May 12, 2021, 5:19 am

কুষ্টিয়ার গৌরব বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের জন্মবার্ষিকী পালিত

দৈনিক কুষ্টিয়া প্রতিবেদক/
কুষ্টিয়ার গৌরব বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের ১৩৫তম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছে তাঁর জন্মস্থান মিরপুরের কাকিলাদহ গ্রামে। ড. রাধাবিনোদ পাল মডেল স্কুলের উদ্যোগে সেখানে আয়োজন করা হয় আলোচনা সভা। আলোচনা সভা শেষে কেক কাটা হয়। উপস্থিত ছিলেন এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ।
বিগত শতাব্দের চল্লিশের দশক কিংবা তার আগে যে সব জাপানির জন্ম, তাদের অনেকেই যে ক’ জন ভারতবাসীর নাম জানেন, তাদের মধ্যে অন্যতম রয়েছেন বিচারপতি ডক্টর রাধাবিনোদ পাল। জাপানে তার পরিচিতির একটা বিশেষ কারণ আছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয় ও আতœসমর্পনের পর আমেরিকার নেতৃত্বাধীন মিত্রবাহিনী নুরেমবার্গ ট্রায়ালের আদলে জাপানিদের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য টোকিও ওয়ার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে গঠিত ওই ট্রাইব্যুনালে ব্রিটিশদের মনোনীত একজন বিচারক ছিলেন কোলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি ও পরে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর রাধাবিনোদ পাল। মজার ব্যাপার, ট্রাইব্যুনালের অন্য সব বিচারক যুদ্ধাপরাধের দায়ে জাপানকে অভিযুক্ত করলেও, বিচারপতি পাল ” নট গিলটি ” রায় দেন। তাঁর বিবেচনায়, জাপানের ওই যুদ্ধ আগ্রাসী যুদ্ধ ছিল না, বরং আতœরক্ষার জন্যেই জাপান যুদ্ধ করেছে। এই বিষয়টি তখন খুবই আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, যদিও দীর্ঘ আটশো পৃষ্ঠার রায়ে দেয়া তাঁর বক্তব্যের যুক্তি ও সারবস্তু উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না । তথাপি সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ে জাপান দোষী প্রমাণিত হয়, মন্ত্রী – সেনাপতি সহ কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড এবং অনেকের দীর্ঘ মেয়াদের কারাদণ্ড দেয়া হয়। উল্লেখ্য, ভারত তখন ছিল বৃটিশের উপনিবেশ, সেই পরাধীন ভারতের একজন স্বাধীনতাকামী মানুষ জাপানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সে দেশের সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন, জাপানিরা এখনো সেকথা স্মরণে রেখেছে।
রাধাবিনোদ পালের জন্ম ১৮৮৬ সালের ২৭শে ( মতান্তরে ৭ ) জানুয়ারি তৎকালীন নদীয়া, বর্তমানে কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার সলিমপুরে তার দাদুর বাড়িতে। অন্যদিকে তার ঠাকুরদার বাড়ি নদীর এপারে মিরপুর উপজেলার আমলার কাছে কাকিলাদহ গ্রামে ( এটাই আমার সংগৃহীত তথ্য) । খুবই সাধারণ দরিদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম, কেবল মেধা আর অধ্যবসায়ের জোরে নিজের বৃত্তির অর্থ এবং বিভিন্ন সময়ে নানা জনের বাড়িতে আশ্রিত থেকে তিনি জীবনে শুধু প্রতিষ্ঠিত নয়, দেশে- বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছেন।
রাধাবিনোদ ১৯০৩ সালে নওগাঁর ধুবলহাটি রাজা হরনাথ হাইস্কুল থেকে বৃত্তি নিয়ে এনট্রান্স ( ম্যাট্রিক ) এবং আবারো বৃত্তিসহ রাজশাহী কলেজ থেকে ১৯০৫ সালে পাশ করেন। এরপর কোলকাতায় গিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯০৭ সালে গণিতশাস্ত্রে অনার্সসহ ই.অ এবং পরের বছর একই বিষয়ে গ.অ ডিগ্রি লাভ করেন।
কর্মজীবনের শুরুতে রাধাবিনোদ প্রথমে দুই বছর এলাহাবাদ অ্যাকাউনটেন্ট জেনারেল অফিসে করণিক ছিলেন, এই সময় তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ই.খ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এবার তিনি ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে গণিতের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯২০ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে গ.খ ( মাস্টার অফ ল) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরআগেই তিনি কোলকাতা হাইকর্টে আইনজীবী হিসাবে তালিকাভুক্ত হয়েছিলেন, এবার শিক্ষকতা ছেড়ে ১৯২১ সালে আইনপেশায় যোগদান করেন। এর বাইরে ১৯২৩ থেকে ১৯৩৬ তের বছর তিনি ল’ কলেজের প্রফেসর ছিলেন। ১৯২৪ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টর অফ ল ডিগ্রি প্রদান করে।
ডক্টর পাল তিন বার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেগোর প্রফেসর অফ ল, ভারত সরকারের ইনকাম ট্যাক্স বিষয়ে লিগাল অ্যাডভাইজার ছিলেন ১৯৪১ থেকে ‘৪৩ সালের মধ্যে দু” বার তিনি হাইকোর্টের বিচারপতির দায়িত্বপালন করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালের উপাচার্যের ( ঠ. ঈ) পদ লাভ করেন এবং ১৯৪৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন। এই সময়ে ঘটে তার জীবনের এক স্মরণীয় ঘটনা। বৃটিশ সরকার তাকে টোকিও ট্রাইব্যুনালের অন্যতম বিচারক নিয়োগ করেন, যে কথা শুরুতেই বলা হয়েছে।
১৯৫৯ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মবিভূষণ উপাধিতে সম্মানিত করেন। ১৯৬২ সালে তিনি আবার আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হন, ১৯৬৬ সালে শেষ সম্মান আসে জাপান থেকে। নিহন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক খখ.উ উপাধি দেয়, জাপানের সম্রাট তাঁকে ঋরৎংঃ ঙৎফবৎ ড়ভ ঝধপৎবফ ঞৎবধংঁৎব সম্মানে ভূষিত করেন। টোকিও ও কিয়োতো’ র মেট্রোপলিটন সরকারদ্বয় তাকে যথাক্রমে দুই নগরীর পক্ষ থেকে সম্মানিত করে।
সব সম্মান, সব গৌরব মাথায় নিয়ে ১৯৬৭ সালের ১০ ই জানুয়ারি বিচারপতি ডক্টর রাধাবিনোদ পাল পরপারের যাত্রী হন।

নিউজটি শেয়ার করুন..


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

MonTueWedThuFriSatSun
     12
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31      
       
       
    123
       
     12
31      
      1
2345678
16171819202122
23242526272829
3031     
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
242526272829 
       
© All rights reserved © 2021 dainikkushtia.net
Design & Developed BY Anamul Rasel