July 11, 2026, 4:26 pm

ড. আমানুর আমান
একটি দেশের অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী—তার মূল্যায়ন শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি আয় কিংবা রেমিট্যান্স দিয়ে হয় না। আরও একটি সূচক আছে, যা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা সম্পর্কে নীরবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। সেটি হলো সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (Foreign Direct Investment—FDI)। কারণ বিদেশি বিনিয়োগ বর্তমান অর্থনীতিকে নয়, বরং একটি দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন।
সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে নতুন বিদেশি ইক্যুইটি বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, মোট এফডিআইয়ের বড় অংশ এখন নতুন উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে নয়; বরং আগে থেকেই বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের পুনঃবিনিয়োগকৃত মুনাফা থেকে এসেছে।
অর্থাৎ, যারা বাংলাদেশকে ইতোমধ্যে চেনেন, তাঁদের কেউ কেউ এখনও ব্যবসার সম্ভাবনা দেখছেন; কিন্তু নতুন বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা করছেন। অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি confidence gap—আস্থার ঘাটতি।
এই আস্থার সংকটকে কেবল নির্বাচন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা কিংবা ডলার সংকট দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার একটি অংশই দেখা হবে। প্রকৃত প্রশ্নটি আরও গভীর।
একজন বিদেশি উদ্যোক্তা কেন ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া কিংবা ভারতকে বেছে নেন, অথচ বাংলাদেশে আসতে দ্বিধা করেন? একইভাবে, কেন আফ্রিকার কয়েকটি দেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে?
উত্তরটি কর-ছাড়ে নয়; উত্তরটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতায়।
বিদেশি বিনিয়োগকারী মূলত তিনটি বিষয় কেনেন—নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং আইনি নিরাপত্তা।
তিনি জানতে চান, পাঁচ বছর পরও কি একই নীতি কার্যকর থাকবে? চুক্তি বাস্তবায়নে কত সময় লাগবে? কোনো বিরোধ হলে দ্রুত বিচার পাবেন কি? বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হলে মুনাফা দেশে ফেরত নিতে পারবেন কি? প্রশাসনিক অনুমোদনের জন্য কতগুলো দপ্তরে যেতে হবে? বিদ্যুৎ, গ্যাস, বন্দর ও লজিস্টিকস কতটা নির্ভরযোগ্য?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি অনিশ্চিত হয়, তাহলে কর-সুবিধা দিয়েও বড় বিনিয়োগ টানা কঠিন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত প্রণোদনার অভাব নয়; বরং বাস্তবায়নের ঘাটতি।
একদিকে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কথা বলা হয়, অন্যদিকে অনেক বিনিয়োগকারীকে একই প্রকল্পের জন্য একাধিক সংস্থার দ্বারস্থ হতে হয়। একদিকে শিল্পায়নের অঙ্গীকার করা হয়, অন্যদিকে ভূমি, জ্বালানি, পরিবেশ ছাড়পত্র, কাস্টমস কিংবা ইউটিলিটি সংযোগের দীর্ঘসূত্রতা প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ এখন অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো আর কোনো নির্দিষ্ট দেশকে অগ্রাধিকার দেয় না; তারা তুলনা করে। তারা দেখে, একই অর্থ কোথায় দ্রুত উৎপাদনে যাবে, কোথায় আইনি ঝুঁকি কম, কোথায় নীতি স্থিতিশীল এবং কোথায় ব্যবসার ব্যয় কম।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশকে আর শুধু প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে নয়; ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ঘানা কিংবা উগান্ডার সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। বিদেশি বিনিয়োগ মানে শুধু ডলার নয়। এর সঙ্গে আসে প্রযুক্তি, গবেষণা, দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ।
যে দেশগুলো গত তিন দশকে দ্রুত উন্নত হয়েছে, তাদের প্রায় সবাই বিদেশি বিনিয়োগকে শিল্পনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। তারা বিদেশি মূলধনকে কেবল অর্থ হিসেবে দেখেনি; দেখেছে জ্ঞান ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যম হিসেবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন আরও একটি বাস্তবতা রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনেক বিশেষ সুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসবে। তখন কম শ্রমমূল্য একাই প্রতিযোগিতার জন্য যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হবে উচ্চ উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগের সঙ্গে সংযুক্ত অর্থনীতি।
এই প্রেক্ষাপটে বিদেশি বিনিয়োগের ধারাবাহিক পতন ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের জন্য একটি কৌশলগত ঝুঁকি।
অতএব, এখন সময় এসেছে বিদেশি বিনিয়োগকে কেবল বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (BIDA) দায়িত্ব হিসেবে না দেখে সমগ্র রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সূচক হিসেবে বিবেচনা করার।
ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ, বিচারব্যবস্থার দক্ষতা, বন্দর সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা, নীতির ধারাবাহিকতা, ডিজিটাল সরকারি সেবা এবং দক্ষ মানবসম্পদ—এসব একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। একটি দুর্বল হলে পুরো বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অর্থনীতির ইতিহাস বলে, বিনিয়োগকারীরা প্রণোদনার জন্য আসেন না; তারা আসেন আস্থার জন্য। আর আস্থা কোনো বিজ্ঞাপন দিয়ে তৈরি হয় না; এটি গড়ে ওঠে ধারাবাহিক নীতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং নির্ভরযোগ্য রাষ্ট্রীয় আচরণের মাধ্যমে।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা এখনও অক্ষুণ্ণ। প্রায় ১৮ কোটির বাজার, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, তরুণ কর্মশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদনভিত্তি—সবই দেশের শক্তি। কিন্তু সম্ভাবনা নিজে থেকে বিনিয়োগে রূপ নেয় না। সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেয় বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান, পূর্বানুমানযোগ্য নীতি এবং কার্যকর শাসনব্যবস্থা।
বিদেশি বিনিয়োগে ৭০ শতাংশ পতনকে তাই সাময়িক ওঠানামা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অর্থনীতির একটি early warning signal—একটি আগাম সতর্কবার্তা। এই সংকেতকে গুরুত্ব দিয়ে যদি এখনই কাঠামোগত সংস্কার শুরু করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ আবারও বিনিয়োগকারীদের আস্থার গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু যদি আমরা কেবল পরিসংখ্যান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকি এবং আস্থার প্রকৃত সংকটকে অস্বীকার করি, তাহলে আগামী দিনের শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং কর্মসংস্থানের ভিত্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে। অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—পুঁজি সবসময় সেই দেশেই যায়, যেখানে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার আস্থা থাকে।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশ ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস/