July 4, 2026, 12:58 am

ড. আমানুর আমান
রাষ্ট্রের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো—বৈধ বলপ্রয়োগের একচ্ছত্র অধিকার কেবল রাষ্ট্রেরই থাকবে। অপরাধী ধরবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার করবে আদালত, শাস্তি দেবে আইনের বিধান। এটাই হলো লাস্কীয় রাষ্ট্র দর্শনের স্বাভাবিক প্রবনতা। কিন্তু যখন জনতা নিজেই বিচারক, জল্লাদ ও কার্যকরী বাহিনীতে পরিণত হয়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্রের কোথাও না কোথাও শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সেই শূন্যতার ফোকড়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, সেটি হলো এই মব সন্ত্রাস।
বাংলাদেশে গত দুই বছরে সবচেয়ে ভয়াবহভাবে প্রবণতা ছিল এটি। বিশেষ করে ইউনস সরকারের আমলে এটি ছিল একটি বিষফোঁড়া , যেটাকে ঐ সরকার নিজেই একটি রাজনৈতিক প্রবণতায় রুপ দেয়।
অনেকেরই প্রত্যাশা ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের অস্থির সময় পার হয়ে একটি রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে। কারণ রাজনৈতিক সরকার সাধারণত প্রশাসনের ওপর অধিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, জনগণের কাছে রাজনৈতিক জবাবদিহিও বহন করে। ফলে ধারণা করা হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেভাবে মবের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল, তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা সেই আশাকে সত্য প্রমাণ করেনি।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জুন ২০২৬-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এক মাসেই রাজনৈতিক সহিংসতা ও মবের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪০ জন। এর মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৯ জন, আর মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত ৩১ জন। অর্থাৎ রাজনৈতিক সংঘর্ষের তুলনায় অনেক বেশি প্রাণ গেছে জনতার হাতে। এই পরিসংখ্যান কেবল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতা সম্পর্কে একটি উদ্বেগজনক বার্তা।
মব সন্ত্রাসের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এটি সমাজে ন্যায়বিচারের ধারণাকেই বিকৃত করে দেয়। যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আদালতের প্রয়োজন নেই, পুলিশের প্রয়োজন নেই, অভিযোগ প্রমাণেরও প্রয়োজন নেই—তখন আইন নয়, আবেগই বিচারকের আসনে বসে। আর আবেগের বিচার কখনো ন্যায়বিচার হতে পারে না। চোর সন্দেহে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে, ছিনতাইকারী সন্দেহে কিংবা সামাজিক গুজবের ভিত্তিতে একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা সভ্য রাষ্ট্রের নয়, বরং অরাজক সমাজের লক্ষণ।
বাংলাদেশে মবের এই সংস্কৃতি একদিনে তৈরি হয়নি। রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা, দীর্ঘসূত্রতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজবের দ্রুত বিস্তার—সবকিছু মিলেই এই প্রবণতাকে শক্তিশালী করেছে। যখন মানুষ দেখে অপরাধের বিচার হতে দীর্ঘ সময় লাগে, তখন এক ধরনের প্রতিশোধমূলক মানসিকতা সমাজে জন্ম নেয়। কিন্তু সেই মানসিকতা শেষ পর্যন্ত আইনকেই অকার্যকর করে দেয়।
মব সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তার ঘটে ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অস্বাভাবিক কর্তৃত্বের আমলে। ওই সময় নানা ঘটনায় দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেই জনতার হাতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের লাঞ্ছিত, নির্যাতিত কিংবা হামলার শিকার হতে হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে বহু ক্ষেত্রে মবকে কার্যত অনিয়ন্ত্রিতভাবে সক্রিয় থাকতে দেখা যায়। স্পষ্ট অভিযোগ ছিল, ইউনুসের সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন এবং জনসমর্থন ধরে রাখার এক অনানুষ্ঠানিক কৌশল হিসেবে মবকে নীরব প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। যদিও সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল, তবু মবের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপের অভাব সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করে।
তখন অনেকের ধারণা ছিল, একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিলে রাষ্ট্র তার স্বাভাবিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে এবং জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার সংস্কৃতির অবসান ঘটাবে।
সরকার অবশ্য বিভিন্ন সময়ে মব দমনের ঘোষণা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও কঠোর অবস্থানের কথা বলেছে। কিন্তু ঘোষণা আর বাস্তবতার মধ্যে যে বড় ফাঁক রয়েছে, জুন মাসের পরিসংখ্যান সেটিই মনে করিয়ে দিচ্ছে। রাষ্ট্র যদি প্রতিটি মব হামলার দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনেক মানুষ জনতার বিচারের শিকার হবে। কারণ মবের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দায়মুক্তির বিশ্বাস। যখন অপরাধীরা মনে করে, জনতার ভিড়ে তারা অদৃশ্য হয়ে যাবে, তখন এই সহিংসতা আরও বিস্তৃত হয়।
উদ্বেগের বিষয় হলো, মব শুধু হত্যাকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ নেই। একই প্রতিবেদনে সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। অর্থাৎ সমাজে অসহিষ্ণুতা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। এটি কেবল অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা নয়; এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও নাগরিক নিরাপত্তার সংকট।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি অস্ত্র নয়, নাগরিকের আস্থা। মানুষ যদি বিশ্বাস করে আইন সবার জন্য সমানভাবে কাজ করবে, তাহলে কেউ নিজের হাতে বিচার তুলে নিতে চায় না। কিন্তু সেই আস্থা যখন দুর্বল হয়, তখন মবের জন্ম হয়। তাই শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দ্রুত বিচার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং সর্বোপরি আইনের শাসনের প্রতি দৃশ্যমান অঙ্গীকার।
এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও বড় দায়িত্ব রয়েছে। ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কেউ যদি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মবকে প্রশ্রয় দেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো, উসকানিমূলক বক্তব্য এবং ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কারণ আজকের একটি গুজব আগামীকালের একটি প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
লালন ফকির বলেছিলেন, “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।” অথচ আমরা এমন এক সমাজের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় হয়ে উঠছে। সন্দেহ মানেই শত্রু, অভিযোগ মানেই অপরাধী, আর জনতার রায় মানেই চূড়ান্ত বিচার—এই মানসিকতা সভ্যতার নয়।
একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে—এটি শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার পর রাষ্ট্রকে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক শাসন কাঠামোয় ফিরিয়ে আনার সুযোগও বটে। অতীতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে যে প্রশ্ন ও সংকট তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে হলে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের বৈধ কর্তৃত্বকে সুদৃঢ় করা। সেই দায়িত্বের অন্যতম শর্ত মব সন্ত্রাসের অবসান। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা দেখাচ্ছে, সমস্যাটি এখনও উদ্বেগজনক। তাই সরকারের ঘোষিত অঙ্গীকারকে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দিতে হবে, যাতে মব কোনোভাবেই সমাজের স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হতে না পারে।
আজ সবচেয়ে জরুরি একটি সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় বার্তা—বাংলাদেশে বিচার করবে আদালত, শাস্তি দেবে আইন, জনতা নয়। বর্তমান সরকারের সামনে সুযোগ রয়েছে আইনকে তার নিজস্ব মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার এবং প্রমাণ করার যে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে নয়। মব সন্ত্রাস দমনে দৃঢ় ও নিরপেক্ষ অবস্থান কেবল জননিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না; এটি আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং একটি সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাও পুনর্গঠন করবে।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর/ দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস