September 1, 2026, 10:26 am

একটি দৈনিক কুষ্টিয়া বিশ্লেষণ/
কুষ্টিয়ার নতুন পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পর জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন একজন পুলিশ প্রধান মানেই শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; সাধারণ মানুষের কাছে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নতুন প্রত্যাশাও। বিশেষ করে এমন একটি জেলায়, যেখানে শহরের অপরাধচিত্রের সঙ্গে চরাঞ্চল, সীমান্তসংলগ্ন এলাকা, মাদক চলাচলের অভিযোগ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের নানা বাস্তবতা জড়িয়ে আছে।
৩১ আগস্ট কুষ্টিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে নতুন পুলিশ সুপার জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে তিনি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পেশাদার ও কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রত্যয়ের কথাও জানান। তার বক্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে।
তবে কুষ্টিয়ার সামনে প্রশ্নটি কেবল কতটি অভিযান হবে বা কতজনকে গ্রেপ্তার করা হবে, তা নয়। মূল প্রশ্ন হলো—অপরাধের দৃশ্যমান অংশের বাইরে গিয়ে এর নেপথ্যের শক্তিকে চিহ্নিত করা যাবে কি?
কারণ, কুষ্টিয়ার মানুষ বহু বছর ধরেই একটি পরিচিত দৃশ্য দেখে এসেছে। কোথাও মাদকসহ একজন গ্রেপ্তার হয়েছে, কোথাও অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, কোথাও চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা হয়েছে, কোথাও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। এসব অভিযান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রায় প্রতিটি ঘটনার পরই সাধারণ মানুষের মনে একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে—যে ব্যক্তি ধরা পড়ল, সে কি সত্যিই পুরো চক্রের মূল ব্যক্তি? নাকি সে কেবল একটি বড় নেটওয়ার্কের মাঠপর্যায়ের কর্মী?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই সম্ভবত নতুন পুলিশ সুপারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অপরাধের জগৎ এখন আর শুধু একজন ব্যক্তি বা কয়েকজন স্থানীয় দুর্বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে সীমান্ত থেকে শুরু করে পরিবহন, মজুত, খুচরা বিক্রি এবং অর্থ লেনদেনের একটি দীর্ঘ শৃঙ্খল। একজন বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভবত সবচেয়ে সহজ ধাপ। কিন্তু তার পেছনে কে আছে, মাদক কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে পরিবহন হয়েছে, কারা অর্থ দিয়েছে, কারা নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত এই ব্যবসার অর্থ কার হাতে পৌঁছায়—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করাই কঠিন।
আর সেখানেই একটি পুলিশ প্রশাসনের প্রকৃত সক্ষমতার পরীক্ষা।
কুষ্টিয়ার ভৌগোলিক বাস্তবতাও এ চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলেছে। শহরকেন্দ্রিক জনপদের পাশাপাশি জেলার দৌলতপুরসহ কয়েকটি এলাকায় রয়েছে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। পদ্মার গতিপথের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় অনেক এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা ও বাস্তবতা। কোথাও নদীপথ, কোথাও দুর্গম চর, কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে সীমিত যোগাযোগ—এসব কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য কার্যকর নজরদারি সবসময় সহজ নয়।
বিশেষ করে দৌলতপুরের চরাঞ্চলকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, আধিপত্য বিস্তার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের তৎপরতার অভিযোগ উঠে এসেছে। চরাঞ্চলের মানুষের কাছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক সময় শুধু অপরাধের পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি তাদের দৈনন্দিন নিরাপত্তার প্রশ্ন।
কুষ্টিয়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আলোচনায় খোকসা উপজেলার বাস্তবতাও বিশেষভাবে সামনে আসে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার কিছু এলাকায় দুই কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও তাদের অনুসারীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের কর্মকাণ্ড কার্যকরভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না—এমন প্রশ্নও রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
এই পরিস্থিতি নতুন পুলিশ সুপারের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। কারণ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ভয়ভীতি, প্রভাব বা শক্তির বলয় তৈরি করে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে, তাহলে শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনার পর ব্যবস্থা নিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। প্রয়োজন তাদের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা, সংশ্লিষ্ট ঘটনার তদন্ত এগিয়ে নেওয়া এবং অভিযোগের পেছনে কোনো বৃহত্তর নেটওয়ার্ক বা প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা।
খোকসার ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি তাই কেবল দুজন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে স্থানীয় মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার। সেখানে একজন ইউপি চেয়ারম্যান এক সন্ত্রাসীকে অস্ত্র কিনে দিয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সহযোগীতা করে চলেছে। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগের পেছনে যদি আরও বড় কোনো অপরাধী নেটওয়ার্ক বা আশ্রয়দাতা থাকে, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে তাদেরও চিহ্নিত করতে হবে। অন্যথায় একজন বা দুজনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রভাববলয় ভাঙা সম্ভব হবে না।
নতুন পুলিশ সুপারের জন্য খোকসার এই পরিস্থিতি তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—অপরাধ দমনে শুধু দৃশ্যমান ব্যক্তিকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; দেখতে হবে, কারা তাকে বা তাদের শক্তি জোগাচ্ছে, কারা আশ্রয় দিচ্ছে এবং কীভাবে একটি অপরাধী বলয় দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকার সুযোগ পাচ্ছে।
কোনো এলাকায় অপরাধীচক্র যদি স্থানীয়ভাবে প্রভাব তৈরি করতে পারে, মানুষ যদি ভয়ে থানায় যেতে না চায়, অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়ার বিষয়ে আস্থাহীন থাকে কিংবা সাক্ষ্য দিতে ভয় পায়—তাহলে শুধু অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নতুন পুলিশ সুপারের সামনে তাই চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে পুলিশের উপস্থিতি দৃশ্যমান করার পাশাপাশি কার্যকর গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
মাদকের ক্ষেত্রেও কুষ্টিয়ার বাস্তবতা আলাদা গুরুত্ব দাবি করে। সীমান্তসংলগ্ন জেলার সঙ্গে যোগাযোগ, আন্তজেলা সড়কপথ এবং স্থানীয় বাজারব্যবস্থা—সব মিলিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণকে কেবল থানাভিত্তিক অভিযান হিসেবে দেখলে চলবে না।
একজন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করার পর তদন্তের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত তার মোবাইল নম্বরের তালিকা, আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক এবং সরবরাহের উৎস অনুসন্ধান করা। অর্থাৎ অভিযান শুধু মাদক উদ্ধার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; যেতে হবে মাদকের অর্থনীতির শিকড়ে।
একটি ছোট চালান ধরা পড়ার পর যদি পুলিশ তার উৎস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, তাহলে হয়তো একটি বড় নেটওয়ার্কের সন্ধান মিলবে। আর একটি বড় নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া গেলে শুধু কয়েকজন বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করার চেয়ে তার প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে।
অবৈধ অস্ত্রের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
একটি অস্ত্র উদ্ধার অবশ্যই পুলিশের সাফল্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অস্ত্রটি এলো কোথা থেকে? কে সরবরাহ করল? অস্ত্রটি কি স্থানীয় কোনো বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার বা সংঘবদ্ধ অপরাধের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল? একই উৎস থেকে আরও অস্ত্র এসেছে কি না?
একটি অস্ত্র উদ্ধারের সঙ্গে যদি অস্ত্রের উৎস অনুসন্ধান, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক শনাক্ত এবং সম্ভাব্য ব্যবহারকারীদের চিহ্নিত করার তদন্ত যুক্ত হয়, তাহলে সেই অভিযান কেবল একটি অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং একটি বড় অপরাধচক্র ভেঙে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
চাঁদাবাজির ক্ষেত্রেও কুষ্টিয়ার বাস্তবতায় অনুসন্ধানের জায়গা রয়েছে। সামনে যিনি গিয়ে টাকা সংগ্রহ করেন, তিনি সবসময় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তি নাও হতে পারেন। অনেক সময় অর্থের গতিপথ অনুসরণ করলেই নেপথ্যের শক্তির সন্ধান পাওয়া সম্ভব।
কে টাকা আদায় করছে—এটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে, কার নির্দেশে আদায় হচ্ছে এবং কারা এর সুবিধাভোগী।
অপরাধের তদন্তে তাই ‘মানুষ ধরার’ পাশাপাশি ‘নেটওয়ার্ক ধরার’ কৌশল জরুরি।
নতুন পুলিশ সুপারের সঙ্গে মতবিনিময়ে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকেও জেলার বিভিন্ন অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয় উঠে এসেছে। সাংবাদিকদের কাজই হলো এমন অনেক বিষয় সামনে নিয়ে আসা, যেগুলো সাধারণ মানুষ বলতে ভয় পান অথবা যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে থেকে যায়। এই জায়গায় পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক হওয়া উচিত পেশাদার সহযোগিতার—যেখানে সাংবাদিক তথ্য দেবেন, পুলিশ তা যাচাই করে আইনি কাঠামোর মধ্যে ব্যবস্থা নেবে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘গডফাদার’ বা ‘নেপথ্যের শক্তি’ কথাটি যেন কেবল রাজনৈতিক স্লোগান বা জনমত তৈরির ভাষায় সীমাবদ্ধ না থাকে।
কাউকে শুধু জনশ্রুতি, রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে অপরাধী বলা যায় না। একটি গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক সমাজে অপরাধীকে শনাক্ত করতে হয় তথ্য, সাক্ষ্য, তদন্ত এবং আইনগত প্রমাণের ভিত্তিতে।
এখানেই নতুন পুলিশ সুপারের পেশাদারিত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
কারণ, প্রভাবশালী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা যেমন সহজ কাজ নয়, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। তাই প্রয়োজন এমন তদন্তব্যবস্থা, যেখানে জনশ্রুতি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হবে, তথ্য যাচাই করা হবে, আর্থিক লেনদেন ও যোগাযোগের সূত্র অনুসরণ করা হবে এবং শেষ পর্যন্ত আদালতে টিকে থাকার মতো প্রমাণ তৈরি করা হবে।
কুষ্টিয়ার মানুষ সম্ভবত এটাই দেখতে চায়—আইন যেন ব্যক্তি, পরিচয়, অর্থ বা প্রভাব দেখে পরিবর্তিত না হয়।
এখানে পুলিশের নিজেদের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিও গুরুত্বপূর্ণ।
অপরাধীচক্র অনেক সময় দীর্ঘদিন টিকে থাকে শুধু নিজেদের শক্তির কারণে নয়; প্রশাসনের কোথাও দুর্বলতা, তথ্য ফাঁস, অবহেলা বা নীরব সহযোগিতার সুযোগ পেলেও তারা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধীচক্রের সঙ্গে যোগসাজশ, তথ্য পাচার বা দায়িত্বে অবহেলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
কারণ পুলিশের বিরুদ্ধে মানুষের আস্থা নষ্ট হলে সবচেয়ে বড় সুবিধা পায় অপরাধীই।
একজন সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে যদি মনে করেন, তাঁর অভিযোগ শোনা হবে না; প্রভাবশালী প্রতিপক্ষ থাকলে মামলা নেওয়া কঠিন হবে; অথবা অভিযোগ করার কারণে পরে তাঁকেই হুমকির মুখে পড়তে হবে—তাহলে অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে যায়।
অন্যদিকে থানায় গিয়ে যদি মানুষ দেখতে পায় যে তার সামাজিক পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান বা অর্থনৈতিক সক্ষমতা নয়, বরং আইনের ভিত্তিতেই তার অভিযোগের বিচার হচ্ছে, তাহলে পুলিশের প্রতি আস্থা বাড়ে।
এই আস্থাই অপরাধ দমনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলোর একটি।
নতুন এসপির সামনে তাই শুধু অপরাধী ধরার চ্যালেঞ্জ নেই; পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব কমানোর চ্যালেঞ্জও রয়েছে। শহরের ব্যবসায়ী, গ্রামের কৃষক, চরাঞ্চলের বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, নারী, সাংবাদিক—সবার কাছে পুলিশি সেবা সমানভাবে পৌঁছানো জরুরি।
কুষ্টিয়া এখন এমন একটি পরিবর্তনের প্রত্যাশায় আছে, যেখানে পুলিশের সাফল্য শুধু প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা হবে না। বরং মানুষ দেখতে চাইবে—মাদক কি সত্যিই কমেছে? চাঁদাবাজির ভয় কি কমেছে? ব্যবসায়ীরা কি নির্ভয়ে ব্যবসা করতে পারছেন? চরাঞ্চলের মানুষ কি নিরাপদ বোধ করছেন? সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে ন্যায়সঙ্গত সেবা পাচ্ছেন কি না?
সবচেয়ে বড় কথা, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছোট কর্মীদের গ্রেপ্তারের পর তাদের জায়গায় নতুন লোক আসছে কি না।
যদি একজন মাদক বিক্রেতা ধরা পড়ার পরদিনই আরেকজন তার জায়গা নেয়, যদি একজন অস্ত্রধারী গ্রেপ্তারের পর একই চক্র অন্য কাউকে অস্ত্র দেয়, যদি একজন চাঁদাবাজকে আটক করার পর নতুন কেউ একই নামে টাকা তুলতে শুরু করে—তাহলে বোঝা যাবে মূল নেটওয়ার্কটি অক্ষত রয়েছে।
সেখানেই পার্থক্য তৈরি করতে পারেন নতুন পুলিশ সুপার।
তিনি চাইলে অভিযান ও গ্রেপ্তারের দৈনন্দিন পরিসংখ্যানকে সাফল্যের প্রধান সূচক হিসেবে রাখতে পারেন। আবার চাইলে প্রতিটি বড় অপরাধের পেছনে থাকা অর্থ, অস্ত্র, যোগাযোগ, প্রভাব ও সংগঠনের সূত্র অনুসরণ করে অপরাধের শিকড়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারেন।
কুষ্টিয়ার জন্য দ্বিতীয় পথটিই সম্ভবত বেশি প্রয়োজন।
৩১ আগস্ট সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে নতুন পুলিশ সুপার যে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও পরিকল্পনার কথা বলেছেন, তার বাস্তবায়নই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কথার চেয়ে মানুষের চোখ থাকবে মাঠপর্যায়ের পরিবর্তনের দিকে।
কারণ কুষ্টিয়ার মানুষ নতুন কোনো প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি দেখতে চায় একটি কার্যকর বাস্তবতা—যেখানে অপরাধী শুধু ছোট কর্মী নয়, তার নেপথ্যের সংগঠকও আইনের আওতায় আসবে; যেখানে চরাঞ্চলের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় নয়, রাষ্ট্রের উপস্থিতিতে আস্থা রাখবে; যেখানে মাদকবিরোধী অভিযান শুধু কয়েকটি বোতল বা প্যাকেট উদ্ধারে শেষ হবে না, বরং ভেঙে দেওয়া হবে এর অর্থ ও সরবরাহের নেটওয়ার্ক; আর যেখানে থানার দরজা সবার জন্য সমানভাবে খোলা থাকবে।
নতুন পুলিশ সুপারের সামনে তাই সুযোগও আছে, চ্যালেঞ্জও আছে।
শেষ পর্যন্ত তাঁর সাফল্যের মাপকাঠি শুধু কতজন ‘চুনোপুঁটি’ ধরা পড়ল, তা হবে না। প্রকৃত প্রশ্ন হবে—অপরাধের নেপথ্যে যারা অর্থ দেয়, আশ্রয় দেয়, নির্দেশ দেয় এবং নিজেদের প্রভাব ব্যবহার করে অপরাধচক্রকে টিকিয়ে রাখে, তাদের পর্যন্ত তদন্তের হাত পৌঁছাতে পারল কি না।
কুষ্টিয়ার মানুষ এখন সেই উত্তরটির অপেক্ষায়।