August 22, 2026, 6:01 pm

ড. আমানুর আমান
সরকারি বিজ্ঞাপন কেবল কোনো পত্রিকার আয়-রোজগারের বিষয় নয়; এটি জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় সম্পদের একটি অংশ। ফলে সরকারি বিজ্ঞাপন কোথায়, কীভাবে, কোন পত্রিকায় এবং কী হারে দেওয়া হবে—এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা অপরিহার্য। বাংলাদেশে সংবাদপত্রের সরকারি বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপনায় এ দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দীর্ঘদিন ধরে পালন করে আসছে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর—ডিএফপি। পত্রিকার নিবন্ধন, মিডিয়া তালিকাভুক্তি, প্রচারসংখ্যা নিরীক্ষা এবং বিজ্ঞাপন হার নির্ধারণের মতো কাজ ডিএফপির আওতাভুক্ত।
ডিএফপির ওয়েবসাইটে সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যা ও বিজ্ঞাপন হার নিয়মিত প্রকাশ করা হয়। এমনকি ‘সংবাদপত্র ও সাময়িকীর মিডিয়া তালিকাভুক্তি এবং নিরীক্ষা নীতিমালা-২০২২’-এ মিডিয়া তালিকাভুক্তিকে সরকারি ও আধা-সরকারি সংস্থার বিজ্ঞাপন প্রচারের যোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। একই নীতিমালার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো নিরীক্ষা, প্রচারসংখ্যার ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন হার নির্ধারণ এবং সংবাদপত্রের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
অতএব প্রশ্নটি খুবই স্বাভাবিক—যে পত্রিকার প্রচারসংখ্যা ডিএফপি নিরীক্ষা করেনি, যার জন্য ডিএফপির নির্ধারিত বিজ্ঞাপন হার নেই, যে পত্রিকা সরকারি মিডিয়া তালিকায় নেই, সেই পত্রিকাকে সরকারি অর্থে বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে?
এখানেই বর্তমান ব্যবস্থার বড় একটি অসংগতি সামনে আসে।
একসময় সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে ডিএফপির ভূমিকা ছিল বেশি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে বিজ্ঞাপন প্রদানের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের ফলে জেলা ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়ার সুযোগ বেড়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনিক কাজ সহজ করা এবং স্থানীয় পর্যায়ের প্রয়োজন মেটানো। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির যথাযথ কাঠামো ছাড়া বিকেন্দ্রীকরণ কখনো কখনো শৃঙ্খলার পরিবর্তে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে।
বর্তমান বাস্তবতায় অভিযোগ উঠছে, ডিএফপির তালিকাভুক্ত নয়—এমন বিভিন্ন পত্রিকাতেও সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগটি সত্য হলে এটি শুধু তালিকাভুক্ত পত্রিকার প্রতি বৈষম্য নয়; সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ একটি তালিকাভুক্ত পত্রিকার প্রচারসংখ্যা, বিজ্ঞাপন হার ও নিরীক্ষার ভিত্তি যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত, তখন তালিকার বাইরে থাকা একটি পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিলের ভিত্তি কী?
এখানে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন আছে—বিজ্ঞাপনের মূল্য নির্ধারণ হবে কীভাবে?
ডিএফপির কাঠামোর অন্যতম কাজই হলো পত্রিকার প্রচারসংখ্যা এবং বিজ্ঞাপন হার নির্ধারণ করা। ডিএফপি নিজেই পত্রিকার সার্কুলেশন নিরীক্ষার ব্যবস্থা রাখে এবং প্রচারসংখ্যা ও বিজ্ঞাপন হারের তালিকা প্রকাশ করে। ফলে কোনো পত্রিকা যদি এই নিরীক্ষা ও তালিকাভুক্তির বাইরে থাকে, তার ক্ষেত্রে সরকারি বিজ্ঞাপনের বিল নির্ধারণে কী হার প্রয়োগ করা হচ্ছে—এটি জনস্বার্থে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
এ প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বর্তমান বিধানেও বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে সরকারি মিডিয়া তালিকাভুক্ত বহুল প্রচারিত জাতীয়, আঞ্চলিক বা স্থানীয় দৈনিক সংবাদপত্রের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। ২০২৫ সালের সরকারি ক্রয় বিধিমালায় ঢাকার বাইরে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সরকারি মিডিয়া তালিকাভুক্ত আঞ্চলিক বা স্থানীয় দৈনিক সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশের বিধানও রয়েছে।
তাই ‘যে কোনো নিবন্ধিত পত্রিকায় সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে’—এমন সরল ধারণা এবং ‘সরকারি মিডিয়া তালিকাভুক্ত পত্রিকা’—এই ধারণা এক নয়। নিবন্ধন, মিডিয়া তালিকাভুক্তি, প্রচারসংখ্যা নিরীক্ষা এবং সরকারি বিজ্ঞাপন পাওয়ার যোগ্যতা—প্রতিটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি।
এখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিয়ম মেনে চলা সংবাদপত্রগুলো।
একটি পত্রিকা ডিএফপির মিডিয়া তালিকায় থাকতে চাইলে তাকে নিয়মিত প্রকাশনা, নিরীক্ষা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, কর্মী ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখতে হয়। নিয়মিত সংবাদপত্র প্রকাশের অর্থ নিয়মিত মুদ্রণ ব্যয়, সাংবাদিক ও কর্মচারীদের পারিশ্রমিক, অফিস ব্যয়, নিউজপ্রিন্ট, পরিবহন, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য খরচ বহন করা। একই সঙ্গে কর ও ভ্যাটসহ রাষ্ট্রীয় আর্থিক বাধ্যবাধকতাও পালন করতে হয়। ফলে একটি নিয়মিত সংবাদপত্রের ওপর পরিচালন ব্যয়ের বড় চাপ থাকে।
অন্যদিকে, যদি এমন কোনো পত্রিকা সরকারি বিজ্ঞাপনের সুবিধা পায়, যার প্রকাশনা অনিয়মিত বা যার প্রকৃত প্রচারসংখ্যা যাচাই করা হয়নি, তাহলে নিয়মিত প্রকাশিত ও নিরীক্ষিত সংবাদপত্রের সঙ্গে সেটি একটি অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে। এতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়ম মেনে টিকে থাকা সংবাদপত্রগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
বিষয়টি শুধু সংবাদপত্র ব্যবসার প্রতিযোগিতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর-শৃঙ্খলা, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং গণমাধ্যমের সুস্থ বিকাশ।
গণমাধ্যম সংস্কার নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনাতেও ডিএফপির মিডিয়া তালিকা ও প্রচারসংখ্যা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ সরকারি বিজ্ঞাপনের সঙ্গে মিডিয়া তালিকাভুক্তি এবং ঘোষিত প্রচারসংখ্যার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে ডিএফপির তালিকাভুক্ত দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা এবং প্রচারসংখ্যা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি সরকারি বিজ্ঞাপনের সঙ্গে প্রচারসংখ্যার সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল মাঠপর্যায়ের কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেওয়ার সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নয়। বরং পুরো সরকারি বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও তথ্যনির্ভর করার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন—সমাধান কী?
প্রথমত, সরকারি বিজ্ঞাপনের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল মিডিয়া তালিকা থাকা উচিত। ডিএফপি কর্তৃক অনুমোদিত পত্রিকার নাম, নিবন্ধন অবস্থা, মিডিয়া তালিকাভুক্তির অবস্থা, সর্বশেষ নিরীক্ষিত প্রচারসংখ্যা, অনুমোদিত বিজ্ঞাপন হার, প্রকাশনার ধরন এবং তালিকার মেয়াদ—সব তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন দেওয়ার আগে অনলাইন ব্যবস্থায় পত্রিকাটির তালিকাভুক্তি যাচাই করবে। তালিকাভুক্ত না থাকলে বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমোদন ও লিখিত কারণ দেখানোর বিধান থাকতে পারে। ফলে ‘কাকে কেন বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো’—এ প্রশ্নের উত্তর পরবর্তী সময়ে সহজেই পাওয়া যাবে।
তৃতীয়ত, বিজ্ঞাপন প্রকাশের পর পত্রিকার কপি, বিজ্ঞাপনের মাপ, প্রকাশের তারিখ এবং বিলের পরিমাণ কেন্দ্রীয় ডাটাবেসে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এতে একই বিজ্ঞাপনের জন্য অতিরিক্ত বিল, অস্বাভাবিক হার কিংবা অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হবে।
চতুর্থত, তালিকাভুক্ত পত্রিকাগুলোর প্রচারসংখ্যা নিয়েও কঠোর ও স্বাধীন নিরীক্ষা প্রয়োজন। কারণ কেবল তালিকাভুক্ত করলেই হবে না; তালিকায় থাকা পত্রিকার ঘোষিত প্রচারসংখ্যাও বাস্তবসম্মত কি না, সেটিও নিয়মিত যাচাই করতে হবে। ডিএফপি নিজেও নিয়মিতভাবে মিডিয়া তালিকা হালনাগাদ ও প্রচারসংখ্যা-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে থাকে।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বিজ্ঞাপন বণ্টনের বিকেন্দ্রীকরণ থাকতে পারে, কিন্তু নীতিনির্ধারণ ও কেন্দ্রীয় তদারকি ডিএফপির হাতে শক্তিশালীভাবে থাকা দরকার।
স্থানীয় প্রশাসন বা সরকারি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেবে—এটি প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু সেই বিজ্ঞাপন কোন পত্রিকা পাবে, পত্রিকাটি সরকারি মিডিয়া তালিকাভুক্ত কি না, তার প্রচারসংখ্যা কত, অনুমোদিত বিজ্ঞাপন হার কত এবং বিল কত—এসবের একটি অভিন্ন কেন্দ্রীয় কাঠামো থাকা উচিত।
কারণ সরকারি বিজ্ঞাপন কোনো ব্যক্তির অনুগ্রহ নয়, কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থও নয়। এটি জনগণের করের টাকা।
সুতরাং যে পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হয়, নিরীক্ষার মুখোমুখি হয়, কর-ভ্যাটসহ রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান মেনে চলে এবং সরকারি মিডিয়া তালিকায় থাকার জন্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে, তাকে এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে প্রতিযোগিতা করতে বাধ্য করা উচিত নয় যেখানে তালিকাবহির্ভূত বা অনিয়মিত প্রকাশনার পত্রিকাও একই সরকারি অর্থের ভাগীদার হতে পারে।
সরকারি বিজ্ঞাপন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে তাই প্রয়োজন ডিএফপিকেন্দ্রিক কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ ডিজিটাল তালিকা, নিয়মিত প্রচারসংখ্যা নিরীক্ষা এবং প্রতিটি বিজ্ঞাপনের প্রকাশ্য হিসাব। এতে শুধু সরকারের অর্থ সাশ্রয় হবে না; নিয়ম মেনে চলা সংবাদপত্রগুলোও ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ পাবে।
গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু নতুন পত্রিকার সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; টেকসই ও পেশাদার সাংবাদিকতার জন্য একটি সমতাভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। আর সেই পরিবেশ তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টন।
তাই সময় এসেছে সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টন ব্যবস্থাকে আবারও একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কাঠামোর আওতায় এনে ডিএফপির তদারকি ও নিরীক্ষাকে কার্যকর করার। নিয়ম থাকবে সবার জন্য সমান, সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকার থাকবে হিসাব—এটাই হওয়া উচিত একটি আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যম নীতির ভিত্তি।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস।