November 5, 2026, 5:43 pm

ড. আমানুর আমান
প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। এই ভিত্তি দুর্বল হলে উচ্চশিক্ষায় উৎকর্ষ অর্জন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি কিংবা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে সরকারের বড় বিনিয়োগ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৪১ হাজার ৯০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদনের খবর সেই আশারই নতুন উপলক্ষ তৈরি করেছে।
তবে শিক্ষার মতো দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুত্বপূর্ণ খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দই সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। বরং অর্থের যথাযথ ব্যবহার, পরিকল্পনার বাস্তবতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, শিক্ষকের সক্ষমতা এবং শিক্ষার্থীর প্রকৃত শিখন-অর্জন—এসবের সম্মিলিত ফলেই বিনিয়োগের সার্থকতা নির্ধারিত হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কোথা থেকে কোথায় এসেছে, গত পাঁচ বছরে কী অর্জন করেছে এবং নতুন এই কর্মসূচি বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো কতটা কাটিয়ে উঠতে পারবে?
### অতীতের পথচলা: প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকেই এ খাতকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার ৩৬ হাজারের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করে। পরবর্তী সময়ে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।
পরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মসূচির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিনের। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি) মাধ্যমে বিদ্যালয় নির্মাণ, শ্রেণিকক্ষ সম্প্রসারণ, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। অর্থাৎ ৪১ হাজার কোটি টাকার এই কর্মসূচি প্রাথমিক শিক্ষায় প্রথম বড় বিনিয়োগ নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার পঞ্চম পর্যায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনা করা প্রয়োজন। ২০১১-২০১৭ মেয়াদে বাস্তবায়িত তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির প্রাথমিক ব্যয় ছিল প্রায় ৫৮ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী এর মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৭৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ২০১৮ সালে অনুমোদিত চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৮ হাজার ৩৯৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ফলে নতুন পিইডিপি-৫-এর ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকার বরাদ্দকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি বলা যাবে না। তবে এটি প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায়।
এই কর্মসূচিগুলোর ফলে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার, নারীশিক্ষা, বিনা মূল্যে বই বিতরণ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়: বিদ্যালয়ে শিশুদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা আর তাদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কি একই বিষয়? বাস্তবতা বলছে, বিষয় দুটি এক নয়।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন শুধু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা নয়, বরং ভর্তি হওয়া শিশুরা শ্রেণি অনুযায়ী পড়তে, লিখতে, বুঝতে এবং গণিতের মৌলিক সমস্যা সমাধান করতে পারছে কি না, তা নিশ্চিত করা।
### গত পাঁচ বছর: অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন বাস্তবতা
২০২১ থেকে ২০২৬—এই পাঁচ বছর বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময়। এর শুরুতে ছিল করোনা মহামারির দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত। ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রায় ১৮ মাস বন্ধ ছিল। ২০২২ সালের শুরুতেও সংক্রমণের কারণে কিছুদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয়েছিল। এর ফলে কয়েক কোটি শিশুর নিয়মিত শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়।
সরকার টেলিভিশন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং বাড়িতে পাঠানোর জন্য অনুশীলনী ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। উদ্যোগগুলো প্রয়োজনীয় ছিল, কিন্তু সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষ করে গ্রামীণ, দরিদ্র ও প্রযুক্তিসুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি খাতের নিজস্ব মূল্যায়নেও এই সময়ে শিখনবৈষম্য এবং বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে।
মহামারির পর বিদ্যালয় খুললেও শিক্ষার্থীদের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সহজ হয়নি। অনেক শিশু শ্রেণি অনুযায়ী পড়ার দক্ষতা হারিয়েছে, কেউ কেউ পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে। ফলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা পুনরুদ্ধার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে এই সময়ে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতিও হয়েছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ধরে রাখার ক্ষেত্রে উন্নতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের উন্নয়ন, অবকাঠামো সংস্কার, ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণের সম্প্রসারণ এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের কার্যক্রম চলেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি ও বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের ধারাবাহিকতাও বজায় রয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ সালে প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ছিল ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা কমে ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশে নেমেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে। একই সময়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত টিকে থাকার হার ২০২৪ সালে ৮৩ দশমিক ৯৮ শতাংশে নেমে আসে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে অগ্রগতি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু সূচকে অবনতি হয়েছে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক চিত্র রয়েছে। ২০২৪ সালে সব ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয় মিলিয়ে জাতীয় পর্যায়ে এই অনুপাত ছিল ১:২৯। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তা প্রায় ১:২৮। কিন্তু একই প্রতিবেদনের আরেকটি তথ্য আমাদের ভাবিয়ে তোলে। দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৩ হাজার ৫১৯টি এক শিফটে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ শতাংশ বিদ্যালয়ে এখনো দুই শিফটে পাঠদান করতে হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত তুলনামূলক ভালো হলেও বিদ্যালয়ের সময় ও পাঠদানের পরিবেশ যে এখনো পর্যাপ্ত নয়, এই পরিসংখ্যান তার ইঙ্গিত দেয়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শিক্ষার গুণগত মান। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০২২ সালের জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নে তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা ও গণিতের দক্ষতা পরিমাপ করা হয়েছে। এই মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায়, শিক্ষার্থীদের শিখন-অর্জনে শ্রেণি, অঞ্চল, বিদ্যালয়ের ধরন ও সামাজিক অবস্থানভেদে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ সবাই বিদ্যালয়ে গেলেও সবাই সমানভাবে শিখছে না।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গত পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে বাজেটের অঙ্ক বেড়েছে। কিন্তু জাতীয় বাজেটের তুলনায় শিক্ষা খাতের অংশ ২০২২-২৩ অর্থবছরের সংশোধিত হিসাবে ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশে নেমে এসেছিল। পরবর্তী সময়েও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ও প্রয়োজনের মধ্যে ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কাজেই বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
### পিইডিপি-৫: ৪১ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনায় কী রয়েছে?
নতুন পিইডিপি-৫ কর্মসূচির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত। মোট ব্যয় ৪১ হাজার ৯০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৩৩ হাজার ২০৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা এবং প্রকল্প সহায়তা বা ঋণ ৭ হাজার ৮৮৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পটির অর্থায়নে সরকারের নিজস্ব অংশই প্রধান।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়িতব্য এ কর্মসূচিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন বিদ্যালয় স্থাপন, পুরোনো বিদ্যালয় সংস্কার, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, শিক্ষার্থীদের জুতা, স্কুল ড্রেস এবং শিক্ষা উপকরণ বিতরণ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
পরিকল্পনার পরিধি বিবেচনায় এটি একটি সমন্বিত উদ্যোগ। কারণ প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন শুধু শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ কিংবা শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর সঙ্গে শিক্ষার্থীর পুষ্টি, আর্থিক সক্ষমতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষকের দক্ষতা এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
তবে এখানে একটি প্রশাসনিক বিষয়ও লক্ষণীয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের পাশাপাশি পরামর্শকসহ কয়েকটি খাতের ব্যয় যৌক্তিকীকরণ এবং কিছু ব্যয় রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দুই সপ্তাহের মধ্যে এসব পর্যবেক্ষণ যুক্ত করে প্রকল্পটি পুনরায় উপস্থাপনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এটি একদিকে প্রকল্পের ব্যয় যাচাইয়ের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত, অন্যদিকে চূড়ান্ত বাস্তবায়নের আগে পরিকল্পনার স্বচ্ছতা ও ব্যয়-যৌক্তিকতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়।
### বরাদ্দ কীভাবে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে পারে?
৪১ হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগকে কার্যকর করতে হলে প্রথমেই অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কোন খাতে ব্যয় করলে শিক্ষার্থীর শেখার সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি বাড়বে।
প্রথমত, শিক্ষকদের মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একটি ভালো বিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ তার শিক্ষক। শুধু প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করলেই একজন শিক্ষক দক্ষ হয়ে ওঠেন না। প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু হতে হবে শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। শিশু কীভাবে শেখে, দুর্বল শিক্ষার্থীকে কীভাবে এগিয়ে নিতে হয়, আনন্দদায়ক পরিবেশে কীভাবে পাঠদান করতে হয় এবং শিক্ষার্থীর অগ্রগতি কীভাবে মূল্যায়ন করতে হয়—এসব বিষয়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষকদের কাজের পরিবেশ, পেশাগত মর্যাদা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষার গুণগত মান পরিমাপের জন্য নিয়মিত মূল্যায়নব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয় শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী যদি সাবলীলভাবে বাংলা পড়তে না পারে কিংবা মৌলিক যোগ-বিয়োগ করতে না পারে, তাহলে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়াকে সাফল্য বলা যায় না। প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শিখন-অর্জন পরিমাপের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কোন শিক্ষার্থী পিছিয়ে আছে এবং কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করতে হবে। এজন্য জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নের পাশাপাশি বিদ্যালয়ভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন কার্যকর করা জরুরি।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে প্রয়োজনভিত্তিক। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কিংবা মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী উদ্যোগ। কিন্তু ট্যাব বিতরণ করলেই ডিজিটাল শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষক কীভাবে এটি ব্যবহার করবেন, শিক্ষার্থীরা কী শিখবে এবং এর ফলে পাঠদানের মান কতটা বাড়বে? বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সুবিধা না থাকলে এসব যন্ত্রের কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ে। তাই প্রযুক্তি সরবরাহের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ, উপযোগী বাংলা কনটেন্ট এবং ব্যবহারিক পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
চতুর্থত, পিছিয়ে পড়া অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। চরাঞ্চল, হাওর, পাহাড়ি অঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং দুর্গম জনপদের বিদ্যালয়গুলোর সমস্যা এক রকম নয়। কোথাও শিক্ষকসংকট, কোথাও যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা, কোথাও আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয়। সব বিদ্যালয়ের জন্য একই ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করলে বৈষম্য কমবে না। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী অঞ্চলভিত্তিক বরাদ্দ ও কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী শ্রেণিকক্ষ, শৌচাগার ও শিক্ষাসামগ্রী নিশ্চিত করাও জরুরি।
পঞ্চমত, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে শুধু নতুন ভবন নির্মাণ নয়, বিদ্যমান ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, খেলার মাঠ এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দুই শিফটের পরিবর্তে অধিক বিদ্যালয়কে এক শিফটে আনার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারণ বিদ্যালয়ে শিশুর অবস্থানের সময় বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত পাঠদানের সুযোগ সৃষ্টি করা শিখন-অর্জনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ষষ্ঠত, ঝরে পড়া রোধে উপবৃত্তি ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণের কার্যক্রমকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। দরিদ্র পরিবারের শিশুরা যাতে অর্থনৈতিক কারণে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, পুষ্টি, মানসিক সুস্থতা এবং পরিবারের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ।
### জবাবদিহি ছাড়া বড় বরাদ্দের সুফল পাওয়া কঠিন
এত বড় কর্মসূচির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে বাস্তবায়নগত দুর্বলতা। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, কখনো প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়, কখনো ব্যয় বেড়ে যায়, আবার কখনো অবকাঠামো তৈরি হলেও প্রত্যাশিত সেবা পাওয়া যায় না। প্রাথমিক শিক্ষার মতো মানবসম্পদ উন্নয়নমূলক প্রকল্পে এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এজন্য প্রকল্পের প্রতিটি খাতের ব্যয় জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। কোন জেলায় কতটি বিদ্যালয় নির্মিত হচ্ছে, কতজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন, কতটি বিদ্যালয়ে প্রযুক্তি সরবরাহ করা হচ্ছে এবং এসব কার্যক্রমের অগ্রগতি কতটুকু—এসব তথ্য নাগরিকদের জন্য সহজলভ্য হওয়া প্রয়োজন। স্বাধীন মূল্যায়ন এবং নিয়মিত নিরীক্ষার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যেন কার্যক্রমগুলো টিকে থাকে। পাঁচ বছর ধরে ট্যাব বিতরণ করা হলো, কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ নেই; মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম তৈরি হলো, কিন্তু প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই—এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিনিয়োগের বড় অংশই অর্থহীন হয়ে পড়বে। তাই প্রকল্পের কিছু কার্যক্রমকে শুরু থেকেই নিয়মিত রাজস্ব বাজেটের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।
### শেষ কথা: বিনিয়োগের মূল্যায়ন হোক শিশুর শেখার সক্ষমতায়
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাত একদিকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, অন্যদিকে গুণগত মান, শিখনবৈষম্য, শিক্ষক দক্ষতা এবং ঝরে পড়ার মতো সমস্যার মুখোমুখি রয়েছে। অতীতের পিইডিপি কর্মসূচিগুলো অবকাঠামো ও শিক্ষার প্রবেশাধিকার বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু নতুন সময়ের চাহিদা শুধু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী উপস্থিতি নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখন প্রয়োজন এমন একটি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি শিশু তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে মানসম্মত শিক্ষা পাবে।
৪১ হাজার কোটি টাকার পিইডিপি-৫ সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি বড় সুযোগ। তবে এই কর্মসূচির সাফল্য নির্ধারিত হবে না কত টাকা ব্যয় হলো, কতটি ভবন নির্মিত হলো কিংবা কতটি ট্যাব বিতরণ করা হলো, তা দিয়ে। সাফল্য নির্ধারিত হবে পাঁচ বছর পর একজন শিশু কতটা ভালোভাবে পড়তে পারছে, নিজের ভাষায় চিন্তা প্রকাশ করতে পারছে, গণিতের মৌলিক সমস্যা সমাধান করতে পারছে এবং বাস্তব জীবন সম্পর্কে যুক্তিনির্ভর ধারণা অর্জন করছে, তা দিয়ে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু বিদ্যালয়ের দরজা খুলে দেওয়া নয়, সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করা প্রতিটি শিশুর জন্য সম্ভাবনার পথ তৈরি করা। প্রাথমিক শিক্ষায় এই বিপুল বিনিয়োগ যদি রাজনৈতিক প্রচারণা, প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা কিংবা প্রকল্পের সংখ্যাগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকৃত শিখন-অর্জনে রূপ নেয়, তাহলেই তা হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য একটি অর্থবহ বিনিয়োগ। অন্যথায় ৪১ হাজার কোটি টাকার অঙ্কটি বড় হয়েই থাকবে, কিন্তু তার সুফল হয়তো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ছোট হবে।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস