August 25, 2026, 6:53 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
পত্রিকান্তরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবন, বাসাভাড়া এবং শিক্ষার্থীদের আবাসিক সংকট নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বক্তব্যে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত আবাসিক ভবনগুলোর ভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অনেকেই সেখানে বসবাস করেন না। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবাসিক সুবিধাও সীমিত। ফলে খালি থাকা এসব ভবন নারী শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য ব্যবহার করা যায় কি না, সে বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বিষয়টি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট সমাধান করা যেমন জরুরি, তেমনি একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত আবাসনব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। তবে পুরো বিষয়টি বিচার করতে হলে শুধু ‘ভাড়া বেশি’ বা ‘ভবন খালি’—এই দুই তথ্যের ওপর নির্ভর না করে সমস্যাটির কাঠামোগত কারণগুলোও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
ভাড়া বেশি—কেন?
শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবনে ভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়াকে যদি সেখানে বসবাস না করার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে প্রথমেই প্রশ্ন আসে—এই ভাড়া নির্ধারিত হয় কীভাবে?
ক্যাম্পাসে নির্মিত আবাসিক বাসা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পদ। ফলে সেখানে বসবাসের ব্যয় এবং একজন শিক্ষক বা কর্মকর্তার বাইরে ভাড়া বাসায় থাকার ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আবাসিক ভবনে থাকার অর্থনৈতিক সুবিধা এতটাই কমে যায় যে একজন শিক্ষক বা কর্মকর্তা বাইরে বসবাস করাকেই বেশি সুবিধাজনক মনে করেন, তাহলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের প্রশ্ন নয়; আবাসন নীতির কার্যকারিতার প্রশ্নও হয়ে দাঁড়ায়।
সুতরাং ‘ভাড়া বেশি’—এটিকে সমস্যার শেষ কথা হিসেবে না দেখে, ভাড়ার কাঠামোটি পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন কি না, সেটিও আলোচনায় আসা উচিত।
খালি বাসা মানেই কি পর্যাপ্ত আবাসন?
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবনের কিছু ইউনিট খালি থাকলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আবাসন সংকট নেই।
একদিকে কিছু বাসা খালি থাকতে পারে, অন্যদিকে মোট শিক্ষক-কর্মকর্তার তুলনায় আবাসিক ইউনিটের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুলও হতে পারে। একই সঙ্গে বাসার অবস্থান, আকার, ভাড়া, সুযোগ-সুবিধা, বরাদ্দের নিয়ম এবং যোগ্যতার শর্ত—এসবও বসবাসের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
অতএব, ‘কিছু বাসা খালি’ এবং ‘শিক্ষক-কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত আবাসন রয়েছে’—দুটি বিষয়কে একই অর্থে দেখা ঠিক হবে না।
এই পার্থক্যটি নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা কতটা প্রাসঙ্গিক?
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সেই ধারণার সঙ্গে শুধু শিক্ষার্থীদের হলে থাকার বিষয়টি নয়, বরং একটি সমন্বিত ক্যাম্পাস-জীবনের ধারণাও যুক্ত।
আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের একটি অংশ একই ক্যাম্পাসে অবস্থান করলে শিক্ষা কার্যক্রম শ্রেণিকক্ষের বাইরেও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। হল প্রশাসন, শিক্ষার্থীদের পরামর্শ, গবেষণা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রেও ক্যাম্পাসে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলকভাবে ক্যাম্পাসে থাকতে হবে। পরিবার, সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, সামাজিক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনসহ বিভিন্ন বাস্তব কারণ একজন মানুষের আবাসন পছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—বিশ্ববিদ্যালয় কি তার আবাসিক চরিত্রকে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও কার্যকর রাখতে চায়?
যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে তাদের ক্যাম্পাসে বসবাসকে বাস্তবসম্মত ও আকর্ষণীয় করার জন্য উপযুক্ত নীতি থাকা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট: সমাধান কোথায়?
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সুবিধা যদি শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় অপর্যাপ্ত হয়, তাহলে নতুন আবাসন তৈরি করা কিংবা বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এখানেই শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবন পুনর্ব্যবহারের প্রস্তাবটির যৌক্তিকতা তৈরি হতে পারে।
যদি কোনো ভবন দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে থাকে, তার বর্তমান ব্যবহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয় এবং সেটিকে শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহার করা বাস্তবসম্মত হয়, তাহলে সেই সম্ভাবনা বিবেচনা করা অযৌক্তিক নয়।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিও দেখতে হবে, ভবনটি কেন খালি রয়েছে এবং সেই কারণটি দূর করা সম্ভব কি না।
কারণ একটি সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে ভবনের ব্যবহার পরিবর্তন করা এবং সমস্যাটির মূল কারণ সমাধান করা—দুটি ভিন্ন বিষয়।
‘ভবন খালি’ থেকে ‘ভবন রূপান্তর’—মাঝখানের প্রশ্নগুলো
এখানে একটি ধারাবাহিক প্রশ্ন তৈরি হয়:
ভাড়া বেশি কেন?
* ভাড়া বেশি হওয়ার কারণে শিক্ষক-কর্মকর্তারা কি বাসা ছেড়ে দিচ্ছেন?
* ভাড়া কমালে বা আবাসন নীতি পরিবর্তন করলে তাঁরা আবার ক্যাম্পাসে ফিরবেন কি না?
*বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চরিত্র বজায় রাখতে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ক্যাম্পাসে থাকার প্রয়োজন কতটা?
*খালি থাকা বাসাগুলো স্থায়ীভাবে খালি থাকবে, নাকি সাময়িকভাবে খালি?
* শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট কতটা তীব্র?
* নতুন হল নির্মাণের তুলনায় বিদ্যমান ভবন রূপান্তর কতটা কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী?
*ভবন রূপান্তর করলে ভবিষ্যতে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আবাসনের প্রয়োজন হলে তার ব্যবস্থা কী হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধু ভবন খালি থাকার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ভবিষ্যতে নতুন ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
নারী শিক্ষার্থীদের আবাসনের প্রসঙ্গ
নারী শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য ভবন ব্যবহার করার প্রস্তাবটিরও বাস্তব দিক রয়েছে। যদি কোনো ভবন উপযুক্ত অবস্থায় থাকে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, স্যানিটেশন, পানি, বিদ্যুৎ, যাতায়াত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য সেটি ব্যবহার করা একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে।
তবে আবাসিক ভবনের ব্যবহার পরিবর্তনের আগে কার জন্য ভবনটি নির্মিত হয়েছিল, সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি ভবনটির নকশা, অবস্থান ও অবকাঠামো শিক্ষার্থীদের আবাসিক ব্যবহারের উপযোগী কি না, সেটিও কারিগরি ও প্রশাসনিকভাবে যাচাই করা দরকার।
অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের জন্য ভবন ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা যেমন বাস্তব, তেমনি সেই রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
সমস্যাটি ব্যক্তি নয়, নীতির
এই বিতর্ককে কোনো ব্যক্তি বা একটি বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে সীমাবদ্ধ না রেখে নীতিগতভাবে দেখা বেশি কার্যকর।
একজন শিক্ষক বা কর্মকর্তা বেশি ভাড়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় থাকছেন না—এটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে। কিন্তু যদি একই কারণে অনেকগুলো আবাসিক ইউনিট দীর্ঘদিন খালি থাকে, তাহলে সেটি আর কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকে না; তখন এটি প্রাতিষ্ঠানিক নীতির বিষয় হয়ে যায়।
একইভাবে, শিক্ষার্থীরা আবাসন সংকটে থাকলে সেটিও শুধু শিক্ষার্থীদের সমস্যা নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ।
তাই সমাধানও হওয়া উচিত সামগ্রিক।
সম্ভাব্য ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান
বিষয়টি নিয়ে একটি নিরপেক্ষ নীতিগত সমাধান হতে পারে কয়েকটি ধাপে এগোনো।
প্রথমত, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবনের ভাড়া নির্ধারণের পদ্ধতি ও প্রকৃত ব্যয় পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, কতটি বাসা খালি, কতটি বরাদ্দযোগ্য, কতটি মেরামত প্রয়োজন এবং কতজন শিক্ষক-কর্মকর্তা আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত—তার একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভিত্তিক জরিপ করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ক্যাম্পাসে থাকার প্রয়োজনীয়তা এবং এর জন্য কী ধরনের প্রণোদনা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
চতুর্থত, যেসব ভবন বাস্তবিক অর্থেই দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আবাসন হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয় বা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত, সেগুলোর বিকল্প ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে।
পঞ্চমত, শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নতুন হল নির্মাণ ও বিদ্যমান হলগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনাও সমান্তরালে নেওয়া প্রয়োজন।
শেষ কথা
শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট সমাধান করা জরুরি—এ বিষয়ে দ্বিমত থাকার কথা নয়। একইভাবে খালি পড়ে থাকা সরকারি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাও যৌক্তিক।
তবে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত আবাসিক ভবন খালি থাকার কারণ যদি মূলত উচ্চ ভাড়া বা আবাসন নীতির অসামঞ্জস্য হয়, তাহলে শুধু ভবনের ব্যবহার পরিবর্তন করাই সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয়।
বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত—
কেন একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ব্যবস্থা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত বাসা খালি থাকে, আবার শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য নতুন জায়গার প্রয়োজন হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে হয়তো দেখা যাবে, সমস্যাটি ভবনের স্বল্পতা বা অতিরিক্ততার চেয়ে বেশি—সমস্যাটি হলো আবাসন পরিকল্পনা, ভাড়া নির্ধারণ, ক্যাম্পাস ব্যবস্থাপনা এবং আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাকে বাস্তবে কতটা কার্যকর করা হয়েছে।
সুতরাং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবন শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহার করা হবে কি না—এই সিদ্ধান্তের আগে তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন, অংশীজনদের মতামত এবং দীর্ঘমেয়াদি বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনা বিবেচনায় নেওয়াই অধিক যুক্তিসঙ্গত। এতে শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটের সমাধানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চরিত্রও অযথা দুর্বল হবে না।