরা) চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পর গত শুক্রবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে এর প্রথম ইউনিটের 'স্টার্টআপ' বা চালুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রথম ও অন্যতম সংবেদনশীল ধাপ হলো এই স্টার্টআপ প্রক্রিয়া। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে প্লান্টটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'সি-স্টেজ' (C-stage) ধাপে রয়েছে। এই পর্যায়ে চুল্লির (reactor) ভেতরের তাপমাত্রা এবং চাপ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো চুল্লির পারফরম্যান্সের পাশাপাশি কুলিং সিস্টেম, টারবাইন, জেনারেটর এবং জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলোর নিখুঁত কার্যকারিতা যাচাই করা। চুল্লির ক্ষমতা যখন শূন্য থেকে বাড়িয়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে, তখনই প্লান্টটি পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী হয়ে উঠবে।
নিউ ক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাদুল হাসান বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, সি-স্টেজের এই পুরো সময়জুড়ে বিভিন্ন ধাপে কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হবে। চুল্লির ক্ষমতা ৩০ শতাংশে পৌঁছানোর মাধ্যমেই মূলত পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঐতিহাসিক পর্যায়টি বাস্তবায়িত হবে।
তিনি আরও বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে কেবল বিদ্যুৎ তৈরি করাই শেষ কথা নয়, উৎপাদিত বিদ্যুৎকে জাতীয় গ্রিডের সাথে সুচারুভাবে যুক্ত করা অত্যন্ত জটিল একটি প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া।
প্লান্টের জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের অপারেটিং ফ্রিকোয়েন্সি ও প্যারামিটারের সাথে নিখুঁতভাবে সিঙ্ক্রোনাইজ বা সমলয় করতে হয়। রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের ক্ষেত্রে এই কাজটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সম্পন্ন করা হচ্ছে, যাতে গ্রিডের স্থিতিশীলতা কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) কঠোর নীতিমালা ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুসরণ করেই প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর আগে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে প্লান্টটিতে ইউরেনিয়ামের নতুন চালান পৌঁছানোর ঘটনা পুরো প্রকল্পের প্রস্তুতিকে আরও গতিশীল করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়াই বাণিজ্যিক উৎপাদনের চূড়ান্ত ঘোষণা নয়। এটি মূলত একটি ট্রায়াল রান বা পরীক্ষামূলক পর্যায়। পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরুর পরও প্লান্টটিকে দীর্ঘ সাত থেকে আট মাস ধরে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অডিটের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। চুল্লি, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সুরক্ষামূলক সরঞ্জামগুলো বিভিন্ন পাওয়ার লেভেলে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদে ও নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে পারছে কি না, তা নিশ্চিত করার পরই বাণিজ্যিক উৎপাদনের অনুমতি মিলবে। সব প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ করে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে আরও প্রায় এক বছর সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর এই ক্ষণগণনা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো এবং ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শক্তির উৎস নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমদানীকৃত জ্বালানির বাজার অস্থিতিশীলতার এই সময়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে তা দেশের শিল্পায়ন, উৎপাদনশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এখন পুরো জাতির দৃষ্টি কেবল ওই পাঁচ সপ্তাহ পরের ঐতিহাসিক মুহূর্তটির দিকে—যখন রূপপুরের বিদ্যুৎ প্রথমবারের মতো দেশের ঘরে ঘরে আলো ছড়াতে শুরু করবে।
সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর : ড. আমানুর আমান,এম.ফিল (আইইউকে), পিএইচডি ( এনবিইউ- দার্জিলিং)
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: শাহনাজ আমান।
কার্যালয়:- থানা ট্রাফিক মোড়, কুষ্টিয়া।মোবাইল- ০১৭১৩-৯১৪৫৭০, ইমেইল: info.dailykushtia@gmail.com
ই-পেপার কপি