August 20, 2026, 2:52 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
দেবাশীষের অচেনা মৃত্যু এবং আমার অস্থির অন্তর ছয় মাসে ১ লাখ মামলা, মব কমলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশ্ন কলকাতার হোটেলে আগুনে নিভে গেল কুষ্টিয়ার সাবংবাদিক দেবাশিস দত্ত, তার স্ত্রী, সন্তান ও শশুর, শোকে কুষ্টিয়া বাজারে দাম নেই, সংরক্ষণে বিদ্যুৎ নেই: এয়ার ফ্লো বন্ধে পচছে কৃষকের পেঁয়াজ তিলের খাজায় কুষ্টিয়ার এক টুকরো ইতিহাস সেপ্টেম্বরে জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের ৩০০ মেগাওয়াট, পূর্ণ উৎপাদনের পথে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে গুঁড়িয়ে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয় সংবাদ বিশ্লেষণ/ লোডশেডিংয়ে চালকল: উৎপাদন কমছে, বাড়ছে সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি কুষ্টিয়ায় জামায়াত ও গণঅধিকার কর্মীদের সংঘর্ষ, এমপির বাড়িতে বাড়তি পুলিশ কুষ্টিয়ায় ১৫ আগস্টে খিচুড়ি রান্নার অভিযোগ, ইউপি চেয়ারম্যানসহ দুই ভাই গ্রেপ্তার

দেবাশীষের অচেনা মৃত্যু এবং আমার অস্থির অন্তর

ড. আমানুর আমান

কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের এই অচেনা মৃত্যু আমাকে অস্থির করে তুলেছে। কিছু মৃত্যু সংবাদ হিসেবে আসে, কিছু মৃত্যু মানুষকে থমকে দেয়, আর কিছু মৃত্যু নিজের জীবনের ভেতর এসে এমনভাবে আঘাত করে যে, সংবাদ আর ব্যক্তিগত বেদনার মধ্যে কোনো সীমারেখা থাকে না। দেবাশীষ দত্তের মৃত্যু আমার কাছে ঠিক তেমনই একটি ঘটনা।
এই মুহূর্তে আমি নিজেও গভীর এক মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে আমার স্ত্রী ও কন্যা এক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন। নিজের পরিবারকে ঘিরে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, হাসপাতালের করিডোর, চিকিৎসার অপেক্ষা—সব মিলিয়ে মন এমনিতেই ভারী হয়ে আছে। সেই অবস্থার মধ্যেই যখন শুনলাম কলকাতার একটি হোটেলের অগ্নিকাণ্ডে দেবাশীষ, তার স্ত্রী আফশানা শিম্মিন, মাত্র তিন বছরের শিশু পুত্র শর্ণশীষ এবং শ্বশুর মো. আকরাম আলী আর নেই—তখন মনে হলো, মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা আসলে কতটা নির্মম হতে পারে।
একদিকে নিজের আপনজনের জন্য আতঙ্ক, অন্যদিকে খুব কাছের একজন মানুষের পুরো পরিবারসহ চলে যাওয়ার সংবাদ। এই দুই বেদনা যেন আমার ভেতরে এসে এক জায়গায় মিশে গেছে।
দেবাশীষের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কোনো আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা নেই। প্রতিদিন দেখা হতো না, প্রতিদিন কথা হতো না। কিন্তু অদ্ভুত এক আত্মিক যোগাযোগ ছিল। দেখা না হলেও মনে হতো দেখা হয়েছে। কথা না হলেও মনে হতো কথা হয়েছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কখনো কখনো দৈনন্দিন যোগাযোগের হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। কিছু মানুষ আমাদের জীবনের দৃশ্যমান পরিসরে যতটা থাকেন, অদৃশ্য পরিসরে থাকেন তার চেয়ে অনেক বেশি। দেবাশীষ আমার কাছে তেমনই একজন মানুষ।
তাই তার মৃত্যুর সংবাদ শুনে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। বারবার মনে হচ্ছিল—এটা কি সত্যি? দেবাশীষ নেই? তার স্ত্রী নেই? তার ছোট্ট ছেলেটিও নেই? একই আগুনে একটি পরিবারের চারটি প্রাণ নিভে গেছে?
খবরটি যতবার পড়ছি, ততবারই মনে হচ্ছে এটি কেবল একটি অগ্নিকাণ্ডের সংবাদ নয়। এটি একটি পরিবারের স্বপ্নের আকস্মিক সমাপ্তি। একটি শিশুর শৈশবের সমাপ্তি। একটি বাড়ির হাসির সমাপ্তি। একজন সহকর্মীর অনুপস্থিতি। একজন বন্ধুর সঙ্গে আর কোনোদিন কথা বলতে না পারার বাস্তবতা।
দেবাশীষ দত্ত ছিলেন সাংবাদিক। কুষ্টিয়ার সাংবাদিকতা অঙ্গনে তিনি ছিলেন পরিচিত ও সক্রিয় মুখ। আজকের পত্রিকা ও চ্যানেল নাইন-এর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। এর আগে এশিয়ান টেলিভিশন, নাগরিক টিভিসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। সাংবাদিকতার পেশায় তিনি শুধু সংবাদ সংগ্রহ করেননি; মানুষের কথা বলেছেন, সমাজের নানা ঘটনা তুলে ধরেছেন, নিজের পেশাগত দায়িত্বের মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়ার সংবাদজগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কিন্তু আজ তার নিজের জীবনের শেষ সংবাদটি অন্যরা লিখছে।
এটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে নির্মম পরিহাস।
জানা গেছে, গত ১৩ আগস্ট স্ত্রী আফশানা শিম্মিন, তিন বছরের ছেলে শর্ণশীষ এবং শ্বশুর মো. আকরাম আলীকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য ভারতের বেঙ্গালুরু যান দেবাশীষ। চিকিৎসা শেষে মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট তারা কলকাতায় ফেরেন। দেশে ফেরার আগে কলকাতায় এক রাতের জন্য একটি আবাসিক হোটেলে ওঠেন। পরদিন, ১৯ আগস্ট, তাদের বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিল।
একটি রাত।
শুধু একটি রাত।
কত সাধারণ ছিল সেই পরিকল্পনা! চিকিৎসা শেষ, দেশে ফেরার প্রস্তুতি, হয়তো বাড়িতে ফেরার আনন্দ, পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষা—সবকিছুই ছিল সামনে। কিন্তু সেই একটি রাতই তাদের জীবনের শেষ রাত হয়ে গেল।
হোটেলে আগুন লাগার পর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই আগুনের ভেতরেই আটকা পড়ে গেল চারটি জীবন।
আমাদের জীবনের কত পরিকল্পনা যে একটি মুহূর্তের কাছে কত অসহায়—দেবাশীষের মৃত্যু তার এক নির্মম উদাহরণ।
সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আমাকে ভেতর থেকে নাড়া দিচ্ছে, তা হলো দেবাশীষের আট বছর বয়সী মেয়ে পাখি। সে কুষ্টিয়ার বাড়িতে ছিল। তাই আগুনের সেই রাতে বাবা, মা, ছোট ভাই ও নানার সঙ্গে সে ছিল না। হয়তো সে জানত, তার বাবা-মা চিকিৎসার কাজে বাইরে গেছে। হয়তো জানত, তারা ফিরে আসবে। হয়তো বাড়ির কোনো এক কোণে বসে সে অপেক্ষা করছিল তাদের ফেরার।
কিন্তু তারা আর ফিরবে না।
একটি শিশুর কাছে ‘মৃত্যু’ শব্দটির অর্থ হয়তো এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কিন্তু খুব শিগগিরই তাকে বুঝতে হবে—বাবা আর দরজা খুলে ঘরে ঢুকবেন না, মা আর তাকে জড়িয়ে ধরবেন না, ছোট ভাই আর তার সঙ্গে খেলবে না, নানা আর তাকে আদর করবেন না।
একটি শিশুর পৃথিবী কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কীভাবে শূন্য হয়ে যেতে পারে, পাখির জীবনের দিকে তাকালে তার নির্মম ছবি পাওয়া যায়।
কলকাতার ওই অগ্নিকাণ্ডে আটজন বাংলাদেশি নাগরিকসহ নয়জনের মৃত্যুর খবর এসেছে। নিহত বাংলাদেশিরা বেঙ্গালুরুর নারায়ণা হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার পথে কলকাতায় অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে দেবাশীষের পরিবার ছিল চারজনের একটি পূর্ণ পরিবার। চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে দেশে ফেরার পথে তারা আর দেশে ফিরতে পারলেন না।
কী অদ্ভুত এই নিয়তি!
মানুষ জীবন বাঁচাতে যায় চিকিৎসার জন্য, আর ফেরার পথে মৃত্যু তাকে নিয়ে যায়।
দেবাশীষের মৃত্যুর সংবাদ কুষ্টিয়ার সাংবাদিক সমাজকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। সহকর্মীরা তাকে স্মরণ করছেন একজন দায়িত্বশীল ও সক্রিয় সাংবাদিক হিসেবে। কিন্তু আমার কাছে দেবাশীষ শুধু একজন সাংবাদিক নন। তিনি এমন একজন মানুষ, যার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলেও এক ধরনের নীরব যোগাযোগ ছিল। কিছু সম্পর্কের কোনো প্রতিদিনের উপস্থিতি লাগে না। তারা মনে থাকে। হঠাৎ কোনো কথা মনে পড়ে, কোনো ঘটনা মনে পড়ে, কোনো পরিচিত জায়গা মনে পড়ে—আর মনে হয়, মানুষটি যেন আশেপাশেই আছে।
আজ সেই অনুভূতিটাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে।
মনে হচ্ছে, দেবাশীষ হয়তো কোথাও নেই—তবু তার সঙ্গে আমার কথা হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা বলছে, আর কোনোদিন কথা হবে না।
এই মৃত্যু আমাকে নিজের জীবন নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। মাত্র একদিন আগে আমার স্ত্রী ও কন্যা দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন। তাদের জন্য আমার ভেতরের যে ভয়, উদ্বেগ আর অসহায়তা—দেবাশীষের মৃত্যুর খবর সেই অনুভূতিকে আরও তীব্র করে দিয়েছে। হাসপাতালের বিছানায় প্রিয়জনকে দেখে মানুষ বুঝতে পারে, জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ আসলে কী। তখন অর্থ, পরিচয়, পেশা, ব্যস্ততা—সবকিছুই ছোট হয়ে আসে। শুধু মনে হয়, মানুষগুলো বেঁচে থাকুক।
আমরা প্রতিদিন কত কাজ করি, কত পরিকল্পনা করি, কত ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি। অথচ একটি দুর্ঘটনা, একটি আগুন, একটি মুহূর্ত—সব হিসাব বদলে দিতে পারে।
দেবাশীষের মৃত্যু তাই শুধু শোকের নয়, আত্মজিজ্ঞাসারও।
আমরা যারা বেঁচে আছি, তাদের জন্য এটি একটি নির্মম স্মরণবাণী—প্রিয় মানুষকে ভালোবাসতে দেরি করা উচিত নয়। কথা বলার থাকলে কথা বলা উচিত। দেখা করার থাকলে দেখা করা উচিত। অভিমান থাকলে তা ভাঙা উচিত। কারণ আগামীকাল বলে কোনো নিশ্চয়তা নেই।
দেবাশীষের সঙ্গে আমার প্রতিদিন দেখা হতো না। প্রতিদিন কথা হতো না। কিন্তু মনে হতো দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। আজ বুঝতে পারছি, মানুষের সঙ্গে আমাদের যে অদৃশ্য সম্পর্কগুলো তৈরি হয়, সেগুলোই কখনো কখনো সবচেয়ে গভীর হয়।
কলকাতার সেই হোটেলের আগুন শুধু চারটি প্রাণ নেয়নি; কুষ্টিয়ার একটি পরিবারকে ছিন্নভিন্ন করেছে, একটি শিশুকে অনাথ করেছে, অসংখ্য মানুষকে শোকাহত করেছে। আর আমার মতো যারা দেবাশীষকে কোনো না কোনোভাবে হৃদয়ের কাছাকাছি রেখেছিল, তাদের ভেতরে তৈরি করেছে এক অদ্ভুত শূন্যতা।
দেবাশীষ, তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না—এই কথাটি মেনে নেওয়া কঠিন।
তোমার সঙ্গে আর কথা হবে না—এটিও মেনে নেওয়া কঠিন।
তোমার স্ত্রী, তোমার ছোট্ট সন্তান, তোমার শ্বশুর—একসঙ্গে চারজন মানুষ আর নেই—এই বাস্তবতা আরও কঠিন।
তবু স্মৃতি মানুষকে পুরোপুরি হারিয়ে যেতে দেয় না। দেখা না হলেও যে মানুষকে দেখা হয়েছে বলে মনে হয়, কথা না হলেও যার সঙ্গে কথা হয়েছে বলে মনে হয়, সে মানুষ হয়তো শারীরিকভাবে চলে যায়; কিন্তু আমাদের ভেতরের কোনো এক অদৃশ্য ঘরে থেকে যায়।
দেবাশীষও থাকুক তেমনই।
তার পরিবার থাকুক আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের প্রার্থনায়।
আর ছোট্ট পাখির জন্য থাকুক আমাদের সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা ও সহমর্মিতা। তার জীবনের এই অসম্ভব শূন্যতা কোনো শব্দ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। আমরা শুধু কামনা করতে পারি, সময় তাকে বেঁচে থাকার শক্তি দিক, মানুষ তাকে আগলে রাখুক, আর তার বাবা-মায়ের ভালোবাসার স্মৃতি তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হয়ে থাকুক।
আজ নিজের পরিবারের জন্য প্রার্থনা করতে গিয়ে দেবাশীষের পরিবারের জন্যও প্রার্থনা করছি।
জীবন কত ভঙ্গুর—দেবাশীষের চলে যাওয়া আবারও তা মনে করিয়ে দিল।
এক রাতের যাত্রাবিরতি তাদের জীবনের শেষ ঠিকানা হয়ে গেল। আর আমাদের কাছে রেখে গেল এক গভীর প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই জানি, আমাদের পরের সকালটি কেমন হবে?
দেবাশীষের সকাল আর আসেনি।
কিন্তু তার স্মৃতি থাকবে।
কুষ্টিয়ার সংবাদজগতে থাকবে তার কাজের পরিচয়। সহকর্মীদের স্মৃতিতে থাকবে তার উপস্থিতি। আর কিছু মানুষের হৃদয়ে—আমার মতো—সে থেকে যাবে এক অদৃশ্য, অথচ নিবিড় সম্পর্কের মানুষ হয়ে।
দেখা হয়নি—তবু দেখা হয়েছিল।
কথা হয়নি—তবু কথা হয়েছিল।
আজ মানুষটি নেই—তবু মনে হচ্ছে, কোথাও যেন এখনো তার সঙ্গে কথা বলে চলেছি।
শুধু এবার ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসছে না।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

MonTueWedThuFriSatSun
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net