October 17, 2026, 9:54 pm

শুভব্রত আমান/
বাউল সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে উচ্চ মর্যাদায় তুলে আনেন ফকির লালন :সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী
ভাব গাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ঐতিহাসিক লালন স্মরণোৎসব ও মেলা।
দেশ-বিদেশের লালনভক্ত, সাধু-বাউল, শিল্পী ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় কালিগঙ্গা তীরে ঐতিহাসিক আখড়া বাড়িতে সৃষ্টি হয়েছে প্রাণবন্ত পরিবেশ। তবে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি পুরো আয়োজনজুড়ে রয়েছে সাঁইজির স্মরণে গভীর শ্রদ্ধা, আধ্যাত্মিকতা ও তিরোধান দিবসের ভাবগাম্ভীর্য।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এবং লালন একাডেমির আয়োজনে স্মরণোৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। লালন একাডেমির মূল মঞ্চে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি তৌহিদ বিন হাসান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান। মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. রশিদুন্নবী। এ ছাড়া সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মোছা. ফরিদা ইয়াসমিন, সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী ও কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য দেন।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় সংস্কৃতি মন্ত্রী বলেন, বাংলার কোন এক অজপাড়া গায়ে জন্ম নেয়ায় লালন এখন শুধু বাংলা সংস্কৃতির সম্পদ নয়। লালন ও লালনের সমগ্র সৃষ্টি এখন বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত।
মন্ত্রী বলেন, তিনি এখন শুধু বাঙালির নন তিনি সারা বিশ্বের। মানবতাবাদ অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও জাতপাত এর উর্ধ্বে উঠে লালন যে সংস্কৃতির বলই তৈরি করেছেন তা বিশ্বের দরবারে বাংলা সংস্কৃতিকে অনেক ঊর্ধ্বে তুলে দেয়।
তিনি বলেন, লালন সাঁইয়ের স্মরণে আয়োজিত এ উৎসব কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি বাঙালির মরমি সাধনা, মানবতাবাদী দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য মিলনমেলা। জাতি-ধর্ম-বর্ণের বিভেদ অতিক্রম করে মানুষকে ভালোবাসার যে শিক্ষা লালন তাঁর গান ও সাধনার মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন, সেই দর্শনই স্মরণোৎসবের মূল প্রেরণা। তাঁর কালজয়ী গান ও জীবনদর্শন আজও মানুষকে আত্মঅনুসন্ধান, মানবপ্রেম ও সম্প্রীতির পথে আহ্বান জানায়।
আলোচনা সভা শেষে সন্ধ্যা থেকে লালন একাডেমির শিল্পীবৃন্দ ও দেশের খ্যাতনামা লালনসংগীতশিল্পীরা একের পর এক গান পরিবেশন করেন। সাঁইজির মরমি গানের সুরে মুখর হয়ে ওঠে আখড়াবাড়ির প্রাঙ্গণ। অন্যদিকে আখড়াবাড়ির বিভিন্ন স্থানে সাধু-বাউলদের সাধুসঙ্গ ও গানের আসর বসেছে। কোথাও চলছে লালনদর্শন নিয়ে আলোচনা, কোথাও আবার সুর ও সাধনার মধ্য দিয়ে তাঁকে স্মরণ করছেন ভক্ত-অনুরাগীরা। সব মিলিয়ে ছেঁউড়িয়ায় গড়ে উঠেছে ভক্তি, সাধনা ও লোকজ সংস্কৃতির এক অনন্য আবহ।
এদিকে স্মরণোৎসবকে কেন্দ্র করে কালীগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে বসেছে ঐতিহ্যবাহী লালন মেলা। মেলায় লোকজ পণ্য, গ্রামীণ ঐতিহ্য ও নানা ধরনের সামগ্রীর পসরা নিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। দর্শনার্থীদের আনাগোনায় মেলাপ্রাঙ্গণেও উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে মেলার কোলাহলের পাশাপাশি আখড়াবাড়িতে লালন স্মরণের আধ্যাত্মিক পরিবেশ ও দিবসটির গাম্ভীর্য বজায় রয়েছে।
উৎসবে আগত ভক্তদের কাছে ছেঁউড়িয়া কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয়, বরং লালনের সাধনা, সংগীত ও মানবমুক্তির দর্শনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পবিত্র প্রাঙ্গণ। প্রতিবছর তিরোধান দিবসে এখানে সমবেত হয়ে তাঁরা লালনের গান গেয়ে, তাঁর দর্শন চর্চা করে এবং সাধুসঙ্গে অংশ নিয়ে মরমি সাধকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
স্মরণোৎসব ও মেলাকে নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থা। আখড়াবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। উৎসবে আগত দর্শনার্থী ও ভক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
আগামী ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে তিন দিনব্যাপী এ স্মরণোৎসব ও মেলা। লালনসংগীত, সাধুসঙ্গ, আলোচনা ও লোকজ আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবের প্রতিটি পর্বে স্মরণ করা হবে মানবতাবাদী সাধক ফকির লালন শাহকে। উৎসবের আনন্দ আর তিরোধান দিবসের গভীর শ্রদ্ধা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে ছেঁউড়িয়া আবারও হয়ে উঠেছে বাংলার মরমি সংস্কৃতি ও মানবিক দর্শনের এক অনন্য মিলনকেন্দ্র।