August 23, 2026, 10:35 am

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
কুষ্টিয়ায় ফিরল দেবাশীষ ও স্ত্রী-সন্তানের নিথর দেহ, রাতেই স্ব স্ব ধর্মীয় রীতিতে শেষ বিদায় সরকারি বিজ্ঞাপনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ডিএফপির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ জরুরি রবীন্দ্র মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ, প্রতিবাদ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের নতুন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিব রহমান পার্থ বিয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বরের মৃত্যু সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব সরকারি কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেবাশীষের অচেনা মৃত্যু এবং আমার অস্থির অন্তর ছয় মাসে ১ লাখ মামলা, মব কমলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশ্ন কলকাতার হোটেলে আগুনে নিভে গেল কুষ্টিয়ার সাবংবাদিক দেবাশিস দত্ত, তার স্ত্রী, সন্তান ও শশুর, শোকে কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়ায় ফিরল দেবাশীষ ও স্ত্রী-সন্তানের নিথর দেহ, রাতেই স্ব স্ব ধর্মীয় রীতিতে শেষ বিদায়

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
ভারতে চিকিৎসা শেষে আবার কুষ্টিয়ার চেনা বাড়ি, পরিচিত উঠান, স্বজন আর কর্মক্ষেত্রে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত। কিন্তু তার সেই ফিরে আসা আর আগের মতো হলো না। বাড়ি, স্বজন, সহকর্মী—সবই ছিল; শুধু ছিলেন না দেবাশীষ। ফিরলেন তিনি, তবে জীবনের স্পন্দন নিয়ে নয়—কফিনবন্দী নিথর দেহ হয়ে।
শনিবার বিকেল ৫টার দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল শিখা ইনে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ছয় বাংলাদেশির মরদেহের সঙ্গে দেবাশীষ দত্তসহ তার পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে দেশে পৌঁছায়।
আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে চারটি মরদেহের তিনটি দেবাশীষের আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসায় এবং পরে আফসানা ও আকরাম হোসেনের মরদেহ তাঁদের শ্বশুরবাড়ি থানা পাড়ায় নেওয়া হয়।
এর আগে দুপুরেই সহকর্মী ও স্বজনেরা বেনাপোল সীমান্তে পৌঁছেছিলেন। তাঁরা অপেক্ষা করছিলেন প্রিয় সহকর্মীকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য। কিন্তু যে মানুষটির সঙ্গে কথা বলার, কুশল বিনিময়ের কিংবা বাড়ি ফেরার আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার কথা ছিল, তাঁকে গ্রহণ করতে হলো কফিন।
শনিবার রাত ১১টা নাগাদ কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসায় যখন সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমীন ও ছেলে স্বর্ণশীষ দত্তের মরদেহ পৌঁছাল, তখন বাড়িটিতে আর কোনো অপেক্ষা ছিল না—ছিল শুধু কান্না, শোক আর প্রিয়জনকে শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখার আকুতি।
একই রাতে তাদের সঙ্গে কলকাতায় থাকা আফসানার বাবা আকরাম হোসেনের মরদেহও পৌঁছে স্বজনদের কাছে।
গত বুধবার চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার কথা ছিল তাদের। অথচ চার দিন পর দেশে ফিরলেন তারা—জীবিত মানুষ হিসেবে নয়, কফিনবন্দী হয়ে।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড়ে ভারী হয়ে ওঠে আড়ুয়াপাড়ার পরিবেশ। কেউ শেষবারের মতো মুখ দেখতে ছুটে আসেন, কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসে কান্নার শব্দ।
ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতির মরদেহ সামনে নিয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি দেবাশীষের বাবা দিলীপ দত্ত।
কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতিকে হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
দেবাশীষের উপার্জনেই চলত তাদের পরিবার। এখন একসঙ্গে পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে তিনি যেন ভবিষ্যৎটাও অন্ধকার দেখছেন।
বৃদ্ধ বাবা বলেন, দেবাশীষের উপার্জনেই আমাদের পরিবার চলত। এখন আমরা একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছি। এই অবস্থায় সরকারের কাছে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ রাখেন তিনি।
একদিকে স্বামী, অন্যদিকে সন্তান ও নাতিকে হারানোর শোক সব মিলিয়ে দেকাশিস দত্তের মা স্বপ্না দত্তের কান্না যেন থামছিলই না। স্বজনেরা তাকে বারবার সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু যে শূন্যতা এক রাতে তৈরি হয়েছে, কোনো সান্ত্বনাই যেন তার কাছে পৌঁছাতে পারছিল না।
সবচেয়ে নির্মম দৃশ্যটি ছিল পরিবারের বেঁচে থাকা সাত বছরের শিশু মহিমা দত্তকে ঘিরে।
বাবা দেবাশীষ, মা আফসানা আর ছোট ভাই স্বর্ণশীষ—তিনজনই আর নেই, এই বাস্তবতার গভীরতা বোঝার বয়স এখনো হয়নি তার। সে শুধু বুঝতে পারছে, যাঁদের সঙ্গে কয়েক দিন আগেও ছিল, তাঁরা আর ফিরে আসবেন না।
বারবার সে তাদের দেখতে চাইছে।
স্বজনদের ভিড়ে শিশুটির সেই আকুতি আরও ভারী করে তুলছিল শোকের পরিবেশ। যে বয়সে একটি শিশু বাবার হাত ধরে ঘুরে বেড়ানোর কথা, ছোট ভাইয়ের সঙ্গে খেলায় মেতে থাকার কথা, সেই বয়সেই তাকে দাঁড়াতে হলো একসঙ্গে বাবা, মা ও ভাইকে হারানোর সামনে।
একই পরিবারের চারজন, দুই ধর্মীয় রীতিতে শেষ বিদায়
পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শনিবার গভীর রাতে পৃথক ধর্মীয় রীতিতে চারজনের শেষকৃত্য ও দাফন সম্পন্ন হয়।
রাত প্রায় ২টার দিকে কুষ্টিয়া মহাশ্মশানে সনাতন ধর্মীয় রীতিতে সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তাঁর শিশুসন্তান স্বর্ণশীষ দত্তের সৎকার করা হয়। পরে বাবা ও ছেলেকে পাশাপাশি সমাধি দেওয়া হয়।
এর প্রায় এক ঘণ্টা পর, রাত ৩টার দিকে কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে মুসলিম ধর্মীয় রীতিতে দাফন করা হয় দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমীন ও তাঁর শ্বশুর আকরাম হোসেনকে।
এক পরিবারের চারজন মানুষ—কিন্তু শেষ বিদায়ের পথ আলাদা। তবু তাঁদের মৃত্যুর বেদনা যেন একই শোকের স্রোতে মিলেমিশে গেল।
সহকর্মীদের শেষ শ্রদ্ধা
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের সহকর্মী, স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা শেষবারের মতো তাকে দেখতে ছুটে আসেন।
দৈনিক কুষ্টিয়ার সম্পাদক ড. আমানুর আমান বলেন, ‘দেবাশীষের এভাবে চলে যাওয়া মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। একজন সাংবাদিকের মৃত্যুতে আমরা শুধু একজন সহকর্মীকে হারাইনি, তাঁর পুরো পরিবারই এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর ছোট্ট মেয়েটি বাবা-মা ও ভাইকে হারিয়েছে—এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। আমরা শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানাই।’
কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আলমামুন সাগর বলেন,আমাদের সহকর্মী দেবাশীষ দত্তসহ তার পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পৃথক ধর্মীয় রীতিতে শেষকৃত্য ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।’
তিনি নিহত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানান।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত পরিবারের সদস্যদের ২৫ হাজার টাকা করে মোট ১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের মেয়ে মহিমার জন্য সরকারি সহায়তার বিষয়টিও দেখা হচ্ছে।
চলতি মাসের ৩ তারিখ কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসা থেকে স্ত্রী আফসানা শারমীন ও ছোট ছেলে স্বর্ণশীষকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন দেবাশীষ। কয়েক দিন পর সেখানে যান তার শ্বশুর আকরাম হোসেনও।
চিকিৎসা শেষে বুধবার তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net