August 18, 2026, 12:31 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
তিলের খাজায় কুষ্টিয়ার এক টুকরো ইতিহাস সেপ্টেম্বরে জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের ৩০০ মেগাওয়াট, পূর্ণ উৎপাদনের পথে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে গুঁড়িয়ে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয় সংবাদ বিশ্লেষণ/ লোডশেডিংয়ে চালকল: উৎপাদন কমছে, বাড়ছে সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি কুষ্টিয়ায় জামায়াত ও গণঅধিকার কর্মীদের সংঘর্ষ, এমপির বাড়িতে বাড়তি পুলিশ কুষ্টিয়ায় ১৫ আগস্টে খিচুড়ি রান্নার অভিযোগ, ইউপি চেয়ারম্যানসহ দুই ভাই গ্রেপ্তার দুই কোটি টাকার নকল সিগারেট জব্দ, বিএটির এজাহারে ৩ লাখ, জব্দ তালিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন ভুয়া কাবিন-তালাকনামার অভিযোগে কুষ্টিয়ায় মামলা, তদন্তে পুলিশ দর্শনা সীমান্ত দিয়ে আসছে ভারতের ১৯ নতুন প্রজন্মের রেল কোচ শতাব্দীর প্রথম পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ, খুলে গেল সূর্যের রহস্যের জানালা, বাংলাদেশ কেন বঞ্চিত হলো

তিলের খাজায় কুষ্টিয়ার এক টুকরো ইতিহাস

তাকিয়া আফরোজ সাদিয়া

ভোরের কুষ্টিয়া তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি।
শহরের ব্যস্ত সড়কগুলোয় মানুষের ঢল নামেনি। দোকানের বেশির ভাগ ঝাঁপ বন্ধ। রেলগেটের আশপাশে কেবল দু-একটি চায়ের দোকানে ধোঁয়া উঠছে। রাতের পত্রিকার বান্ডিল এসে পৌঁছেছে। দূরে কোথাও রিকশার ঘণ্টা বাজছে। শহরটি যেন ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি এক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু কুষ্টিয়ার একটি ছোট্ট কারখানায় তখন সকাল অনেক আগেই নেমে এসেছে। দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই নাকে আসে পোড়া চিনির মিষ্টি গন্ধ। তার সঙ্গে মিশে আছে ভাজা তিলের নিজস্ব ঘ্রাণ। আগুনের ওপর বসানো বিশাল কড়াইয়ে ফুটছে চিনির সিরা। কড়াইয়ের চারপাশে কয়েকজন কারিগর। আগুনের উত্তাপে তাদের মুখ ঘামে চকচক করছে।
একটু পরেই শুরু হয় আসল খেলা।
একজন কারিগর লম্বা কাঠের দণ্ডে গরম চিনির মণ্ড তুলে নেন। আরেকজন সেটি ধরে টানেন। তারপর ভাঁজ। আবার টান। আবার ভাঁজ।
মুহূর্তের মধ্যে গরম, আঠালো মণ্ড বদলে যেতে থাকে। হাতের টানে তার ভেতরে ঢুকে যায় বাতাস। মণ্ড হয়ে ওঠে হালকা, সাদা, ফাঁপা। তারপর তার গায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয় তিল। কয়েক মিনিট আগেও যে জিনিসটি ছিল ফুটন্ত চিনির রস, সেটিই এখন কুষ্টিয়ার পরিচিত তিলের খাজা। এক টুকরো মুখে দিলেই কচমচ শব্দ।
প্রথমে মিষ্টি। তারপর তিলের গন্ধ। তারপর অদ্ভুত এক স্মৃতি—যেন এই স্বাদ কোথাও আগে খাওয়া হয়েছে। হয়তো কুষ্টিয়ার রেলস্টেশনে, হয়তো বাসস্ট্যান্ডে, হয়তো লালন আখড়ার মেলার ভিড়ে, কিংবা বহু বছর আগে বাবার হাত ধরে বাড়ি ফেরার পথে।
তাই তিলের খাজা শুধু একটি মিষ্টি নয়। এটি কুষ্টিয়ার একটি চলমান স্মৃতি। যে ইতিহাসের শুরু কোথায়, তার সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই
কুষ্টিয়ার তিলের খাজার বয়স কত/
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে প্রথমেই একটি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এর উৎপত্তির নির্ভুল সাল, প্রথম কারিগরের নাম কিংবা প্রথম কারখানার লিখিত নথি এখনো স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না। স্থানীয়দের মধ্যে কেউ বলেন শত বছরের বেশি, কেউ বলেন প্রায় দেড় শ বছর, আবার কোথাও এর ইতিহাস দুই শ বছর বা তারও বেশি পুরোনো বলে দাবি করা হয়। অর্থাৎ তিলের খাজার ইতিহাসের বড় অংশই লিখিত দলিলের চেয়ে জনশ্রুতি, পারিবারিক স্মৃতি ও কারিগরি ধারাবাহিকতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
কিছু ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, অবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশের সময়ে কুষ্টিয়ায় তিলের খাজার প্রচলন ঘটে। স্থানীয়ভাবে পাল ও তেলি সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে এর প্রাথমিক উৎপাদনের সম্পর্কের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। তবে ঠিক কোন পরিবার প্রথম এটি তৈরি করেছিল, তা নিশ্চিত করে বলার মতো তথ্য নেই।
আর এখানেই এই মিষ্টির ইতিহাসের আকর্ষণ।
কারণ অনেক ঐতিহ্যের জন্ম রাজপ্রাসাদে হয় না। কোনো বিখ্যাত রন্ধনশালায়ও নয়। জন্ম হয় সাধারণ মানুষের হাতে। এক প্রজন্ম আরেক প্রজন্মকে কাজটি দেখিয়ে যায়। রেসিপি লেখা হয় না, কিন্তু হাতের স্মৃতি থেকে যায়। তিলের খাজার ইতিহাসও যেন তেমনই। একজন কারিগর আরেকজনকে শেখান—কতক্ষণ সিরা জ্বালাতে হবে, কখন আগুন কমাতে হবে, কখন মণ্ড তুলতে হবে, কতটা ঠান্ডা হলে সেটি টানা যাবে, কতবার ভাঁজ করলে ভেতরে বাতাস ঢুকবে।
এই জ্ঞান বইয়ে লেখা থাকে না। থাকে হাতে।
লালনের গান—ইতিহাস, না জনশ্রুতি/
তিলের খাজার সঙ্গে কুষ্টিয়ার আরেক মহাত্মার নাম প্রায় অবিচ্ছেদ্যভাবে উচ্চারিত হয়—ফকির লালন শাহ।
লোকমুখে প্রচলিত:
‘হায় রে মজার তিলের খাজা,
খেয়ে দেখলি নে মন কেমন মজা…’
গানটির বিভিন্ন পঙ্‌ক্তি তিলের খাজার সঙ্গে বহু বছর ধরে প্রচলিত। স্থানীয় বাউল ও সাধুদের একটি অংশের বিশ্বাস, লালন সাঁই প্রায় দেড় শ বছর আগে তিলের খাজা নিয়ে গানটি রচনা করেছিলেন। লালনের আখড়ার আশপাশে তিলের খাজার কারখানা থাকায় এই বিশ্বাস আরও শক্ত হয়েছে।
কিন্তু ইতিহাসের জায়গায় এখানে একটু থামতে হয়। কারণ গানটি লালনেরই রচনা—এমন দাবির নিশ্চিত প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায় না। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, গানটি লালনের নামে প্রচলিত হলেও এর রচয়িতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবু জনশ্রুতিরও তো নিজস্ব ইতিহাস আছে।
কোনো গান যখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের মুখে বেঁচে থাকে, কোনো একটি খাবারের সঙ্গে যখন সেটি মিশে যায়, তখন সেটি শুধু প্রামাণ্যতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে একটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ। তিলের খাজার ক্ষেত্রে লালনের নামটি তাই শুধু একটি গানের সম্ভাব্য রচয়িতার নাম নয়; এটি কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।

আগুনের পাশে যে ইতিহাস তৈরি হয়/

তিলের খাজা তৈরি দেখতে সহজ। কিন্তু একজন কারিগরের কাছে এটি মোটেও সহজ কাজ নয়।
একটি কড়াইয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ চিনি, পানি, দুধ, তিল ও প্রয়োজনীয় মসলা ব্যবহার করা হয়। স্থানীয় কারিগরদের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি ব্যাচে প্রায় ৭ কেজি চিনি, আধা লিটার দুধ মেশানো পানি, প্রায় ৪ লিটার পানি এবং দেড় কেজি তিল ব্যবহার করে প্রায় ৮ কেজি খাজা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু আসল রহস্য উপকরণে নয়। রহস্য আগুনে। আর হাতের অনুভূতিতে।
সিরা একটু বেশি জ্বলে গেলে মণ্ড শক্ত হয়ে যেতে পারে। কম জ্বাল হলে কাঙ্ক্ষিত গঠন পাওয়া যায় না। মণ্ড বেশি ঠান্ডা হলে টানা যায় না। আবার বেশি গরম অবস্থায় ধরলে হাত পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
একজন অভিজ্ঞ কারিগর তাই কড়াইয়ের দিকে তাকিয়েই অনেক কিছু বুঝে ফেলেন।
তার জন্য থার্মোমিটারের প্রয়োজন হয় না। রঙ বদলানো, বুদবুদের আচরণ, মণ্ডের টান—সবকিছুই তার কাছে সংকেত।
একজন কারিগরের হাতের দিকে তাকালে এই পেশার ইতিহাসও যেন দেখা যায়। পোড়া দাগ। শক্ত হয়ে যাওয়া চামড়া। আঙুলের গাঁটে জমে থাকা বছরের পর বছর পরিশ্রম।
তিনি হয়তো বলবেন, ‘এই কাজ করতে গিয়ে কতবার যে হাত পুড়েছে, তার হিসাব নেই।’
কিন্তু সেই হাতই আবার গরম মণ্ডকে এমনভাবে টেনে নেয়, যা একজন নতুন মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এই দক্ষতা একদিনে তৈরি হয় না।
শৈশব থেকে দেখে দেখে, কাজ করতে করতে, ভুল করতে করতে, হাত পুড়িয়ে, আবার চেষ্টা করতে করতে তৈরি হয় একজন খাজা কারিগর।

রাতের কারখানা, সকালের বাজার/

তিলের খাজার আরেকটি অদৃশ্য জীবন আছে—রাতের জীবন। যখন শহরের অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে, তখন কারখানায় শুরু হয় খাজা তৈরির ব্যস্ততা। কড়াইয়ে আগুন জ্বলে। চিনি গলে। সিরা তৈরি হয়। মণ্ড টানা হয়। তিল ছড়ানো হয়। এক পর্যায়ে কারখানার মেঝেতে সারি সারি খাজা জমতে থাকে। তারপর ভোর।
যখন কুষ্টিয়া শহর ঘুম থেকে উঠছে, তখন রাতের শ্রম প্যাকেটবন্দি হয়ে রওনা দেয়। দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি বাজার, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, দোকান কিংবা হকারের ঝুড়িতে পৌঁছে যায় কুষ্টিয়ার তিলের খাজা।
একসময় যা ছিল স্থানীয় চাহিদার একটি খাবার, ধীরে ধীরে তা কুষ্টিয়ার নামের সঙ্গে যুক্ত একটি পণ্য হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে কুষ্টিয়ার কারখানাগুলো থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাজা উৎপাদনের কথা উঠে এসেছে।
বাসস্ট্যান্ডে কোনো হকার যখন হাঁক দেন—
‘খাজা নিবেন খাজা, কুষ্টিয়ার বিখ্যাত তিলের খাজা!’
তখন সেই ডাকের সঙ্গে শুধু একটি পণ্যের বিক্রি হয় না। বিক্রি হয় কুষ্টিয়ার নাম।
একটি মিষ্টির সঙ্গে একটি শহরের পরিচয়/
বাংলাদেশে খাবারের সঙ্গে অঞ্চলের সম্পর্ক খুব পুরোনো। বগুড়ার দই, কুমিল্লার রসমালাই, টাঙ্গাইলের চমচম, নাটোরের কাঁচাগোল্লা—প্রতিটি খাবারের সঙ্গে একটি ভূগোল জড়িয়ে আছে। কুষ্টিয়ার তিলের খাজার ক্ষেত্রেও তাই। তিলের খাজা অন্য জায়গায় তৈরি হতে পারে। অন্য শহরে বিক্রি হতে পারে। কিন্তু ‘কুষ্টিয়ার তিলের খাজা’ নামটির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ভূগোল, স্বাদ ও উৎপাদন ঐতিহ্যের দাবি আছে।
এই আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও পেয়েছে।
বাংলাদেশের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ‘কুষ্টিয়ার তিলের খাজা’ জিআই-৪৩ হিসেবে ১৭ এপ্রিল ২০২৩ নিবন্ধিত হয়েছে। নিবন্ধিত পণ্যের তালিকায় আবেদনকারী হিসেবে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের নাম রয়েছে। জিআই স্বীকৃতি তাই শুধু একটি সনদ নয়। এটি মূলত বলে—এই পণ্যের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু এখানেই প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে যায়। স্বীকৃতি পেলেই কি ঐতিহ্য বেঁচে যায়?

রেসিপি বাঁচানো যায়, হাত বাঁচানো যায় না/

তিলের খাজার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার উপকরণ নয়। চিনি বাজার থেকে কেনা যায়। তিল কেনা যায়।
দুধ পাওয়া যায়। কড়াই বানানো যায়। আগুন জ্বালানো যায়।
কিন্তু একজন দক্ষ কারিগরের হাত তৈরি করা যায় না। আজকের কারিগররা যে কৌশল জানেন, তার অনেকটাই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে এই পেশার আকর্ষণ কমছে। কারণ কাজটি কঠিন।
সারাদিন আগুনের পাশে থাকতে হয়। শরীরের ওপর প্রচণ্ড তাপ পড়ে। হাত পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। আর বাজারের প্রতিযোগিতায় লাভের পরিমাণও সবসময় শ্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একজন কারিগরের কথায় তাই উদ্বেগ—আগে ছেলেরা এই কাজ শিখতে আগ্রহী ছিল। এখন অনেকেই অন্য পেশায় যেতে চায়। এটি শুধু একটি পেশার সংকট নয়। এটি একটি ঐতিহ্যের সংকট।
কারণ আগামী প্রজন্ম যদি এই কাজ না শেখে, তাহলে একদিন হয়তো কুষ্টিয়ায় তিলের খাজা থাকবে, কিন্তু থাকবে না সেই পুরোনো হাত। তখন হয়তো যন্ত্রে তৈরি হবে একই রকম দেখতে একটি মিষ্টি।
কিন্তু সেই মণ্ড কখন টানতে হয়, কীভাবে টানতে হয়, কতবার ভাঁজ করতে হয়—সেই অদৃশ্য জ্ঞানটি হারিয়ে যেতে পারে।
বাবার হাত থেকে সন্তানের হাতে/
তিলের খাজার সবচেয়ে শক্তিশালী ইতিহাস হয়তো কোনো সরকারি নথিতে নেই। আছে মানুষের স্মৃতিতে। কুষ্টিয়ার কোনো এক বাবা হয়তো বহু বছর আগে ছেলের হাত ধরে রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে এক প্যাকেট খাজা কিনেছিলেন। সেই ছেলে বড় হয়েছে। বাবা হয়তো আর নেই। কিন্তু ছেলে যখন আজ নিজের সন্তানকে নিয়ে কুষ্টিয়ায় আসে, তখন সে আবার খাজা কিনে বাড়ি ফেরে।
একজন ক্রেতা হয়তো সেই কথাই বললেন—
ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে এসে খাজা কিনতেন। এখন নিজে কুষ্টিয়ায় এলে পরিবারের জন্য নিয়ে যান। এই জায়গাতেই একটি খাবার ইতিহাস হয়ে ওঠে। স্বাদ তখন আর শুধু জিহ্বায় থাকে না। থাকে স্মৃতিতে। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলে যায় একটি প্যাকেট খাজা। সঙ্গে চলে যায় একটি শহরের গল্প।

লালন, কুষ্টিয়া এবং তিলের খাজার সাংস্কৃতিক ভূগোল/

কুষ্টিয়াকে শুধু মানচিত্র দিয়ে বোঝা যায় না। এই ভূখণ্ডকে বুঝতে হয় নদী দিয়ে, মাটি দিয়ে, মানুষের জীবন দিয়ে, গান দিয়ে। লালন শাহের আখড়া, শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি, মীর মশাররফ হোসেনের কাহিনি, কুমারখালীর তাঁত, গড়াইয়ের জল—সব মিলিয়ে কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক পরিচয় তৈরি হয়েছে। তিলের খাজাও সেই পরিচয়ের একটি ছোট কিন্তু উজ্জ্বল অংশ। বিশেষ করে ছেঁউড়িয়া ও লালন আখড়ার আশপাশে এর উপস্থিতি তিলের খাজাকে আরও একটি সাংস্কৃতিক মাত্রা দিয়েছে। কুষ্টিয়ার লালনমেলাতেও তিলের খাজার উপস্থিতি দীর্ঘদিনের; বাংলাপিডিয়ার মেলা-সংক্রান্ত বিবরণেও লালনমেলায় তিলের খাজার বিক্রির উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ তিলের খাজা শুধু বাজারের পণ্য নয়। এটি মেলা, গান, সাধুসঙ্গ, ভ্রমণ এবং স্মৃতির সঙ্গেও যুক্ত। একজন মানুষ লালনের আখড়ায় এসে গান শুনে, মেলা দেখে, তারপর ফেরার পথে এক প্যাকেট তিলের খাজা কিনে নেয়। তার কাছে হয়তো তিনটি জিনিস আলাদা নয়। কুষ্টিয়া। লালন। তিলের খাজা।
সামনে যে প্রশ্ন/
জিআই স্বীকৃতি কুষ্টিয়ার তিলের খাজার সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। সরকারি স্বীকৃতি, উন্নত প্যাকেজিং, স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন, ব্র্যান্ডিং, অনলাইন বিপণন এবং পর্যটনের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা গেলে এটি দেশের বাইরে পর্যন্ত বাজার তৈরি করতে পারে। কিন্তু তার আগে দরকার একটি বিষয় নিশ্চিত করা— কুষ্টিয়ার তিলের খাজা যেন শুধু নামের মধ্যে কুষ্টিয়ার না থাকে। তার উৎপাদন ঐতিহ্যও যেন কুষ্টিয়ায় টিকে থাকে।
কারিগরদের প্রশিক্ষণ, স্বল্পসুদে ঋণ, আধুনিক ও নিরাপদ কারখানা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নতুন প্রজন্মকে এই পেশায় ধরে রাখার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ জিআই সনদ একটি ঐতিহ্যকে স্বীকৃতি দিতে পারে। কিন্তু ঐতিহ্য তৈরি করতে পারে না। ঐতিহ্য তৈরি করেন মানুষ। আর সেই মানুষগুলোই যদি একদিন আগুনের পাশে দাঁড়ানো বন্ধ করে দেন, তাহলে কাগজে জিআই থাকবে, প্যাকেটে ‘কুষ্টিয়ার তিলের খাজা’ লেখা থাকবে—কিন্তু হারিয়ে যেতে পারে সেই আসল স্বাদ, যে স্বাদ একদিন একটি শহরের পরিচয় হয়ে উঠেছিল।

শেষ টুকরো/

সকাল আরও ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। কুষ্টিয়ার রাস্তায় এখন মানুষ। দোকানের ঝাঁপ খুলেছে। রিকশা ছুটছে। বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীদের ভিড়। কিন্তু কারখানার ভেতরে তখনও কাজ চলছে। আগুন জ্বলছে। কড়াই ফুটছে। কারিগরের হাত চলছে। গরম মণ্ড টানা হচ্ছে। তার গায়ে তিল ছড়ানো হচ্ছে। একটির পর একটি খাজা তৈরি হচ্ছে। কয়েক ঘণ্টা পর এগুলো হয়তো চলে যাবে কুষ্টিয়ার বাইরে—রাজশাহী, খুলনা, ঢাকা, যশোর কিংবা আরও দূরের কোনো শহরে। কোনো এক দোকানে একজন মানুষ হয়তো প্যাকেটটি হাতে নেবেন। খুলবেন। এক টুকরো মুখে দেবেন। কচমচ শব্দ হবে। তারপর মিষ্টি স্বাদ ছড়িয়ে পড়বে মুখে। তিনি হয়তো জানবেন না এই ছোট্ট টুকরোটির ভেতরে কত রাতের শ্রম আছে। কতবার আগুনে পুড়েছে কারও হাত। কত প্রজন্মের স্মৃতি মিশে আছে এতে। জানবেন না, এর ইতিহাসের নির্দিষ্ট সালও হয়তো নেই। জানবেন না, লালনের নামে প্রচলিত গানটির সত্যতা নিয়েও ইতিহাসের প্রশ্ন আছে। তবু তিনি যখন বলবেন—কুষ্টিয়ার তিলের খাজা’— তখন আসলে তিনি শুধু একটি মিষ্টির নাম উচ্চারণ করবেন না। উচ্চারণ করবেন একটি শহরের নাম। একটি কারিগরির নাম। একটি লোকঐতিহ্যের নাম। একটি স্মৃতির নাম। আর হয়তো, খুব ছোট্ট করে হলেও, কুষ্টিয়ার ইতিহাসের একটি টুকরো নিজের সঙ্গে নিয়ে যাবেন।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

MonTueWedThuFriSatSun
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31 
© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net