October 30, 2020, 5:11 am

রবীন্দ্রজয়ন্তী/ রবীন্দ্রনাথ : এক বহুবর্ণময় বিকিরণ

ড. আমানুর আমান//
আজ পঁচিশে বৈশাখ, ১৫৯ বছর আগে, বাংলা সালটি ছিল ১২৬৮, ঠিক এই দিনেই জন্ম হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের অনন্যপ্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কলকাতায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। আজ তাঁর ১৬০তম জন্মদিন।
বাংলা সাহিত্যে তাঁর স্থান অনন্য, অসাধারন। বাংলা সাহিত্যের সব কটি ধারা তার লেখনীতে সমৃদ্ধ। বাংলা সাহিত্যে একমাত্র রবীন্দ্রনাথেরই একটি নিজস্ব অধ্যায় রয়েছে। যে অধ্যায় বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে এক মহান উচ্চতা। রবীন্দ্রনাথ বাংলার কবি, বাঙালির কবি। তারও অধিক তিনি ছিলেন বিশ্বচরাচরের কবি ; বিশ্বকবি।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য বাস্তবতা ছিল মিলিত প্রাণের প্রেমের। এই মিলন সমগ্র সত্তার সাথে প্রতিটি সত্তার ; প্রাণীজগৎ, নিসর্গ, প্রকৃতিকে । শুধু তাই নয়, শিল্পের জগত, কল্পনার জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের বিস্তার ঘটানো।
রবীন্দ্রনাথকে বলা হয় ভার্সেটাইল জিনিয়াস। তিনি ছিলেন কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজ-সংস্কারক। মূলত কবি হিসেবেই তাঁর প্রতিভা বিশ্বময় স্বীকৃত। ১৯১৩ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এশিয়ার বিদগ্ধ ও বরেণ্য ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই পুরস্কার জয়ের গৌরব অর্জন করেন।
রবীন্দ্রনাথের সমগ্র জীবনই ছিল তার সৃষ্টির আধার। জীবনের পর্বে পর্বে তাঁর জীবনজিজ্ঞাসা ও সাহিত্যাদর্শের সন্ধান মেলে। যুগে যুগে পৃথিবীতে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা, দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে রূপান্তর ঘটেছে, রবীন্দ্রনাথ সবকিছুকেই আত্ম¯’ করেছেন গভীর অনুশীলন, ক্রমাগত নিরীক্ষা এবং বিশ্বপরিক্রমার মধ্য দিয়ে। তাই তাঁর সাহিত্যজীবনের নানা পর্যায়ে বিষয় ও আঙ্গিকের নিরন্তর পালাবদল লক্ষণীয়। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল তাঁর অসংখ্য কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য, ভ্রমণকাহিনী, চিঠিপত্র এবং দেশে বিদেশে প্রদত্ত বক্তৃতামালা। রবীন্দ্রনাথের অন্তর্নিহিত জীবনবোধ ছিল স্থির এবং বহু পরিবর্তনকে স্বীকার করে নিয়েও আপন আদর্শে প্রতিষ্ঠিত; অন্যদিকে তাঁর সৃজনশীল রূপটি ছিল চলিষ্ণু ও পরিবর্তনশীল। রবীন্দ্রনাথ কেবল তাঁর কালের কবি নন, তিনি কালজয়ী। বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর আবির্ভাব ছিল এক যুগান্তর।
রবীন্দ্রনাথের কাব্য বহুবর্ণময়। তার কাব্য কখনও রক্ষণশীল ধ্রুপদি শৈলীতে, কখনও হাস্যোজ্জ্বল লঘুতায়, কখনও বা দার্শনিক গাম্ভীরে, আবার কখনও বা আনন্দের উচ্ছাসে মুখরিত। এই কাব্যগুলির উৎস পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে রচিত বৈষ্ণব কবিদের পদাবলি সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের কাব্যে গভীর প্রভাব বিস্তার করেন উপনিষদ রচয়িতা ঋষিকবিগণ। এঁদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য হলেন ব্যাস। এছাড়াও অতিন্দ্রীয়বাদী সুফি সন্ত কবীর ও ভক্তিবাদী কবি রামপ্রসাদের প্রভাবও তার কাব্যে লক্ষিত হয়। (তথ্য সুত্র) তবে রবীন্দ্রনাথের কবিতা সৃষ্টিশীলতা ও সৌকর্যের সর্বো”চ চূড়ায় উপনীত হয়, গ্রামীণ বাংলার লোকসঙ্গীতের সঙ্গে তার পরিচিতি লাভের পরই। এই সময় লালন শাহ সহ বাংলার বিশিষ্ট বাউল সংগীতস্রষ্টাদের সান্নিধ্যে আসেন কবি। বাউল সংগীতকে পুনরাবিষ্কার করে জনপ্রিয় করে তুলতে রবীন্দ্রনাথ বিশেষ ভূমিকা নেন। এই সব বাউল গান উনিশ শতকের কর্তাভজাদের গানের মতো অন্তর্নিহিত দৈবসত্ত্বার অনুসন্ধান ও ধর্মীয় ও সামাজিক গোঁড়ামির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথা ছিল।শিলাইদহে অবস্থানকালে তার গীতিকবিতার জন্য একটি শব্দবন্ধ তিনি গ্রহণ করেন বাউল পদাবলি থেকে – মনের মানুষ। ধ্যান করেন তার জীবন দেবতার। প্রকৃতি ও মানবচরিত্রের আবেগময় নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে এই যোগসূত্রটি পরমসত্ত্বার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ভানুসিংহের নামাঙ্কিত কবিতাগুলিতেও কবি এই শৈলীর ব্যবহার ঘটান। রাধা ও কৃষ্ণের প্রণয়লীলাকে উপজীব্য করে লেখা এই কবিতাগুলি পরবর্তী সত্তর বছরে বারংবার সংশোধন করেছিলেন কবি। (তথ্য সুত্র)
মনে করা হয় রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির মধ্যে সবথেকে বেশী প্রভাব বিস্তারকারী হলো তাঁর গান। তিনি প্রায় ২৫০০০টি গান রচনা করেন। রবীন্দ্রসংগীত নামে পরিচিত এই গীতিগুচ্ছ বাংলার সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। রবীন্দ্রনাথের গান তার সাহিত্যের সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত তার বহু কবিতা যেমন গানে রূপান্তরিত হয়েছে, তেমনই তার উপন্যাস, গল্প বা নাটকেও বিশিষ্ট ভূমিকা নিয়েছে তার গান। তার গানের মূল উৎস হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের ঠুমরি শৈলী। প্রথম জীবনে লেখা করণ ব্রাহ্ম ধর্মসঙ্গীত থেকে ছদ্ম-কামোদ্দীপক লঘু সঙ্গীত – রবীন্দ্রনাথের গান সকল প্রকার মানবিক আবেগকেই সুরবদ্ধ করেছে।(তথ্য সুত্র) বিভিন্ন প্রকার শাস্ত্রীয় রাগের সুরগত সৌন্দর্যকে প্রতিফলিত করেছে এই গানগুলি। কখনও কখনও কোনো নির্দিষ্ট রাগের তান ও ছন্দকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে অনুসরণ করেছে। আবার কখনও রচনার সৃষ্টিসৌকর্যকে উজ্জ্বল করে ফুটিয়ে তোলার জন্য তিনি ব্যবহার করেছেন একাধিক রাগের উপাদান। (তথ্য সুত্র) শুধু হিন্দুস্তানি সংগীতই নয়, রবীন্দ্রনাথের গানে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে কর্ণাটিক শাস্ত্রীয় সংগীত, বাংলা লোকসঙ্গীত এমনকি ইংরেজি ব্যালাড ও স্কটিশ লোকগীতিও। ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী প্রদত্ত একটি তালিকা অনুসারে, রবীন্দ্রনাথের ভাঙা গান, অর্থাৎ, অপরের সঙ্গীত থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রচিত গানের সংখ্যা ২৩৪। (তথ্য সুত্র) স্বরচিত কবিতা ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ সুর দেন বিভিন্ন বেদগান এবং বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার বড়াল ও সুকুমার রায়ে গীতিকবিতাতেও। ভারতের জাতীয় স্তোত্র বন্দেমাতরম-এর সুরও রবীন্দ্রনাথেরই দেয়া।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের আবেগময়ী শক্তি ও সৌন্দর্যের আকর্ষণ বাঙালি সমাজে অমোঘ। মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় এই প্রসঙ্গে লেখা হয়, “বাংলায় এমন কোনো শিক্ষিত গৃহ নেই যেখানে রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়া বা অন্ততপক্ষে গাওয়ার চেষ্টা করা হয় না… এমনকি অশিক্ষিত গ্রামবাসীরাও তাঁর গান গেয়ে থাকেন। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত আমার সোনার বাংলা ও ভারতের জাতীয় সঙ্গীত জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে রবীন্দ্রনাথেরই রচনা। তিনিই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যিনি দুটি রাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টা। এছাড়াও, বিশিষ্ট সেতার বাদক বিলায়েত খান, সরোদিয়া বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ও আমজাদ আলি খানের বাদনশৈলীকেও বিশেষভাবে প্রভাবিত করে রবীন্দ্রসংগীত।(তথ্য সুত্র) গীতবিতান সংকলনে সংগৃহীত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের সব গান।

নিউজটি শেয়ার করুন..


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

MonTueWedThuFriSatSun
   1234
262728293031 
       
     12
31      
      1
2345678
16171819202122
23242526272829
3031     
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
242526272829 
       
© All rights reserved © 2020 dainikkushtia.net
Design & Developed BY Anamul Rasel