July 26, 2026, 8:59 am

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
স্থানীয় সরকার নির্বাচন/গণতন্ত্রের নতুন পরীক্ষা চলমান প্রকল্পের কাজ সরকারি বিধি অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করতে হবে: ইবি উপাচার্য রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ/ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে স্পিকার দুই দিনে কুষ্টিয়া-চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে ১৩ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ব্যর্থ বিএসএফ ৮০৩ শিশু মৃত্যূ: সংখ্যার নৈতিক অভিঘাত /মৃত্যুর হিসাব আছে, দায়ের হিসাব কোথায়? ক্যাম্পাসের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ: ২২টি ডাস্টবিন স্থাপন এক মুক্তিযোদ্ধার রাজনৈতিক বৈপরীত্য/গাজী নজরুলের উত্থান, বিতর্ক ও শেষ পরিণতি ভালো ফলন, সন্তোষজনক দামে চাঙা পশ্চিমাঞ্চলের পাটের বাজার কুষ্টিয়ায় মাদ্রাসায় ঘুমিয়ে থাকা শিশুকে বলাৎকার/ হুজুর বলল ‘মনে করো তুমি স্বপ্ন দেখতেছ’ ইবি উপাচার্যের সঙ্গে IEEE স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের সৌজন্য সাক্ষাৎ

বাউল নির্যাতন ও হাইকোর্টের বার্তা/ রাষ্ট্র কি এবার তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবে?

ড.আমানুর আমান
বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু সাংস্কৃতিক ধারা রয়েছে, যেগুলো কেবল শিল্প বা সংগীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে মৌলিক ভূমিকা রেখেছে। বাউলধারা তেমনই এক জীবনদর্শন। এই দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু মানুষ—তার বিবেক, তার প্রেম, তার আত্মিক মুক্তি। এখানে বিভাজনের পরিবর্তে মিলনের আহ্বান, ঘৃণার পরিবর্তে সহমর্মিতা এবং সংকীর্ণতার পরিবর্তে মানবতার শিক্ষা দেওয়া হয়। তাই বাউলগান শুধু লোকসংগীত নয়; এটি বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত দলিল।
এই কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে বাউল, ফকির ও সুফি অনুসারীদের ওপর ধারাবাহিক হামলা, আখড়া ও মাজারে ভাঙচুর, গান পরিবেশনে বাধা, এমনকি চুল ও জটা কেটে অপমান করার অভিযোগ কেবল বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব, নাগরিক স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধের ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত।
এমন এক প্রেক্ষাপটে বাউল-ফকির ও সন্ন্যাসীদের ওপর হামলার অভিযোগ তদন্তে হাইকোর্টের নির্দেশ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং তাৎপর্যপূর্ণ। আদালত শুধু তদন্তের নির্দেশই দেননি; একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন—সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। এই প্রশ্নের গুরুত্ব একটি মামলার সীমা অতিক্রম করে রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্বের কেন্দ্রে পৌঁছে যায়।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা এবং ধর্ম পালন ও চর্চার অধিকার দিয়েছে। সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩৬, ৩৯ ও ৪১ অনুচ্ছেদ কেবল আইনি ভাষা নয়; এগুলো স্বাধীনতার চেতনার বাস্তব রূপ। রাষ্ট্র যদি কোনো নাগরিককে তার বিশ্বাস, সংস্কৃতি বা জীবনাচরণের কারণে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি জনগোষ্ঠী নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংবিধানের প্রতি জনগণের আস্থাও।
বাউলদের ওপর নির্যাতনের ইতিহাস আজকের নয়। গত দুই দশকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিকবার বাউল আখড়ায় হামলা, অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া, গান নিষিদ্ধের চেষ্টা এবং সাধকদের সামাজিকভাবে হেয় করার ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ উঠেছে যে, এসব ঘটনার বিচার হয়নি কিংবা অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দায়মুক্তির এই সংস্কৃতি উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে আরও সাহসী করেছে।
বাউলদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের মূল কারণ তাদের দর্শন। তারা মানুষকে ধর্মীয় পরিচয়ের আগে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখায়। তাদের ভাষায়, মানুষের ভেতরেই স্রষ্টার সন্ধান। এই মানবতাবাদী দর্শন ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ধর্মের অপব্যাখ্যাকারী ও অসহিষ্ণু গোষ্ঠীর বিরাগভাজন হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস এটাও বলে—চিন্তার বিরুদ্ধে কখনো বলপ্রয়োগ স্থায়ী বিজয় অর্জন করতে পারেনি।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে লালন শাহ কেবল একজন সাধক নন; তিনি সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে এক নীরব বিপ্লবের নাম। তাঁর জন্মভূমি কুষ্টিয়া আজও সেই মানবতার বাণী বহন করে চলেছে। লালনের আখড়ায় ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত পরিচয় নয়, মানুষের পরিচয়ই মুখ্য। তাই কুষ্টিয়া থেকে যখন হাইকোর্টের এই উদ্যোগকে অভিনন্দন জানানো হয়, তখন সেটি কোনো আবেগের বহিঃপ্রকাশমাত্র নয়; বরং বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকে রক্ষার এক নৈতিক ঘোষণা।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। বাউলদের ওপর হামলার অভিযোগ মানে কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানেই বিশ্বাস করেন। যারা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, বিদ্বেষ ছড়ায় বা সহিংসতায় জড়ায়, তারা নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী। অপরাধকে ধর্মের সঙ্গে মিশিয়ে দেখলে বিভাজন আরও বাড়বে। তাই বিচার হতে হবে ব্যক্তি ও অপরাধের ভিত্তিতে, কোনো সম্প্রদায়কে দোষারোপ করে নয়।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই সংকটকে জটিল করে তুলেছে। ভুয়া তথ্য, বিকৃত বক্তব্য এবং ঘৃণাপূর্ণ প্রচারণা খুব দ্রুত মানুষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অসত্য তথ্য ছড়িয়ে কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু বানানো এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, তথ্য যাচাই এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও সমানভাবে জরুরি।
রাষ্ট্রের সামনে এখন একটি বড় পরীক্ষা। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তদন্ত যদি নিরপেক্ষ, পেশাদার ও প্রভাবমুক্তভাবে সম্পন্ন হয়, প্রকৃত অপরাধীরা যদি আইনের আওতায় আসে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তবে এটি শুধু বাউল সম্প্রদায়ের জন্য নয়; বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। অন্যদিকে তদন্ত যদি আনুষ্ঠানিকতা হয়ে যায়, তবে মানুষের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা আরও দুর্বল হবে।
একই সঙ্গে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক নীতিতেও নতুন করে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে, বাউলগান কেবল মেলার বিনোদন নয়; এটি সহিষ্ণুতা, মানবতা, আত্মশুদ্ধি ও সামাজিক সম্প্রীতির দর্শন। যারা নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে জানে, তারা উগ্রতা ও বিদ্বেষের কাছে সহজে আত্মসমর্পণ করে না।
বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল বৈষম্য, নিপীড়ন ও অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শকে ধারণ করে। সেই রাষ্ট্রে কোনো নাগরিক যদি নিজের বিশ্বাস, পোশাক, গান কিংবা দর্শনের কারণে ভীত হয়ে জীবনযাপন করেন, তবে তা স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি তার ভিন্নমত ও বৈচিত্র্যকে রক্ষা করার মধ্যেই নিহিত।
আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আইনকে আইনের মতো চলতে দেওয়া। বিচার হতে হবে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে, প্রতিশোধ বা আবেগের ভিত্তিতে নয়। অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয় হবে অপরাধী; কোনো ধর্ম, মতবাদ বা সম্প্রদায় নয়। এই নীতিই আইনের শাসনের মূল ভিত্তি।
হাইকোর্টের এই নির্দেশনা তাই কেবল একটি বিচারিক আদেশ নয়; এটি রাষ্ট্রকে তার সংবিধানের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার এক দৃঢ় আহ্বান। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের মর্যাদা, চিন্তার স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক বহুত্ব রক্ষা করা কোনো দয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
বাংলার মাটি আজও একতার গান গায়। মসজিদের আজান, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, গির্জার প্রার্থনা, বৌদ্ধবিহারের শান্ত ধ্বনি এবং বাউলের একতারার সুর—সব মিলিয়েই বাংলাদেশের আত্মপরিচয়। এই সুর যেন কোনো বিদ্বেষ, উগ্রতা কিংবা সহিংসতার শব্দে চাপা না পড়ে। আদালত তার দায়িত্ব পালন করেছে; এখন রাষ্ট্র, সমাজ এবং নাগরিক—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব এই বার্তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।
কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় তার সংখ্যাগরিষ্ঠের শক্তিতে নয়, বরং সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী এবং সাংস্কৃতিকভাবে আলাদা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। সেই পরীক্ষায় বাংলাদেশ যেন সফল হয়—এই প্রত্যাশাই আজ সবচেয়ে বড়।
———————————————————————————————
ড. আমানুর আমান, সমআদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net