June 25, 2021, 12:45 pm

মোটা চাল কেটে চিকন করে প্রতারণা, উদ্যোগ নেবে সরকার, তালিকায় কুষ্টিয়ার ৪টি চালকল

দৈনিক কুষ্টিয়া প্রতিবেদক/
বাজারে বিভিন্ন নামে যেসব চিকন চাল পাওয়া যায় তার বেশীরভাগ উৎস মোটা ধান। চিকন ধান থেকে এসব চিকন চাল আসেনি। এসেছে মোটা ধান থেকে। এভাবে মোটা চাল কেটে চিকন করে বেশি দামে বিক্রি করে ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে এক শ্রেণির অসাধু মিল মালিক। এই প্রতারণা রোধে বাজারে থাকা চালের উৎস ও ধানের জাত নির্ণয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য ২১টি জেলায় একটি সমীক্ষা চালানো হবে। এই তালিকায় রয়েছে যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, বগুড়া, নওগাঁ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, জামালপুর, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, নোয়াখালী, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা।
জানা গেছে তালিকায় কুষ্টিয়ার ৪টি চালকল রয়েছে।
এসব জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে বিভিন্ন নাম ব্র্যান্ডের চাল কোন কোন জাতের ধান থেকে তৈরি করা হচ্ছে, তা নির্ণয় বা অনুসন্ধানের জন্য খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) ১৩ জন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, চালকল মালিকরা মোটা চাল চিকন করে মিনিকেট, নাজিরশাইল, কাজল নামে বাজারজাত করছেন। এতে মোটা চালের ভেতরের অংশ বেশি দামে কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। এছাড়া চালের উপরিভাগে যে পুষ্টি থাকে তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন ওই চালের ভোক্তা। এতে স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
ধান গবেষণা, বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্যমতে, দেশে উৎপাদিত চালের ৮৫ শতাংশই মোটা, আর ১৫ শতাংশ চিকন।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দেশে বোরো ও আমন মৌসুমে ব্যাপকভাবে চাষ হয় ব্রি ২৮ ও ব্রি ২৯ ধান। কিন্তু চালের বাজারে এই নামে কোনো চাল নেই। বাজারে মিনিকেট ও নাজিরশাইল নামে চাল পাওয়া যায়, কিন্তু এই নামে ধানের কোনো জাত নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্রি-২৮ এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্রি-২৯ ধান কেটে ‘মিনিকেট’ নামে বাজারজাত করা হয়। একইভাবে ব্রি ২৯ ধান অধিক ছাঁটাই ও পলিশ করে চালের নাম দেয়া হয় ‘নাজিরশাইল’। বাজারে অনেক ব্র্যান্ডের চাল বিক্রি হচ্ছে। চালকল মালিকরা অটো রাইস মিলে চাল তৈরি করে নিজস্ব নামে ব্র্যান্ডিং করে বাজারে দিচ্ছে।
এ ব্যাপারে কুষ্টিয়ার খাজানগরের কয়েকজন চালকল মালিক ও চাল বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান সারাদেশের মধ্যে কুষ্টিয়ার চালকল গুলোকে এ ধরনের প্রতারনার শীর্ষে পাওয়া যাবে।
জানা গেছে এখানে চালকল মালিকরা প্রকাশ্যেই মোটা চাল মেশিনে দিয়ে চারপাশ থেকে ছেঁটে ফেলে চিকন করে মিনিকেট, কাজল লতা ও ব্রি-২৮ নামে বিক্রি করছেন। কমদামের মোটা চাল চিকন করে কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা করে বাড়তি দাম পাচ্ছেন মিল মালিকরা। আর চালের ছেঁটে ফেলা অংশ চালের গুঁড়ি হিসেবে বিক্রি করে পাচ্ছেন বাড়তি মুনাফা।
মোটা চাল চিকন করে মিনিকেট, কাজল, ব্রি-২৮ নামে বাজারজাত করার কথা স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ অটো রাইস ও মেজর হাস্কিং মিল মালিক সমিতির সভাপতি ও রশিদ অ্যাগ্রো ফুডের মালিক আবদুর রশিদ।
তিনিই প্রথম আধুনিক মেশিনে মোটা চাল চিকন করে মিনিকেট নামে বাজারে ছাড়া শুরু করেন। ধান ও কৃষির সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন সংস্থাও এ তথ্য স্বীকার করেছে।
এর আগে কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনেও বলা হয়, দেশে মিনিকেট নামে আদতে কোনো ধান নেই। মোটা চাল মেশিনে চিকন করে মিনিকেট নামে বিক্রি করছে মিল মালিকরা।
ধান গবেষণা, বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্যমতে, দেশে উৎপাদিত চালের ৮৫ শতাংশই সেকারণে সরকারিভাবে চালের মূল্য নির্ধারণেও মোটা চালকে ধরে কেজিপ্রতি ৩১ টাকা থেকে ৩৫ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কুষ্টিয়া আঞ্চলিক শাখার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, মোট উৎপাদিত চালের ১৫ ভাগ চিকন।
দেশের সবচেয়ে বড় চাল ব্যবসায়ী আবদুর রশিদ বলেন, দেশের চিকন, মাঝারি চিকন ও লম্বা চাল মেশিনে দিয়ে আরও সরু করে মিনিকেট নামে বাজারে ছাড়ছে চালকলগুলো। এই চালের মান যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন চালকল মালিক বিভিন্ন ব্র্যান্ড ব্যবহার করে মিনিকেট বাজারে ছাড়ছেন।
অন্য মিলগুলোর মিনিকেটে বিভিন্ন জাতের চালের মিশ্রণ থাকার কথা জানালেও নিজের চালের ক্ষেত্রে এ অভিযোগ স্বীকার করেননি রশিদ।
কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বলেন, মোটা ও মাঝারি মোটা চাল চিকন করে বাজারে মিনিকেট নামে বিক্রি হচ্ছে।
কুষ্টিয়া বড় বাজারে চালের আড়ত মালিক রাজু আহমেদ বলেন, ক্রেতাদের সবাই চিকন চাল চান। সারা দিনে যত চাল বিক্রি হচ্ছে, তার বেশির ভাগই চিকন চাল।
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড টেকনোলজি বিভাগের প্রধান ড. মো. আবুল কাশেম তালুকদার বাজার থেকে জনপ্রিয় আটটি ব্র্যান্ডের মিনিকেট নামের চালের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেন। তাতে দেখা গেছে, সব ব্র্যান্ডের চালই মোটা চাল কেটে-ছেঁটে পলিশ করে চিকন করা হয়েছে। স্বাভাবিক চাল থেকে যে ফ্যাট ও ভিটামিন বি-২সহ যেসব খাদ্য ক্যালরি পাওয়ার কথা, বাজারে বিক্রি হওয়া মিনিকেটে তার কিছুই নেই।

নিউজটি শেয়ার করুন..


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

MonTueWedThuFriSatSun
21222324252627
282930    
       
       
       
    123
       
     12
31      
      1
2345678
16171819202122
23242526272829
3031     
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
242526272829 
       
© All rights reserved © 2021 dainikkushtia.net
Design & Developed BY Anamul Rasel