November 7, 2026, 2:10 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস/ ইতিহাসের বাঁকবদল ও রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের উত্থান শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য ও আদর্শে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কাজ চলছে: উপাচার্য প্রাথমিক শিক্ষায় ৪১ হাজার কোটি টাকা: বরাদ্দের অঙ্ক নয়, শিক্ষার মানই হোক সাফল্যের মাপকাঠি ষড়যন্ত্রকারীদের ২০২৪ সালের মতোই জনগণ উচিত জবাব দেবে: প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণ এশিয়ার চার প্রতিবেশীর চেয়ে বাংলাদেশে এলপিজির দাম বেশি দ্বিতীয় পদ্মা সেতু: বৈরী স্রোত পেরিয়ে তৈরি করবে আরেক বদলে যাওয়া বাংলাদেশ এলপিজির দাম সমন্বয় হোক, কিন্তু মানুষের জীবনকে অসমন্বিত রেখে নয় ২৮ বছরের ছাত্ররাজনীতি, ছেলের এইচএসসি পাসের পোস্ট ঘিরে আলোচনা; বিলুপ্ত চুয়াডাঙ্গা ছাত্রদলের কমিটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র: জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার পাঁচ সপ্তাহের ক্ষণগণনা শুরু ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে সম্মিলিত সামাজিক জোটের মানবিক উদ্যোগে জেলা প্রশাসকের সন্তোষ প্রকাশ

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস/ ইতিহাসের বাঁকবদল ও রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের উত্থান

ড. আমানুর আমান

৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক তাৎপর্যপূর্ণ বাঁকবদলের দিন। নানা রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও ঐতিহাসিক বিতর্কের মধ্যেও এ দিনটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, জাতীয় সংহতি এবং নতুন রাজনৈতিক অভিযাত্রার স্মারক হয়ে আছে। বিশেষত শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের উত্থান এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে এ দিনটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

ইতিহাসের কিছু দিন কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ হয়ে থাকে না; একটি জাতির রাজনৈতিক গতিপথ, রাষ্ট্রচিন্তা ও ভবিষ্যৎ অভিযাত্রায় সেসব দিন গভীর ছাপ রেখে যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর তেমনই একটি দিন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত এ দিনটি স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে সংকটময় সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ দিনের ঘটনা ও তাৎপর্য নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে এর বিশেষ গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

৭ নভেম্বরকে যথাযথভাবে বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক বছরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন, প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক সংঘাত ও প্রশাসনিক দুর্বলতা রাষ্ট্র ও সমাজে গভীর অস্থিরতা তৈরি করে।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং পরবর্তী সময়ে বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এর ফলে বহুদলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর সংকুচিত হয়। এই রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই ১৫ আগস্ট একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি ছিল এক মর্মান্তিক ও কলঙ্কজনক অধ্যায়।

এরপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে শুরু হয় একের পর এক পরিবর্তন। খন্দকার মোশতাক আহমদের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ, ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, সামরিক শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্নে দেশ তখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।

এই অস্থিরতার মধ্যেই আসে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫।

৭ নভেম্বর: সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান ও নতুন নেতৃত্বের উত্থান/

৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তাঁর বাসভবনে অন্তরীণ রাখা হয়। ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের একটি অংশের বিদ্রোহ এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির তৎপরতায় পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। জিয়াউর রহমান মুক্ত হন এবং দ্রুত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তাঁর অবস্থান সুদৃঢ় হতে থাকে।

৭ নভেম্বরের ঘটনাকে ঘিরে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ভূমিকা, কর্নেল আবু তাহেরের রাজনৈতিক অভিপ্রায় এবং সৈনিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে এ দিনের ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং তাঁর নেতৃত্বের প্রতি সৈনিক ও সাধারণ মানুষের সমর্থনও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

তৎকালীন পরিস্থিতিতে দেশ এমন একজন নেতৃত্বের প্রত্যাশা করছিল, যিনি রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারবেন। মুক্তিযুদ্ধের একজন সম্মুখসারির সেনানায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমানের পরিচিতি, সাহসিকতা, শৃঙ্খলাবোধ এবং নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা তাঁকে সে সময়ের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ, একটি সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছিল। স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে তাঁর এই পরিচয় নতুন করে গুরুত্ব পায়। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ তাই শুধু একজন সেনা কর্মকর্তার মুক্তির ঘটনা ছিল না; এটি পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার গতিপথ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অবশ্য এ দিনের ঘটনাপ্রবাহ ছিল জটিল ও বহুমাত্রিক। খালেদ মোশাররফ, কর্নেল নাজমুল হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দারের মর্মান্তিক মৃত্যু ইতিহাসের বেদনাদায়ক অংশ। অন্যদিকে আবু তাহেরের বিপ্লবী রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর বিচার ও মৃত্যুদণ্ডও এ অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করতে হলে এসব ঘটনাকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করতে হবে।

জিয়াউর রহমান: সংকট থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অভিযাত্রা/

৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। সামরিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সামনে তখন প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, অর্থনীতিকে গতিশীল করা, প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং জনগণের মধ্যে আস্থা ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করা।

পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শনের বিকাশ, বেসরকারি উদ্যোগের সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।

১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে তিনি এমন একটি জাতীয় পরিচয়ের ধারণা সামনে আনেন, যেখানে বাংলাদেশের ভূখণ্ড, ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তাঁর শাসনামলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের সুযোগ সম্প্রসারিত হয়। সংবাদপত্র ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন পরিসর তৈরি হয়। যদিও সামরিক আইন ও সামরিক কর্তৃত্বের বাস্তবতা তাঁর শাসনব্যবস্থার একটি সীমাবদ্ধতা ছিল, তবু বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন কর্মসূচি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, জনসম্পৃক্ত উন্নয়ন কার্যক্রম এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে তিনি অর্থনীতিকে উৎপাদনমুখী করার চেষ্টা করেন। তাঁর স্বনির্ভর বাংলাদেশের ধারণায় কৃষি, শ্রম, উৎপাদন ও স্থানীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তাঁর সময় বাংলাদেশের অবস্থান নতুন মাত্রা পায়। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) প্রতিষ্ঠার ধারণার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ছিলেন তিনি। তাঁর এই উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

সব মিলিয়ে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার সময়কালকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

জাতীয় সংহতির প্রশ্ন ও ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য

৭ নভেম্বরকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে অভিহিত করার পেছনে রয়েছে একটি বিশেষ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। স্বাধীনতার পর নানা বিভক্তি, সংঘাত ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রাষ্ট্রীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এ দিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে দিনটি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের প্রতীক।

অন্যদিকে জাসদ দিনটিকে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান হিসেবে মূল্যায়ন করে। তাদের কাছে এটি ছিল প্রচলিত সামরিক কাঠামোর বৈষম্যের বিরুদ্ধে সৈনিকদের প্রতিবাদ এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিবর্তন আনার একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ। আওয়ামী লীগের দৃষ্টিভঙ্গিতে এ দিনের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড এবং সামরিক ক্ষমতার পালাবদলের বিষয়টি বিশেষভাবে যুক্ত।

এই ভিন্ন ব্যাখ্যাগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বহুমাত্রিকতাকেই তুলে ধরে। তবে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রীয় সংকটের মুহূর্তে জাতীয় ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি এ দিনের ইতিহাস থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ইতিহাসের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

ইতিহাসের নির্মোহ মূল্যায়ন মানে কোনো ব্যক্তির অবদান অস্বীকার করা নয়, আবার তাঁর সব কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নাতীত হিসেবে বিবেচনা করাও নয়। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনায়ক। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান, স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা, বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁর অবদান যথাযথ ঐতিহাসিক স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে।

একই সঙ্গে তাঁর শাসনামলের সীমাবদ্ধতা, সামরিক রাজনীতির প্রভাব এবং তৎকালীন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের বিতর্কিত দিকগুলোও ইতিহাসের আলোচনায় থাকা প্রয়োজন। কারণ, ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষিত হয় সত্য ও তথ্যের ভিত্তিতে, দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়।

আজকের বাংলাদেশের জন্য ৭ নভেম্বরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে জাতীয় সংহতি, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা। স্বাধীনতার অর্জনকে অর্থবহ করতে হলে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের অধিকার, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও কেবল স্মরণসভা, আনুষ্ঠানিকতা কিংবা দলীয় স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়। তাঁর স্বনির্ভরতা, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার যে ধারণাগুলো ছিল, সেগুলোর সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা অনুসন্ধান করাও প্রয়োজন।

৭ নভেম্বর তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। এটি যেমন সংকট থেকে উত্তরণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, তেমনি নেতৃত্ব, জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রশ্নে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ। ইতিহাসের সব পক্ষের ভূমিকা ও বাস্তবতাকে স্বীকার করে জিয়াউর রহমানের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করাই হতে পারে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য।

ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা মানে অতীতকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা নয়; বরং অতীতের অর্জন ও সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের প্রত্যয় গ্রহণ করা। ৭ নভেম্বরের সবচেয়ে বড় প্রেরণা হোক সেই প্রত্যয়।

ড. আমানুর আমান, সম্পটাতক, প্রকাশক ও মৃদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

MonTueWedThuFriSatSun
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30 
© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net