November 3, 2026, 9:57 pm

ড. আমানুর আমান
পদ্মা নদী বাংলাদেশের ভূগোলের একটি বাস্তবতা, আবার একই সঙ্গে এটি আমাদের অর্থনীতি ও জনজীবনের এক দীর্ঘ পরীক্ষার নাম। এই নদী কখনো মানুষকে বিচ্ছিন্ন করেছে, কখনো বাণিজ্যের পথ রুদ্ধ করেছে, আবার কখনো তার বুক চিরে এগিয়ে যাওয়ার সাহসী স্বপ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। একসময় পদ্মার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়া দীর্ঘ ছিল একটি অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির নাম। প্রথম পদ্মা সেতু সেই বাস্তবতায় ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনেছে। এখন সময় এসেছে পদ্মার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ করিডরকে নতুন সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করার।
দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর আলোচনা তাই কেবল আরেকটি সেতু নির্মাণের আলোচনা নয়। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য একটি অবকাঠামোগত বিপ্লব।
মঙ্গলবারের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বৈঠকে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে ওয়াই-আকৃতির সংযোগব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দ্বিতীয় পদ্মা ও দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বর্তমানে চলমান এবং আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে তা শেষ হওয়ার কথা। সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর অবস্থান, নকশা ও প্রকল্প ব্যয়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এখানে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, তবে বাস্তবতাকে ভুলে যাওয়ারও সুযোগ নেই। একটি সেতু নির্মাণের স্বপ্ন আর একটি সেতু নির্মাণের বাস্তব প্রকল্প—দুটি এক জিনিস নয়। অর্থায়ন, নদীর গতিপ্রকৃতি, পরিবেশগত প্রভাব, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন, সংযোগ সড়ক, রেল যোগাযোগ, নির্মাণ ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল—সবকিছুর সমন্বিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। আর সে কারণেই সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ফলাফলকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
কিন্তু এই সতর্কতার মধ্যেও দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
প্রস্তাবিত দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া করিডরটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি বিস্তৃত জনপদের জন্য রাজধানীমুখী যোগাযোগের নতুন পথ তৈরি হবে। ইতোমধ্যে এ রুটকে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর অন্যতম সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এর গুরুত্ব বুঝতে হলে শুধু মানচিত্রের দিকে তাকালেই হবে না; তাকাতে হবে মানুষের জীবনের দিকে।
রাজবাড়ী, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য রাজধানীর সঙ্গে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ অর্থনীতির অন্যতম পূর্বশর্ত। একটি পণ্য উৎপাদনের পর বাজারে পৌঁছাতে কত সময় লাগে, একজন রোগী কত দ্রুত উন্নত চিকিৎসার কাছে পৌঁছাতে পারেন, একজন শিক্ষার্থী বা চাকরিপ্রার্থী কত সহজে রাজধানী বা অন্য শহরে যেতে পারেন—এসব প্রশ্নের উত্তর বদলে দিতে পারে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা।
সেতু কখনো শুধু নদী পার হওয়ার অবকাঠামো নয়। সেতু আসলে সময়ের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম।
যে পথ যেতে আগে কয়েক ঘণ্টা বেশি লাগত, সেটি যদি কম সময়ে অতিক্রম করা যায়, তাহলে শুধু যাত্রীর সময় বাঁচে না; পণ্য পরিবহনের খরচ কমে, বাজার সম্প্রসারিত হয়, বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ে, কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছায় এবং শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। অর্থনীতির ভাষায় এর অর্থ হলো—একটি সেতু তার নির্মাণব্যয়ের বাইরেও বহু গুণ অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করতে পারে।
এই জায়গাতেই দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে গতি তৈরি হয়েছে, তার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ আমরা ইতোমধ্যে পেয়েছি। রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের দূরত্ব শুধু কিলোমিটারে কমেনি; কমেছে মানসিক দূরত্বও। ব্যবসায়ী, পর্যটক, বিনিয়োগকারী, কৃষক, শিক্ষার্থী—সবাই নতুন যোগাযোগব্যবস্থার সুফল পাচ্ছেন। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মিত হলে সেই পরিবর্তনের আরেকটি বিস্তৃত অধ্যায় শুরু হতে পারে।
বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও বহুমাত্রিক হতে পারে। আজকের বৈঠকেও বলা হয়েছে, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু হলে রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং বেনাপোল ও দর্শনা স্থলবন্দরের সঙ্গে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হতে পারে।
এখানে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে।
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক হতে পারে না। আমাদের সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর, শিল্পাঞ্চল, কৃষি উৎপাদন অঞ্চল এবং আঞ্চলিক বাজারগুলোকে একটি কার্যকর যোগাযোগ নেটওয়ার্কের মধ্যে আনতে হবে। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু সেই নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
মোংলা বন্দরের সক্ষমতা যত বাড়বে, তত বেশি প্রয়োজন হবে দ্রুত ও বিকল্প সড়ক যোগাযোগের। একইভাবে বেনাপোল ও দর্শনা দিয়ে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও গতিশীল করতে হলে নির্ভরযোগ্য পরিবহন অবকাঠামো প্রয়োজন। একটি নতুন পদ্মা করিডর সেই বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংযোগকে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে এখানে একটি কথা অত্যন্ত জরুরি—শুধু সেতু নির্মাণ করলেই কাঙ্ক্ষিত বিপ্লব আসবে না।
সেতুর দুই প্রান্তের সংযোগ সড়ক, মহাসড়কের সক্ষমতা, রেল যোগাযোগ, লজিস্টিকস, বন্দর অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল, পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা এবং নগর পরিকল্পনাকে একই সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। একটি আধুনিক সেতু যদি দুর্বল সংযোগ সড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তার পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে না। তাই দ্বিতীয় পদ্মা সেতুকে একটি বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডর হিসেবে দেখতে হবে।
এখানেই সরকারের সামনে বড় সুযোগ।
দ্বিতীয় পদ্মা সেতু যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে শুধু রাজধানী থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ ঢাকায় আসবে—এমন সরল সমীকরণে থেমে থাকলে চলবে না। বরং ঢাকার বিনিয়োগ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাবে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপণ্য ও শিল্পপণ্য দ্রুত রাজধানী ও আন্তর্জাতিক বাজারে যাবে, নতুন শিল্প গড়ে উঠবে, স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়বে এবং আঞ্চলিক শহরগুলোর গুরুত্বও বাড়তে পারে।
একটি ভালো অবকাঠামো আসলে উন্নয়নের ভূগোল পরিবর্তন করে।
পদ্মা সেতুর সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই। একটি সেতু নির্মাণের পর তার আশপাশে শুধু যানবাহন বাড়ে না; বদলে যায় জমির ব্যবহার, ব্যবসার ধরন, মানুষের চলাচল, বিনিয়োগের মানসিকতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নের পরিধি। দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রেও এমন একটি বহুমাত্রিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই সেতুর জন্য দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার কথাটিও ভুলে গেলে চলবে না। বছরের পর বছর ধরে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া অঞ্চলের মানুষ একটি স্থায়ী সেতুর প্রত্যাশা করে আসছেন। তাদের কাছে এটি কেবল জাতীয় অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রয়োজন।
তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এখন সবচেয়ে প্রয়োজন বাস্তববাদী অগ্রগতি। কোনো প্রকল্পকে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পর্যায়ে আটকে না রেখে প্রকৌশলগত বাস্তবতা, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও পরিবেশগত বিবেচনার ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে। আর যদি সমীক্ষায় প্রকল্পটি বাস্তবসম্মত প্রমাণিত হয়, তাহলে অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
কারণ উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শত্রু শুধু অর্থের অভাব নয়; দীর্ঘসূত্রতাও।
বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অবকাঠামো উন্নয়নকে আর বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পদ্মা সেতু, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, দ্বিতীয় যমুনা সেতু, পদ্মা ব্যারেজ—এসব প্রকল্পের প্রত্যেকটির নিজস্ব গুরুত্ব আছে; কিন্তু তাদের সম্মিলিত প্রভাব আরও বড়। আজকের বৈঠকেও দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতুর পাশাপাশি পদ্মা ব্যারেজের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
অতএব দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু ‘সেতু হবে কি হবে না’—এখানে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—সেতুটি হলে আমরা এর সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সুফল কীভাবে নিশ্চিত করব?
আমার বিশ্বাস, যথাযথ পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা এবং বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন কৌশল থাকলে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
পদ্মা সেতু বাংলাদেশের মানুষকে দেখিয়েছে, বড় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু সেই স্বপ্নের পুনরাবৃত্তি নয়; বরং তার পরবর্তী বিবর্তন হতে পারে।
দক্ষিণাঞ্চলে পদ্মা সেতু যে উন্নয়নের আলো পৌঁছে দিয়েছে, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু সেই আলোকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আরও বিস্তৃত জনপদে ছড়িয়ে দিতে পারে। কৃষকের উৎপাদন থেকে উদ্যোক্তার বিনিয়োগ, শিক্ষার্থীর যাতায়াত থেকে রোগীর চিকিৎসা, বন্দর থেকে বাজার—সবকিছুকে একটি দ্রুততর ও কার্যকর যোগাযোগ নেটওয়ার্কের মধ্যে নিয়ে আসতে পারে এই অবকাঠামো।
এই কারণেই দ্বিতীয় পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতুর নাম নয়; এটি একটি সম্ভাব্য নতুন অর্থনৈতিক মানচিত্রের নাম।
দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে যদি একটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প মানুষের জীবনকে সহজ করে, অর্থনীতিকে গতিশীল করে এবং অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তবে সেটিই হবে প্রকৃত অর্থে মানুষের জন্য উন্নয়ন।
আর সেই অর্থে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু যদি বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়ায়, তাহলে সেটি শুধু পদ্মার ওপর আরেকটি সেতু হবে না—হয়ে উঠতে পারে পদ্মার ওপারে নতুন সম্ভাবনার এক দীর্ঘ সেতুবন্ধন।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক প্রকাশক ও মুদ্রাক্ষর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইম