July 9, 2026, 1:19 pm

ড. আমানুর আমান
বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। অথচ এ ফলের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন কখনোই তার উৎপাদন সম্ভাবনার সমান হয়নি। মৌসুম এলেই দেশের গ্রামাঞ্চলে অগণিত কাঁঠাল গাছে ঝুলে থাকে৷ এ নিয়ে প্রতিবছরই ভালো রকমের একটি অর্থনীতির সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ফল হয় উল্টো। অচিরেই বাজারে দাম পড়ে যায়। ফলে ট্রেডিং হয় না। এর ফলে, অনেক ফল গাছেই নষ্ট হয় কিংবা পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কৃষকের বছরের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হয় না। এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর চীনে কাঁঠাল রপ্তানির ঘোষণা শুধু একটি নতুন বাণিজ্যিক উদ্যোগ নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।
জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী জানান, চীন সফরকালে বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তিনি মালয়েশিয়ার উদাহরণ দিয়ে বলেন, দেশটি শুধু চীনে দুরিয়ান রপ্তানি করেই বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে। বাংলাদেশের কাঁঠালও যদি পরিকল্পিতভাবে চীনের বাজারে প্রবেশ করতে পারে, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক নতুন খাত সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ। সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, ভারত ও বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে শীর্ষে। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১০ থেকে ১১ লাখ মেট্রিক টনের বেশি কাঁঠাল উৎপাদিত হয় এবং এটি দেশের মোট ফল উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। কাঁঠাল দেশের প্রায় সব জেলায় উৎপাদিত হলেও গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে এর উৎপাদন বেশি।
কিন্তু এত উৎপাদনের পরও বাংলাদেশের কাঁঠাল অর্থনীতির চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। কারণ উৎপাদনের সঙ্গে বাজারের সমন্বয় ঘটেনি। দেশে পর্যাপ্ত কোল্ড চেইন নেই, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা সীমিত, প্রক্রিয়াজাত শিল্পও খুব ছোট পরিসরে রয়েছে। ফলে মৌসুমে উৎপাদনের বড় একটি অংশ অপচয় হয়। বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের উৎপাদিত কাঁঠালের উল্লেখযোগ্য অংশ বাজারজাতের আগেই নষ্ট হয়ে যায়।
অন্যদিকে বিশ্ববাজারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ভারত, নেদারল্যান্ডস, চীন এবং ইকুয়েডর আন্তর্জাতিক কাঁঠাল বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম একাই বৈশ্বিক কাঁঠাল রপ্তানি বাজারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। থাইল্যান্ড বহু বছর ধরে তাজা ও প্রক্রিয়াজাত কাঁঠাল ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে। ভারতও মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাঁঠাল পাঠায়। অথচ বিশ্বের অন্যতম বড় উৎপাদক হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাজারে অংশগ্রহণ এখনও নগণ্য।
বিশ্ববাজারে কাঁঠালের চাহিদা বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যের জনপ্রিয়তা এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্পে কাঁঠালের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। অপরিপক্ব কাঁঠাল এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘ভেগান মিট’ বা মাংসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কাঁঠালের চিপস, জুস, ক্যানজাত কোয়া, ফ্রোজেন পাল্প, জ্যাম, ময়দা এবং বীজ থেকে তৈরি বিভিন্ন খাদ্যপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে।
চীন এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার নাম। বর্তমানে বিশ্বের মোট কাঁঠাল আমদানির প্রায় এক-চতুর্থাংশই করে দেশটি। বিশাল জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং বিদেশি ফলের চাহিদা বাংলাদেশের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। যদি বাংলাদেশ এই বাজারের সামান্য অংশও দখল করতে পারে, তাহলে কৃষি রপ্তানিতে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হতে পারে।
প্রশ্ন হলো, কতটা অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে? ধরা যাক, বাংলাদেশ প্রথম পর্যায়ে বছরে মাত্র ৫০ হাজার মেট্রিক টন উন্নতমানের কাঁঠাল ও কাঁঠালজাত পণ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হলো। আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় এর মূল্য কয়েক কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। পরবর্তীতে রপ্তানির পরিমাণ ১ লাখ থেকে ২ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পরিমাণ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ কাঁঠাল শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়; এটি ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্য হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
তবে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু চুক্তি করলেই হবে না। উৎপাদন থেকে রপ্তানি পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খলাকে আধুনিক করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের বাগান ব্যবস্থাপনা, গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (GAP), ফল সংগ্রহের পর গ্রেডিং, প্যাকেজিং, কোল্ড স্টোরেজ, রেফ্রিজারেটেড পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি মান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কাঁঠালের জন্য পৃথক রপ্তানি ব্র্যান্ডিং গড়ে তোলা জরুরি।
প্রক্রিয়াজাত শিল্পের উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তাজা ফল রপ্তানির ওপর নির্ভর না করে কাঁঠাল থেকে চিপস, ক্যানজাত পণ্য, ফ্রোজেন কোয়া, জুস, জ্যাম, পাউডার ও বীজভিত্তিক খাদ্য উৎপাদন করলে মূল্য সংযোজন কয়েক গুণ বাড়বে। এতে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। বর্তমানে মৌসুমে অনেক কৃষক উৎপাদন খরচের কাছাকাছি দামে কাঁঠাল বিক্রি করতে বাধ্য হন। রপ্তানি বাজার সম্প্রসারিত হলে দেশীয় বাজারেও দামের স্থিতিশীলতা আসবে। কৃষক কাঁঠাল চাষে আরও উৎসাহিত হবেন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আম, সবজি ও আলু রপ্তানিতে আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা পরিচিতি অর্জন করেছে। এখন সেই তালিকায় কাঁঠালকে যুক্ত করার সময় এসেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদক হয়েও যদি আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য অংশীদার হতে না পারি, তবে সেটি হবে সম্ভাবনার অপচয়।
চীনে কাঁঠাল রপ্তানির উদ্যোগ তাই নিছক একটি সংবাদ নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষিকে রপ্তানিমুখী করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক সরবরাহব্যবস্থা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর কূটনৈতিক বাণিজ্য উদ্যোগের মাধ্যমে কাঁঠাল বাংলাদেশের নতুন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাতে পরিণত হতে পারে। জাতীয় ফলকে যদি আমরা জাতীয় সম্পদে রূপান্তর করতে পারি, তবে কাঁঠালশুধু গাছেই ঝুলবে না—এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।
ড.আমানুর আমান, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক কুষ্টিয়া, দি কুষ্টিয়া টাইমস