August 17, 2026, 1:41 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
দীর্ঘ অপেক্ষার পর দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন এক অধ্যায়ের দ্বার খুলতে যাচ্ছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী সেপ্টেম্বরে পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। এ লক্ষ্যে কেন্দ্রটিতে এখন চলছে শেষ পর্যায়ের কারিগরি পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই ও গ্রিডে সংযোগের প্রস্তুতি।
এর মধ্য দিয়ে শুধু একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন শুরু হবে না; দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঠামোতেও আসবে বড় পরিবর্তন। গ্যাস, কয়লা, তেল ও আমদানিনির্ভর বিদ্যুতের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রবেশ করবে।
এপ্রিলের শেষ দিকে রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরু হয়। ২৮ এপ্রিল শুরু হওয়া এ প্রক্রিয়ায় মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি চুল্লিতে স্থাপন করা হয়। মে মাসে প্রথম ইউনিটের জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর শুরু হয় কমিশনিং ও একের পর এক নিরাপত্তা ও কারিগরি পরীক্ষা।
প্রথম দিকে আগস্টের মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট যুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। জুনে জাতীয় সংসদেও আগস্টের শেষ নাগাদ গ্রিডে সংযোগ দেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানানো হয়। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির সময়সূচির কারণে এখন সেপ্টেম্বরকে সম্ভাব্য সময় হিসেবে ধরা হচ্ছে।
৩০০ মেগাওয়াট দিয়ে শুরু
রূপপুরের প্রথম ইউনিটের পূর্ণ উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। তবে চুল্লি চালু হওয়ার পর একবারে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় নেওয়া হবে না। ধাপে ধাপে ক্ষমতা বাড়িয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন করা হবে। শুরুতে উৎপাদন হবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট, এরপর ধীরে ধীরে তা বাড়ানো হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছিল, প্রথমে চুল্লির ক্ষমতা প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশে নেওয়া হবে এবং পরে তা ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা করা হবে। সব পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হলে ধাপে ধাপে পূর্ণ উৎপাদনের দিকে যাবে ইউনিটটি।
অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে ৩০০ মেগাওয়াট পাওয়া গেলেই রূপপুরের পুরো সক্ষমতার বিদ্যুৎ পাওয়া শুরু হচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। বরং এটি হবে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ ইউনিটের গ্রিডে পরীক্ষামূলক প্রবেশের সূচনা।
দুই ইউনিটে ২,৪০০ মেগাওয়াট
রূপপুর প্রকল্পে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুই ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে। প্রকল্পটি রাশিয়ার প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তায় নির্মিত হচ্ছে এবং এতে ব্যবহৃত হচ্ছে VVER-1200 প্রযুক্তির দুটি রিঅ্যাক্টর।
প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পদ্মা নদীর তীরে পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত এই প্রকল্পকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় ও উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুটি ইউনিট চালু হলে দেশের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহে রূপপুরের অবদান হবে উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গ্যাস সংকটের সময়ে বড় স্বস্তি
বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। কিন্তু গ্যাস সরবরাহে সংকট দেখা দিলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে জাতীয় গ্রিডে এবং তৈরি হয় লোডশেডিং।
এই বাস্তবতায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্ব অন্যরকম। গ্যাস বা তেলভিত্তিক কেন্দ্রের মতো প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহের ওপর এর উৎপাদন নির্ভর করে না। একবার জ্বালানি লোড করার পর একটি ইউনিট দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।
রূপপুরের ক্ষেত্রে একবার জ্বালানি লোড করার পর প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে রিফুয়েলিং ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইউনিট নির্দিষ্ট সময় বন্ধ রাখতে হবে।
ফলে পূর্ণ সক্ষমতায় রূপপুর চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে একটি নিরবচ্ছিন্ন বেসলোড উৎস যুক্ত হবে। এটি বিশেষ করে শিল্পকারখানা, অর্থনৈতিক অঞ্চল, বড় নগরকেন্দ্র ও ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে বড় পরীক্ষা জাতীয় গ্রিড
তবে রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেই বিদ্যুৎ নিরাপদে জাতীয় গ্রিডে নেওয়া।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন স্থিতিশীল হলেও গ্রিডে হঠাৎ বড় পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়া বা কোনো কারণে কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় সঞ্চালনব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি হতে পারে। তাই রূপপুরের বিদ্যুৎ গ্রহণের জন্য সঞ্চালন অবকাঠামো শক্তিশালী করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সাবস্টেশন ও সঞ্চালন লাইন প্রস্তুত করা হচ্ছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনায় বাঘাবাড়ীর ২৩০ কেভি, বগুড়ার ৪০০ কেভি এবং গোপালগঞ্জের ৪০০ কেভি অবকাঠামোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পূর্ণ সক্ষমতার উৎপাদন শুরু হলে এসব সঞ্চালনব্যবস্থার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব পড়বে।
কারণ রূপপুর থেকে পাওয়া বিদ্যুৎ শুধু উৎপাদন করলেই হবে না; সেটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছে দিতে হবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শিল্পায়ন
রূপপুরের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা শুধু ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া নয়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনীতিতে।
বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তা কমলে শিল্পকারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা আরও স্থিতিশীল হতে পারে। গ্যাস বা তরল জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি অংশের নির্ভরতা কমবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি ঝুঁকি কিছুটা বৈচিত্র্যময় হবে।
বিশেষ করে বড় শিল্প, রপ্তানিমুখী কারখানা, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎনির্ভর উৎপাদন খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রূপপুরের বিদ্যুৎ সেই প্রয়োজন পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সামনে রয়েছে ব্যয়ের প্রশ্ন
রূপপুর নিয়ে আশাবাদের পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রকৃত ক্রয়মূল্য কত হবে, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। প্রকল্পের শুরুতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৩ থেকে ৪ টাকার মধ্যে হতে পারে বলে আলোচনা থাকলেও প্রকল্প ব্যয়, অর্থায়ন ব্যয়, ঋণের সুদ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত মূল্যের ওপর প্রভাব ফেলবে।
রাশিয়ার সঙ্গে প্রকল্পের আর্থিক লেনদেনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রূপপুরের জন্য রাশিয়া বাংলাদেশকে বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট ১ হাজার ১৩৮ কোটি ডলারের ঋণের মধ্যে ৪৯৭ কোটি ডলার ছাড় হয়েছে এবং বাকি রয়েছে ৬৪১ কোটি ডলার। ২০২৬ সাল পর্যন্ত শুধু সুদ এবং পরবর্তী সময়ে সুদ ও আসল কিস্তিতে পরিশোধের কাঠামো রয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে নিষেধাজ্ঞাজনিত সীমাবদ্ধতাও প্রকল্পের অর্থ পরিশোধে জটিলতা তৈরি করেছে। ফলে প্রকল্পটি বাংলাদেশের জন্য যেমন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি এর আর্থিক দায় ও বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে বড় বিষয় হলো নিরাপত্তা। তাই রূপপুরের প্রতিটি ধাপে পরীক্ষা, নিয়ন্ত্রণ ও অনুমোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
জ্বালানি লোডিংয়ের পর চুল্লির বিভিন্ন ব্যবস্থা, প্রাইমারি সার্কিট, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সাব-ক্রিটিক্যালিটি পরীক্ষা, নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা ব্যবস্থা যাচাই এবং ধাপে ধাপে কম ক্ষমতায় পরিচালনার মতো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে ইউনিটটিকে।
এ কারণে সেপ্টেম্বরের ৩০০ মেগাওয়াটকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সূচনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এটি বাংলাদেশের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার প্রথম বাস্তব অভিজ্ঞতা।
একটি নতুন যুগের সূচনা
রূপপুর প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা, সমালোচনা, ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মতো নানা কারণে প্রকল্পের সময়সূচিও একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের এ পর্যায়ে এসে প্রথম ইউনিট জ্বালানি লোডিং শেষ করে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
সেপ্টেম্বরে যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ৩০০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়, সেটি হবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের একটি বড় মাইলফলক। এরপর ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়িয়ে প্রথম ইউনিটের ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট এবং পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
অর্থাৎ রূপপুরের আসল সাফল্য শুধু প্রথম ৩০০ মেগাওয়াট গ্রিডে যুক্ত হওয়ার মধ্যে নয়। নিরাপদে, নিরবচ্ছিন্নভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মূল্যে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারাই হবে প্রকল্পটির চূড়ান্ত সাফল্যের মাপকাঠি। আর সেটি সম্ভব হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় রূপপুর সত্যিই একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।