July 12, 2026, 1:00 pm

তাকিয়া আফরোজ সাদিয়া
রাত তখন প্রায় ১১টা। কুষ্টিয়া শহরের একটি ছাত্রীনিবাসের দ্বিতীয় তলায় এখনও কয়েকটি কক্ষের বাতি জ্বলছে। কোথাও পরীক্ষার প্রস্তুতি, কোথাও ল্যাপটপে অ্যাসাইনমেন্ট, আবার কোথাও চুলায় রান্না হচ্ছে রাতের খাবার। বাইরে থেকে দেখলে দৃশ্যটি সাধারণ মনে হলেও ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে অন্য বাস্তবতা।
সম্প্রতি কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত ১০টি ছাত্রীনিবাস ঘুরে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানভেদে ভাড়া ও পরিবেশে কিছু পার্থক্য থাকলেও নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং মৌলিক সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে অধিকাংশ নিবাসেই একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে নিরাপত্তা, ব্যয়, মানসিক চাপ এবং প্রশাসনিক তদারকির অভাবের চিত্র।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ/
পরিদর্শন করা অধিকাংশ নিবাসে পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। কোথাও কোথাও প্রবেশপথে একটি ক্যামেরা থাকলেও করিডোর, সিঁড়ি কিংবা ছাদে কোনো নজরদারি নেই। অনেক নিবাসে রাতের নিরাপত্তাকর্মীর ব্যবস্থাও দেখা যায়নি।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইসমা খাতুন বলেন,
“আমরা শুধু একটি নিরাপদ পরিবেশ চাই। এমন একটি জায়গা, যেখানে বাবা-মা নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন।”
রাত করে কোচিং বা টিউশনি শেষে ফিরতে হলে অনেক শিক্ষার্থী এখনও উদ্বেগ নিয়ে চলাফেরা করেন বলে জানান।
অগ্নিনিরাপত্তায় বড় ঘাটতি/
ঘুরে দেখা বেশিরভাগ নিবাসেই অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র নেই। কোথাও জরুরি নির্গমন পথের ব্যবস্থা নেই, আবার কোথাও সরু সিঁড়িই একমাত্র ওঠানামার পথ। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত বের হওয়া কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা।
সীমিত জায়গায় অনেকের বসবাস/
একাধিক নিবাসে দেখা গেছে ছোট কক্ষে দুই বা তিনজন শিক্ষার্থী থাকছেন। পড়াশোনা, বিশ্রাম এবং দৈনন্দিন কাজ—সবকিছু একই ছোট্ট জায়গায় করতে হচ্ছে। রান্নাঘর ও বাথরুমও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর তুলনায় অপর্যাপ্ত।
ব্যয়ের চাপ/
মাসিক ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, খাবার, ইন্টারনেট, কোচিং ও শিক্ষাসামগ্রীর খরচ মেটাতে অনেক শিক্ষার্থীকে টিউশনি করতে হয়।
কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী আইরিন খন্দকার বলেন,
“মাসের শেষে অনেক সময় হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে যায়। নিজের অনেক প্রয়োজনই তখন পিছিয়ে দিতে হয়।”
মানসিক চাপও কম নয়/
পরিবার থেকে দূরে থাকার কারণে অনেক শিক্ষার্থী মানসিক চাপের কথাও জানান। অসুস্থ হলে পাশে পরিবারের কেউ থাকেন না। পরীক্ষার চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যতের চিন্তা মিলিয়ে অনেকেই মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
তবে এই নিবাসগুলোতেই গড়ে ওঠে এক ভিন্ন ধরনের পারিবারিক বন্ধন। কেউ অসুস্থ হলে অন্যরা পাশে দাঁড়ান, পরীক্ষার আগে নোট ভাগাভাগি করেন, উৎসবের দিন একসঙ্গে রান্না করে পরিবারের অভাব কিছুটা পূরণ করার চেষ্টা করেন।
অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা/
ঝিনাইদহ থেকে আসা এক শিক্ষার্থীর বাবা বলেন,
“মেয়েকে উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে পাঠিয়েছি। প্রতিদিনই চিন্তা হয়—সে নিরাপদ আছে তো? অসুস্থ হলে কে দেখবে?”
অনেক অভিভাবকের মতে, ছাত্রীনিবাসগুলো নিয়মিত প্রশাসনিক তদারকির আওতায় এলে তাঁদের উদ্বেগ অনেকটাই কমবে।
মালিকদের বক্তব্য/
ছাত্রীনিবাস পরিচালনাকারীরা বলছেন, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। তবে বাড়তি ব্যয়, ভবনের সীমাবদ্ধতা এবং নির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি/
শিক্ষার্থীরা মনে করেন, ছাত্রীনিবাসে নিয়মিত প্রশাসনিক পরিদর্শন, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পর্যাপ্ত সিসিটিভি, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, অভিযোগ জানানোর কার্যকর পদ্ধতি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা চালু করা জরুরি।
শিক্ষার জন্য দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কুষ্টিয়ায় আসা শত শত তরুণীর কাছে ছাত্রীনিবাস শুধু একটি থাকার জায়গা নয়; এটি তাদের স্বপ্ন গড়ার প্রথম ঠিকানা। এখান থেকেই প্রতিবছর বেরিয়ে আসেন শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যাংকার, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা ও প্রশাসনের কর্মকর্তা।
কিন্তু ভবিষ্যতের এই স্বপ্নগুলো যদি নিরাপত্তাহীনতা, অব্যবস্থাপনা এবং তদারকির অভাবে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে থাকে, তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—যে চার দেয়ালের ভেতরে আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ে উঠছে, সেই চার দেয়ালকে নিরাপদ ও মানসম্মত করার দায়িত্ব নেবে কে?