October 20, 2026, 4:22 am

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
লালনের মানবতাবাদী দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বানে শেষ হলো তিন দিনের তিরোধান দিবসের আয়োজন অর্থ লেনদেনের কোন প্রশ্নই উঠে না, কুষ্টিয়া যুবদল সভাপতির সংবাদ সম্মেলন কুষ্টিয়াতে আওয়ামী লীগের সাবেক দুই এমপির বিরুদ্ধে দুদকের মামলা অনুমোদন খোকসায় বেকারির ওভেন বিস্ফোরণে প্রধান মিস্ত্রি নিহত, দগ্ধ ২ লালনের শিক্ষা স্কুলে পৌঁছে দিতে চান প্রধানমন্ত্রী: তথ্য উপদেষ্টা তিরোধান দিবসের ভাবগাম্ভীর্যে ছেঁউড়িয়ায় হয়েছে তিনদিনের লালন মেলা কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণির হাজার শিক্ষার্থীর নবীনবরণ মক্কার মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, দুই বাংলাদেশী নারী-পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর রূপপুরে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা স্থাপন, পর্যবেক্ষণে ২০ হাজার যন্ত্রপাতি সমাবর্তনের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে সকল কমিটিকে নির্দেশনা উপাচার্যের

উৎপাদন বাড়লেও কেজিতে ২০০ টাকা ছাড়াল সুগন্ধি চাল, রপ্তানি-মজুত নিয়ে প্রশ্ন

তাকিয়া আফরোজ সাদিয়া/
একসময় পারিবারিক অনুষ্ঠান, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা বিশেষ দিনের খাবারের সঙ্গে পোলাও ছিল প্রায় অবিচ্ছেদ্য। সাধারণ মানুষের রান্নাঘরেও বিশেষ উপলক্ষে সহজেই জায়গা করে নিত সুগন্ধি চিনিগুঁড়া বা পোলাওর চাল। কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন ভালো মানের প্যাকেটজাত পোলাওর চাল কিনতে কেজিপ্রতি গুনতে হচ্ছে ২১০ থেকে ২৩০ টাকা। খোলা চালও বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়।
প্রশ্ন হলো, দেশে যেখানে সুগন্ধি চালের উৎপাদন রয়েছে এবং চিনিগুঁড়া ধানের আবাদও কমেনি, সেখানে পোলাওর চাল কেন হঠাৎ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে?
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু উৎপাদন বা সরবরাহের হিসাব দিয়ে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন। কারণ, চলতি বছর দিনাজপুরে চিনিগুঁড়া ধানের আবাদ প্রায় আগের বছরের সমান রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ২ লাখ ৬০ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে চিনিগুঁড়া চাষ হয়েছে প্রায় ৯৫ হাজার হেক্টরে, যা গত বছরের তুলনায় সামান্য বেশি।
অর্থাৎ, উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে বাজারে এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—এমন প্রমাণ স্পষ্ট নয়। বরং বাজারে এখন আলোচনা ঘুরছে রপ্তানি অনুমোদন, বড় মিল ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মজুত এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে।
চলতি অর্থবছরে দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৫ হাজার ৩২০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগের অর্থবছরে অনুমোদনের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৯৫৯ টন। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানির অনুমোদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
এই তথ্যকে সামনে রেখে খুচরা ব্যবসায়ীদের একাংশ বলছেন, রপ্তানির সুযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় বাজারে সুগন্ধি চালের দাম দ্রুত বেড়েছে। রপ্তানির জন্য চাল সংগ্রহ করতে গিয়ে বড় ব্যবসায়ীরা বেশি দামে ধান ও চাল কিনছেন, যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাজারে।
তবে রপ্তানিকারকদের দাবি ভিন্ন। তাদের হিসাবে, দেশে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন বা তারও বেশি সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়, যেখানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন। ফলে কয়েক হাজার টন চাল রপ্তানি করলেই বাজারে সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয়। গত এক মাসে প্রায় ২ হাজার টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
যদি রপ্তানি একমাত্র কারণ না হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—চাল কোথায় যাচ্ছে?
বাজারের একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, উৎপাদন মৌসুমেই বড় মিল ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল পরিমাণ ধান সংগ্রহ করে গুদামে রেখেছে। পরে বাজারে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে ধীরে ধীরে চাল ছাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রকৃত উৎপাদন পর্যাপ্ত থাকলেও খুচরা বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বেড়ে যেতে পারে।
এই অভিযোগ সত্য হলে সমস্যাটি শুধু পোলাওর চালের নয়; এটি দেশের কৃষিপণ্য বাজার ব্যবস্থাপনার একটি বড় দুর্বলতারও প্রতিফলন। কৃষক যখন ধান বিক্রি করেন, তখন বাজারে দাম তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু সেই ধান মিল, গুদাম ও মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে কয়েক মাস পর চালের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি লাভবান হন উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন এমন বাজারের শক্তিশালী অংশীদাররা।
বর্তমান বাজারে এক মাসের ব্যবধানে ভালো মানের চিনিগুঁড়া চালের ৫০ কেজির বস্তার দাম প্রায় ৭ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৯ হাজার ৫০০ টাকায় উঠেছে। অর্থাৎ, পাইকারি পর্যায়েই প্রতি বস্তায় বেড়েছে প্রায় ২ হাজার টাকা। সেই প্রভাব সরাসরি পড়েছে ভোক্তার ওপর।
এ পরিস্থিতিতে শুধু রপ্তানিকে দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আবার রপ্তানির অনুমোদন বাড়িয়ে বাজারে তার প্রভাব পর্যবেক্ষণ না করলেও সংকট আরও বাড়তে পারে। প্রয়োজন উৎপাদন, মজুত, রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহের একটি স্বচ্ছ হিসাব।
সুগন্ধি চাল বাংলাদেশের একটি বিশেষ কৃষিপণ্য। এর আন্তর্জাতিক বাজার রয়েছে, কৃষকের জন্য রপ্তানি নতুন সুযোগও তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ যদি দেশের সাধারণ ভোক্তার জন্য পোলাওকে বিলাসী খাবারে পরিণত করে, তাহলে রপ্তানি নীতির সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজার সুরক্ষার ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
চিনিগুঁড়ার দেশে শেষ পর্যন্ত পোলাও সাধারণ মানুষের খাবার হিসেবেই থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে তা শুধু বিশেষ অনুষ্ঠান ও উচ্চবিত্তের টেবিলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে—বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এখন সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net