June 10, 2026, 7:23 pm

ড. আমানুর আমানের কলাম
বাংলাদেশে যখন কোনো হাসপাতালকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়, তখন সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একটি নির্দিষ্ট ঘটনা, একজন রোগী বা একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিটি আলোচিত ঘটনা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরও গভীর কিছু সমস্যার দিকে আঙুল তোলে। সাম্প্রতিক সময়ে আদ-দীন হাসপাতালকে ঘিরে যে বিতর্ক ও প্রশ্নের জন্ম হয়েছে, সেটিও সেই বৃহত্তর বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এই ঘটনাকে শুধুমাত্র একটি হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং এটি বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের দীর্ঘদিনের সংকট, জবাবদিহির অভাব এবং চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণের একটি প্রতিফলন। এখানে প্রশ্ন উঠছে চিকিৎসা-সেবা ও বাণিজ্যে রোগীর অবস্থান কোথায় ?
বাংলাদেশে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই অবকাঠামোগত সংকট, জনবল ঘাটতি এবং সেবার সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। ফলে সামর্থ্যবান ও মধ্যবিত্ত মানুষের বড় অংশ চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই নির্ভরশীলতাই বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষমতা দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, সেই ক্ষমতা কতটা জনসেবায় ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কতটা মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে?
সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে, দেশের অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল এখন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসা সেবা অবশ্যই ব্যয়সাপেক্ষ। উন্নত যন্ত্রপাতি, দক্ষ চিকিৎসক, নার্স এবং পরিচালন ব্যয় রয়েছে। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন চিকিৎসার প্রয়োজনের চেয়ে রাজস্ব আয়ের বিষয়টি অধিক গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
অনেক রোগী ও তাদের স্বজন অভিযোগ করেন, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো, ব্যয়বহুল কেবিন বা আইসিইউ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া, অপ্রয়োজনীয়ভাবে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা কিংবা ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক সেবার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতি ঝোঁক তৈরি করা এখন প্রায় নিয়মিত অভিযোগে পরিণত হয়েছে। এসব অভিযোগের সবকিছু সত্য নাও হতে পারে, কিন্তু অভিযোগগুলোর পুনরাবৃত্তি একটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
আদ-দীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব অভিযোগ ও সমালোচনা উঠে এসেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত যোগাযোগের অভাব, চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না দেওয়া, অভিযোগ নিষ্পত্তিতে ধীরগতি এবং সংকটময় পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল তথ্য প্রকাশে ব্যর্থতা। সমালোচকদের মতে, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার পর দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের উদ্যোগ না নেওয়ায় জনমনে সন্দেহ আরও বেড়েছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগগুলোর জবাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই বিলম্বিত বা অস্পষ্ট ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। রোগী অধিকার, সেবার মান এবং জবাবদিহির বিষয়ে আরও সক্রিয় ও স্বচ্ছ ভূমিকা নেওয়ার প্রত্যাশাও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোই এখনো তদন্ত, যাচাই বা আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় রয়েছে। ফলে চূড়ান্তভাবে দায় নির্ধারণের আগে তথ্য-প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধানের ফলাফলের অপেক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত।
এখানেই সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতা। কোনো হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত হয়, কমিটি গঠিত হয়, সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত কতগুলো ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে, তার সংখ্যা খুবই সীমিত। ফলে অনেক সময় মানুষের মধ্যে ধারণা জন্ম নেয় যে হাসপাতাল মালিকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যথেষ্ট কঠোর নয়।
আদ-দীন হাসপাতালকে ঘিরে জনপরিসরে আরেকটি অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়—কিছু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর আচরণ রোগী ও স্বজনদের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল নয়। অভিযোগকারীদের দাবি, ব্যস্ততা, অতিরিক্ত রোগীর চাপ বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির কারণে অনেক সময় রোগীদের প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দেওয়া হয় না, উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না, এমনকি রূঢ় আচরণেরও অভিযোগ ওঠে। তবে এসব অভিযোগ ব্যক্তি বিশেষ বা নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে; সব চিকিৎসক বা পুরো প্রতিষ্ঠানকে একইভাবে মূল্যায়ন করা ন্যায্য নয়। তবুও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে মানবিক আচরণ, সম্মানজনক যোগাযোগ এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবা নিশ্চিত করা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বাস্তবতা হলো, স্বাস্থ্যসেবা এমন একটি খাত যেখানে বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম পুরোপুরি কার্যকর হয় না। একজন অসুস্থ মানুষ কোনো পণ্যের ক্রেতার মতো দরদাম করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। জীবন বাঁচানোর তাগিদে তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ ও হাসপাতালের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। এই নির্ভরশীলতার সুযোগ নেওয়া হলে তা কেবল অনৈতিকই নয়, সামাজিকভাবে বিপজ্জনকও।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতের বাণিজ্যিকীকরণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। একটি গুরুতর অসুস্থতা প্রায়ই একটি পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয় শেষ করে দেয়। অনেক পরিবার জমি বিক্রি করে, ঋণ নেয় অথবা সর্বস্ব হারিয়ে চিকিৎসার খরচ মেটায়। বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য অর্থনীতির গবেষণাগুলোও দেখিয়েছে যে, চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে দরিদ্র হয়ে পড়া পরিবারের সংখ্যা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উদ্বেগজনক।
এই বাস্তবতায় আদ-দীনকে ঘিরে বিতর্কের সঠিক তদন্ত হওয়া জরুরি, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা। কোনো একটি হাসপাতালকে শাস্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না, যদি একই ধরনের চর্চা অন্য হাসপাতালগুলোতে অব্যাহত থাকে।
সরকারের উচিত বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জন্য আরও কঠোর ও স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলা। চিকিৎসা ব্যয়ের স্বচ্ছ তালিকা প্রকাশ, রোগীর অধিকার সনদ কার্যকর করা, স্বাধীন অভিযোগ তদন্ত ব্যবস্থা চালু করা এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের ওপর অযৌক্তিক বাণিজ্যিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরও আত্মসমালোচনার সুযোগ রয়েছে। চিকিৎসা সেবা কেবল একটি ব্যবসা নয়; এটি মানুষের জীবন, বিশ্বাস এবং মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি হাসপাতালের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন বা যন্ত্রপাতি নয়, বরং মানুষের আস্থা। সেই আস্থা একবার নষ্ট হলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন।
সবশেষে বলা যায়, আদ-দীন হাসপাতালকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত তথ্য, প্রমাণ এবং আইনের ভিত্তিতে। যদি কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর যদি অভিযোগের ভিত্তি দুর্বল হয়, তাহলে সেটিও স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা উচিত। কিন্তু এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত অন্য জায়গায়—বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে চিকিৎসা সেবা ধীরে ধীরে মানবিক অধিকার থেকে বাজারনির্ভর পণ্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সেই প্রবণতা রোধ করতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও অনেক আদ-দীন, আরও অনেক বিতর্ক এবং আরও অনেক আস্থাহীনতার মুখোমুখি হতে হবে দেশকে।
স্বাস্থ্যসেবা যখন মানুষের জীবনের শেষ আশ্রয়, তখন হাসপাতালের প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত সেবাকেন্দ্র; মুনাফাকেন্দ্র নয়। রাষ্ট্র, হাসপাতাল মালিক এবং চিকিৎসক সমাজ—সবার জন্যই এ মুহূর্তে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
+++++
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস