October 30, 2026, 7:41 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
পাবনায় বজ্রপাতে ৬ জনের মৃত্যু, আহত ৩ রেল নিয়ে কথিত যশোর অঞ্চলের ছয় দফা আঞ্চলিক ভারসাম্যহীন, পদ্মা সেতুর সুবিধা কি শুধু যশোরের জন্য? রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ শুরু কুষ্টিয়ায় ডেঙ্গু সচেতনতায় সম্মিলিত সামাজিক জোট ও ডা. মানিকের যুগপৎ উদ্যোগ মহেশপুর সীমান্তে তিন ভারতীয় নাগরিকসহ আটক ৮ কুষ্টিয়ায় ছয় হত্যা: হানিফের মৃত্যুদণ্ড, তিন নেতার আমৃত্যু কারাদণ্ড ঢাকা মেট্রোরেল লাইন-১-এর দুটি প্যাকেজ পেল ভারতীয় এলঅ্যান্ডটি পদ্মার চরে কাকন-কালু পক্ষের গোলাগুলি, শতাধিক গুলির শব্দ শোনার দাবি জাল কাবিননামা তৈরির অভিযোগে কুষ্টিয়ায় আইনজীবী সহ দুই আসামির জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে প্রেরণ জাপান-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব হবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চালিকাশক্তি

রেল নিয়ে কথিত যশোর অঞ্চলের ছয় দফা আঞ্চলিক ভারসাম্যহীন, পদ্মা সেতুর সুবিধা কি শুধু যশোরের জন্য?

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের সামনে নতুন যোগাযোগ সম্ভাবনার স্বপ্ন তুলে ধরা হয়েছিল। সড়ক ও রেল যোগাযোগের উন্নয়নের মধ্য দিয়ে খুলনা বিভাগের সব জেলার মানুষের রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যাতায়াত সহজ হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে গতি আসবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু পদ্মা সেতুর রেলসংযোগ চালুর পর সেই প্রত্যাশার সুফল বণ্টন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে যশোরের রেল যোগাযোগ উন্নয়নের দাবিতে আন্দোলন এবং একসঙ্গে তিনটি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর প্রস্তাব সামনে আসায় বৃহত্তর খুলনা বিভাগের রেলসেবায় আঞ্চলিক ভারসাম্যের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
সম্প্রতি যশোরের একটি সংগঠন বেনাপোল-যশোর-ঢাকা এবং দর্শনা-কোটচাঁদপুর-যশোর-ঢাকা রুটে প্রভাতী ট্রেনসহ তিনটি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর দাবি জানিয়েছে। ২৭ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে প্রতীকী রেল অবরোধ করে রেলমন্ত্রী বরাবর ছয় দফা দাবিতে স্মারকলিপিও দিয়েছে বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি। তাদের দাবি, বর্তমানে যাতায়াতের সময়সূচি এমন যে সকালে ঢাকায় পৌঁছে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে একই দিন যশোরে ফিরে আসা কঠিন।
যাত্রীদের এই সমস্যার বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রেল যোগাযোগের উন্নয়ন কি কেবল যশোরকেন্দ্রিক দাবিদাওয়ার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে? খুলনা বিভাগের অন্য নয়টি জেলার মানুষের রেলযাত্রার প্রয়োজন, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চনার বিষয়গুলোও কি সমান গুরুত্ব পাবে?
পদ্মা সেতুর সুফল নিয়ে এক জেলার একক দাবি কেন?
খুলনা বিভাগে যশোর ছাড়াও খুলনা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, মাগুরা, নড়াইল, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট—নয়টি জেলা রয়েছে। এসব জেলার মানুষেরও রাজধানী, বিভাগীয় শহর এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী রেল যোগাযোগের প্রয়োজন রয়েছে। অথচ রেলসেবা, নতুন ট্রেন বরাদ্দ এবং যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের আলোচনায় সব জেলার চাহিদা সমানভাবে সামনে আসে না।
যশোরের আন্দোলনকারীরা তিনটি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর দাবি তুলেছেন। কিন্তু একই সময়ে অন্য জেলাগুলোর যাত্রীদের প্রয়োজন নিয়ে তেমন সমন্বিত আঞ্চলিক দাবি বা আলোচনার দৃশ্যমানতা নেই। বিশেষ করে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মেহেরপুরের মানুষের যোগাযোগের প্রয়োজনও কোনো অংশে কম নয়। মাগুরা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের মতো জেলাগুলোর রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের প্রশ্নও দীর্ঘদিনের।
ফলে একটি জেলার সংগঠিত আন্দোলন যেন পুরো অঞ্চলের রেল উন্নয়নের অগ্রাধিকার নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে না দাঁড়ায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো জেলা দাবি তুলেছে বলেই সেই দাবি অগ্রাধিকার পাবে, আর অন্য জেলার মানুষ সংগঠিত আন্দোলন করতে পারেনি বলে তাদের প্রয়োজন উপেক্ষিত থাকবে—এমন নীতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বর্তমান ট্রেন যোগাযোগের বাস্তব চিত্র
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের আন্তঃনগর ট্রেনের সময়সূচিতে দেখা যায়, খুলনা-রাজশাহী রুটের কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস যশোর, মোবারকগঞ্জ, কোটচাঁদপুর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ার বিভিন্ন স্টেশন হয়ে চলাচল করে। খুলনা-ঢাকা রুটের সুন্দরবন এক্সপ্রেসও যশোর, ঝিনাইদহের মোবারকগঞ্জ ও কোটচাঁদপুর, চুয়াডাঙ্গা এবং কুষ্টিয়া অঞ্চলের যাত্রীদের সেবা দেয়। অন্যদিকে নতুন জাহানাবাদ এক্সপ্রেস পদ্মা সেতু হয়ে খুলনা-ঢাকা রুটে নড়াইলের সিংগিয়া ও অন্যান্য স্টেশনের যাত্রীদের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে।
অর্থাৎ রেল যোগাযোগের বিদ্যমান নেটওয়ার্কও একাধিক জেলার মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত। নতুন ট্রেন চালু বা সময়সূচি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসব রুটের যাত্রীদের সামগ্রিক চাহিদা বিবেচনা করা জরুরি।
যশোরের দাবির মধ্যে বেনাপোল ও দর্শনা সীমান্ত থেকে নতুন ট্রেন চালুর পাশাপাশি সাধারণ বগি সংযোজন, কৃষিপণ্য পরিবহন, কম ভাড়ায় যাতায়াত এবং দর্শনা-খুলনা রুটে ডাবল লাইন নির্মাণের বিষয়ও রয়েছে। এগুলোর কয়েকটি কেবল যশোরের নয়, বৃহত্তর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সীমান্তবাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং ডাবল লাইন নির্মাণ আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, নতুন কোচ ও ইঞ্জিনের সীমিত সক্ষমতার মধ্যে তিনটি নতুন ট্রেন চালুর দাবি বাস্তবায়ন করতে হলে কোন রুটে কত যাত্রী পাওয়া যাবে, কোন সময়সূচিতে সবচেয়ে বেশি মানুষ উপকৃত হবেন এবং কোন জেলায় রেলসেবা সম্প্রসারণের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি—এসব বিষয়ে কি কোনো সমন্বিত সমীক্ষা রয়েছে?
রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা
পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ প্রকল্পটির জন্য তৎকালীন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন—এমন রাজনৈতিক বক্তব্য বিভিন্ন সময়ে এসেছে। কিন্তু সেতু নির্মাণের কৃতিত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই অবকাঠামোর সুফল কতটা সমানভাবে জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছে।
একটি বড় অবকাঠামো নির্মাণের পর তার ব্যবহার ও সুবিধা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে যশোরের মানুষ যেমন দাবি জানাতে পারেন, তেমনি খুলনা বিভাগের অন্য জেলার মানুষও সমান অধিকার রাখেন। কোনো জেলার দাবিকে খাটো করা যেমন উচিত নয়, তেমনি একটি জেলার দাবি পূরণ করতে গিয়ে অন্য জেলার প্রয়োজনকে আড়াল করাও সমর্থনযোগ্য নয়।
রেলওয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক প্রভাব, আঞ্চলিক পরিচিতি কিংবা কোনো সংগঠনের আন্দোলনের শক্তির চেয়ে যাত্রীসংখ্যা, সম্ভাব্য আয়, সামাজিক প্রয়োজন, অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং যোগাযোগবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বাস্তব পরিস্থিতি বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
কোথায় আঞ্চলিক সমন্বয়?
খুলনা বিভাগের ১০ জেলার জন্য একটি সমন্বিত রেল যোগাযোগ পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি। কোন জেলায় প্রতিদিন কত যাত্রী রেলপথ ব্যবহার করেন, কোথায় টিকিটের চাহিদা বেশি, কোন রুটে ট্রেনের আসনসংকট রয়েছে, কোন এলাকায় নতুন রেললাইন বা স্টেশন প্রয়োজন এবং কোন রুটে নতুন ট্রেন চালালে সবচেয়ে বেশি মানুষ উপকৃত হবেন—এসব তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে যেসব জেলায় এখনো পর্যাপ্ত রেল যোগাযোগ নেই, সেসব জেলার জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শুধু আন্তঃনগর ট্রেন বাড়ানো নয়, কমিউটার, লোকাল ও সাধারণ যাত্রীসেবার উন্নয়নও জরুরি। কারণ রেল যোগাযোগের সুবিধা কেবল বড় শহরের ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী কিংবা উচ্চ ও মধ্যবিত্ত যাত্রীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে গণপরিবহন হিসেবে রেলের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
রেলওয়ের কাছে তাই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাশিত: যশোরের তিনটি নতুন ট্রেনের দাবির পক্ষে যাত্রী ও আয়সংক্রান্ত সমীক্ষা কী বলছে? খুলনা বিভাগের অন্য নয়টি জেলার জন্য কী পরিকল্পনা রয়েছে? নতুন কোচ বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোন মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে? পদ্মা সেতু রেলসংযোগের সুফল সব জেলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে কি?
যশোরের মানুষ ট্রেন চাইবেন, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দাবি যেন বৃহত্তর অঞ্চলের অন্য মানুষের প্রয়োজনকে ছাপিয়ে না যায়। পদ্মা সেতু কোনো এক জেলার সম্পদ নয়; এটি জাতীয় বিনিয়োগ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সম্মিলিত সম্ভাবনার প্রতীক। তাই এর রেল যোগাযোগের সুফলও হতে হবে আঞ্চলিক বৈষম্যহীন ও জনস্বার্থভিত্তিক।
এক জেলার আন্দোলন নয়, দশ জেলার মানুষের প্রয়োজনকে সামনে রেখেই খুলনা বিভাগের রেল যোগাযোগের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net